Saturday, November 14, 2020

মায়া অমাবস্যা.... নীলাঞ্জনা সরকার

 


সেদিনের সেই পদ্ম সরোবর আজ অন্ধকারে যেন দানবীয় রূপ নিয়েছে - কাছে যেতে ভয় করছে! সেই জলে নামল সে.. স্নান করে উঠে এলো, তার গায়ের মাটি ধুঁয়ে গেছে তবু সারা শরীরে এক অদ্ভুত তেজ। অর্কর কোনোদিন এসবে বিশ্বাস নেই বরাবর এগুলোকে সে ভন্ডামি বলেই পরিচয় দিয়েছে কিন্তু আজ সেও বাকরুদ্ধ। ঘাটে দাঁড়িয়ে তান্ত্রিক তার লম্বা চুলে খোঁপা করলো - এখানে কিছুটা হলেও চাঁদের আলোতে আঁধার আলোকিত হয়েছিলো তাতে পদ্ম ফুলের জলরাশির মাঝে এক দীর্ঘ পুরুষ জটা সহ যেন শিবের এক প্রকাণ্ড রূপ কিন্তু এ রূপে মায়া কই! এ তো চরম হিংস্রতার বহিঃপ্রকাশ। এ পুরুষ তো শুধু ছাগল বলি দিয়ে থামবে না....

মায়া অমাবস্যা ঠিক যেন এক নাগপাশের গল্প। যেখানে মানুষ বেপরোয়া। অথচ সে জানে না তাকেও রাতের অন্ধকারে কেউ নজর রাখে, অপেক্ষা করে সঠিক সময়ের। অমাবস্যা কিন্তু সব সময়ে অন্ধকারকে ডেকে আনে না। গল্পটি সম্পূর্ন পড়তে গেলে সংগ্রহ করুন "কুহক" গল্প সমগ্র (ই বুক)। বইটি monomousumi website এবং google play store এ পাওয়া যাবে। 





কুহক সংগ্রহ করার জন্য নিম্নলিখিত দুটি লিংক দেওয়া হলো...




' ব'- তে বর্ণপরিচয়..... নীলাঞ্জনা সরকার

 


সীমা ওই মহিলার সাথে এগিয়ে চলে এক অজানার পথে, প্রথমে একটা বাড়ির দরজার মধ্যে দিয়ে ঢুকে বিপরীত দিকের এক দরজা দিয়ে বেরিয়ে সোজা একটা গলিতে পড়ে তারা। সীমার এবার একটু ভয় করতে শুরু করেছে, মহিলা এত দ্রুত গলির ডানদিকে - বাঁদিকে ঢুকে পড়ছে যে সীমা এবার রাস্তা গুলিয়ে ফেলছে। মহিলা কোনো কথা বলছে না, চোয়াল শক্ত করে হেঁটেই চলেছে। অবশেষে থামলো সে, ঘুরে তাকালো সীমার দিকে - একটু হাসলো, বললো ভয়ে পেয়েছো? সীমা ঢোক গিলে বললো না তো! সীমার পিছনে কাদের যেন আওয়াজ! আশেপাশে পর পর ঘর কিন্তু কাউকে দেখা যাচ্ছে না, শুধু পিছনে একটা অদ্ভুত আওয়াজ ঠিক যেন সাপের লালা ঝরা পিচ্ছিল মুখের হিস্ হিস্, সীমার মনে হলো কেউ তাকে পেঁচিয়ে ধরবে আর ফেরার উপায় নেই। তার কাঁধে কেউ হাত রাখলো! কি সাংঘাতিক হাসি, মনে হলো যেন অন্ধ হয়ে গেছে সে! কই সামনে যে মহিলা দাঁড়িয়ে ছিল তাকে তো আর দেখতে পাচ্ছে না? এভাবে ঠকতে হলো! নিজের ওপর ধিক্কার জাগলো সীমার। তিন তিনটে আধা মাতাল তাকে ঘিরে, চিৎকার করে উঠতে গেল সীমা কিন্তু মুখ চেপে ধরলো একজন...একটা ঘরের সামনে খাটিয়া পাতা ছিল সেখানে টেনে হিচড়ে নিতে থাকলো তাকে.......


' '- তে বর্ণপরিচয়....সেই মানুষের গল্প যে আজও কুয়াশাচ্ছন্ন পথে এগোতে চায়। জ্ঞানের আলো যে শুধু নিজের জন্য নয়, তা আশেপাশের মানুষগুলোর মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়াতেই আনন্দ। কিন্তু কিভাবে? সহজ পথ যদি বন্ধ থাকে তাহলে কি সে থেমে যাবে নাকি জাদুর ছড়ি ঘুরিয়ে নেবে! গল্পটি সম্পূর্ন পড়তে গেলে সংগ্রহ করুন  "কুহক" গল্পসমগ্র(ই বুক)। বইটি monomousumi website এবং google play store এ পাওয়া যাবে।



কুহক সংগ্রহ করার জন্য নিম্নলিখিত দুটি 
লিংক দেওয়া হলো....



Wednesday, November 11, 2020

ভেলভেটের টিপ... নীলাঞ্জনা সরকার


   

আজ একটা ভীষণ ব্যর্থতার স্বাদ পেল সজল। গভীর হতাশা বুক চিরে বেরিয়ে আসতে চাইছিল বারবার। অফিসের টেবিলেই শরীরটাকে মুচড়ে প্রায় ফেলে রেখেছিল। ভদ্রতা বলতে আজকাল আর কিছু নেই। নিজের বাড়িতে পর্দার আড়ালে বউয়ের ওপর কতবার রেগে কথা বলেছে। কিন্তু মাটির ডেলার মত দাঁড়িয়ে থেকেছে নমিতা। মেয়েরা তো কাঁদে! সজল অপেক্ষা করতো নমিতাও কাঁদবে, কোনোদিন হয়তো তা সজলের চোখে পড়বে...তখন সে গর্ব করবে পুরুষত্বের। কিন্তু, না! ভিতরে ভিতরে সজল যতই ভাবুক সে স্বামী তবু নিজের অজান্তেই নিজের শূন্যতার বাড়ির ইট গেঁথেছে সে একটা একটা করে। কেমন যেন ঝিম ধরে যায় মনে, বড় একা লাগে নিজেকে। আর মাত্র কয়েকটা দিন। হয়তো তাকে চলে যেতে হবে সব ছেড়ে! সজলের পাড়ার এক বন্ধু তাকে ফোন করেছিল একটু আগে, বাড়িতে নাকি আবার পুলিশ এসেছে। সজল ঘেমে যায়। মনে মনে বলে,


-নিজের খুশির জন্য মানসিক যন্ত্রণা দিয়েছি নমিতাকে। কিন্তু নমিতা জীবনে এই প্রথমবার প্রতিক্রিয়া করলো! তাকে বারণ করা সত্ত্বেও পুলিশের সাথে যোগাযোগ করলো আবারও। এ যে কতদূর সর্বনাশ নিয়ে আসবে তা কি ও বুঝলো! কথায় কথায় এবার ঘরের সব কিছু লোক জানাজানি হবে। এর চেয়ে ভালো হতো ও যদি একটা চড় মারতো আমায়। শেষে থানা পুলিশ!


 


দিন সাতেক আগের ঘটনা,


নমিতা প্রায় দৌড়ে এসে দরজা খুলল, এত দেরি হলো যে? লায়লা কিছু উত্তর না দিয়েই বাসন মাজতে চলে যায়। নমিতা তাকিয়ে থাকে ওর চলে যাবার দিকে- বোঝে কেন এত দেরি! এত প্রায় রোজের ঘটনা। লায়লার বর মাতাল হয়ে রাতে ঘরে ফেরে তারপর সারাদিনের সব ফ্রাস্টেশন মেটায়...এই আর কি! কিইবা উত্তর দেবে লায়লা রোজ। সে শুধু হাসে। ছোট্ট ভেলভেট টিপটা তার কপালের শ্রীবৃদ্ধি করে যদিও বাস্তবে তার উল্টোটাই। কোনোদিন ভুল হয় না লায়লার টিপ পড়তে। ওর গায়ের রঙটা একটু ময়লা কিন্তু  হাসিটা মনভোলানো।


 নমিতা চা নামায়, একটু বেশি ভিজে গেল চা পাতাটা! দু কাপ চা নিয়ে দোতলায় উঠে বারান্দায় বসে। আজকের সকালটা পূজোর সূর্যের গন্ধ নিয়ে হাজির। কদিন পরেই মহালয়া আসছে সেটা আকাশও জানান দিচ্ছে। নমিতার এক্সিকিউটিভ স্বামী, সজল... চায়ের কাপে চুমুক দিয়েই ছি ছি করে ওঠে! যথারীতি বেসুরো হয়ে যায় নমিতা। সজল বলে,


-এখনো চা করতে শিখলে না! এইতো  সকালে মাত্র এককাপ চা খাই।


 যন্ত্রচালিত নমিতা উঠে যায় আবার চা বানানোর জন্য। লায়লা ততক্ষণে অর্ধেক বাসন মেজে ফেলেছে, মুচকি হেসে বলে,


-বৌদিমনি, আমার জন্য চা রেখেছো তো?


-আমার বানানো চা এত ভালো লাগে তোমার!


-দাদাবাবুরও ভালোই লাগে। আসলে এ সব ভান করে।


দোতলায় উঠতে কটাই বা সিঁড়ি! কিন্তু আজকাল নমিতা কেমন যেন হাঁপিয়ে ওঠে। লায়লাকে দিয়ে ওপরে চা পাঠিয়ে রান্নাঘর লাগোয়া ড্রয়িং হলে এসে বসে নমিতা। জোরে ফ্যান চলছে তাও নমিতার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। ততক্ষণেলায়লা নেমে এসেছে। জিজ্ঞেস করে,


-আজ বড্ড গরম। একটু শরবত খাবে বৌদি?


-না, একটু জল খাবো।


-আচ্ছা। আনছি। ফ্রিজের জল মিশিয়ে দিচ্ছি আরাম পাবে।


-তোমার বাড়ির কি খবর লায়লা? সব ঠিক আছে?


-আর কি খবর! আসল খবর নিয়ে বলতে চাই না গো, মন কেমন করে।


-এটাও তোমারই একটা বাড়ি লায়লা। তুমি যে কোনো অসুবিধায় আমার কাছে চলে আসতে পারো।


-বৌদি, তোমার সাথে আরো আগে দেখা হলে ভালো হতো গো...


 দুজনে হেসে ওঠে, কষ্টের দেওয়া নেওয়া হয়ে যায় ওই হাসিটুকুতে।নমিতা একটা স্কুলে পড়াতো, সন্তানের মা হওয়ায় পর নিজের ইচ্ছাতে সে আজ গৃহবধূ।সজল, প্রতিটি জিনিসে খুব শৌখিন যদিও এই শৌখিনতার তকমা তার নিজের দেওয়া কিন্তু বিয়ের দশ বছরের অভিজ্ঞতায় নমিতার মনে হয় সজল বড় বেশি স্বামী...’নমিতার স্বামী’, বন্ধু হিসাবে কখনো পায়নি তাকে সে। ছোট ছোট জিনিসে আনন্দ পাওয়ার বদলে সজল সারাদিন ব্যস্ত মুনির অকর্মণ্যতা নিয়ে। যাইহোক এভাবেই নমিতার সংসার চলে তার মিষ্টি আট বছরের মেয়ে তুলিকে নিয়ে। সজল আর তুলির সারাদিনের বৃত্তটা ঘিরে নমিতার দিনগুলো কাটছিল একরকম সব কিছু মানিয়ে নিয়ে।


দুদিন পর রাত এগারোটায়  নমিতার ফোনটা বেজে উঠেছিল বার বার। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফোনটা ধরে সে, আর চমকে যায় ফোনের ওদিকে লায়লার চিৎকারে...


-বৌদিমণি, ওরা এসেছে তুমি একবারটি এস।


 কি হয়েছে বোঝার আগেই ফোন কেটে যায়। নমিতা ঘরে গিয়ে সজলকে ডাকতেই সে খুব বিরক্ত হয়ে কথা শুনিয়ে দেয়,”দুপয়সা কামাতে হলে বুঝতে সারাদিন কি খাটুনি...একটু ঘুমাবার উপায় নেই ইত্যাদি ইত্যাদি।“ নমিতা হলঘরে এসে বসে, খুব কষ্ট হয় তার- সত্যি লায়লার সাথে নিজের তুলনা করলে দেখা যাবে দুজনের সামাজিক অবস্থানের কোনো ফারাক নেই তবু তো লায়লা নিজে দুপয়সা কামায়। খুব অস্থির লাগছিল তার নিজের মনের মধ্যে, লায়লার বাড়ি এক দুবার গেছে  কিন্তু এত রাতে একা কি করে যাবে সে? তার নিজের কোন বিপদ হতে পারে। সে স্থির করে সকাল অবধি অপেক্ষা করার। ঘুম আসে না নমিতার। মনের মধ্যে অনেক কিছু ঘোরাফেরা করে। মাথার শিরা দপদপ করতে থাকে। সে নিজেই নিজেকে অসহায় বানিয়ে রেখেছে। লায়লাকে কত বড় মুখ করে বলেছিল  যেকোনো দরকারে তাকে জানাতে, অথচ আজ সময়ে কোনো উপকারে আসতে পারলো না নমিতা। অনেক পুরোনো কথা মনে এলো তার। মাঝে মাঝে অন্ধকার দিনের কথায় কষ্ট পেলে মুখ ভার করে থাকতো নমিতা, তখন লায়লা ওকে ভোলাতো। একদিন তো সরাসরি বলেছিল,


-স্কুলটা বন্ধ না করলেই ভালো করতে বৌদি।


-কেন? তিরিক্ষি মেজাজে উত্তর দিয়েছিল নমিতা।


-জানো বৌদি, বাড়ির কারোর ওপর অভিমান করে থেকো না।


-সে নিয়ে তোমায় ভাবতে হবে না।


-অন্যের মর্জি সামলে চলাটা আমাদের নিয়তি গো। যত যাই হোক আমার দাদাবাবু তোমায় ভালবাসে খুব। রাগ লুকিয়ে রাখতে পারে না।


লায়লার এরকম কথায় আরও মাথা ঝিমঝিম হতো নমিতার। রাগ হতো...ভাবতো এ কি ধরণের অপমান! কিন্তু কিছু পরে ঠান্ডা হতো নমিতা। লায়লার ইতিবাচক কথায় সব ভুলে সজলের অফিস থেকে ফেরার জন্য আবার অপেক্ষা করতো।                 


               কিন্তু এই একটা রাতের অপেক্ষা যে নমিতার জীবনে কত বড় ভুল তা সে পরদিন সকালেই টের পায়। লায়লা যে আজ কাজে আসবে না তা সে আগেই বুঝেছিল কিন্তু কোনোদিন আর লায়লার সাথে দেখা হবে না তা কল্পনাও করতে পারেনি নমিতা! পরদিন সকালে লায়লার বাড়ি যাবে বলে দরজায় তালা দিয়ে নমিতা বেরোতে যাবে এমন সময় পুলিশের ভ্যান তার বাড়ির সামনে।


 -নমস্কার, আমি থানা থেকে আসছি। আচ্ছা, লায়লা নামে কেউ আপনার বাড়ি কাজ করতো? ইন্সপেক্টরের প্রশ্নের উত্তরে এক নিমেষে বলে ওঠে নমিতা,


-কেন! কি হয়েছে লায়লার? আমি ওর বাড়ি যাব বলেই বেরিয়েছি।


 উত্তর শুনে নমিতার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে- কারা যেন কাল লায়লাকে ধর্ষণ করে খুন করেছে। নমিতার গা গুলিয়ে ওঠে ওখানেই বসে পড়ে সে, লায়লার আওয়াজটা কানে ভেসে ওঠে।


 


পুলিশ জানায় যে লায়লার ফোনের শেষ ডায়াল করা নম্বরটি নমিতার তাই ওরা কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করতে চায়। নমিতা ঘরে এনে বসায় ওদের, সব প্রশ্নের উত্তর দেয়। পুলিশের কর্তা জানায় কিছু দরকার হলে আবার ডাকবে তাকে। সজল অফিস থেকে ফিরলে, জলখাবার দিয়েই লায়লার কথা জানায় নমিতা। সজল বলে,


-এইসব পেটি কেসে জড়িও না। এইসব ঘটনা ওদের ঘরে হতেই থাকে। আর তুমি কি ভাবছো পুলিশ তোমায় পূর্ণ সহযোগিতা করবে!


-বলতে পারবো না।


-তুমি ওদের সব সত্যি বলতে যেও না। নিজেই ফেঁসে যাবে।


-কিন্তু এই নোংরা কাজ কি করে মেনে নি!


-বেশি ভ্যাকভ্যাক করো না। যে কেউ বাড়িতে এলেই সব বলে দিতে হবে নাকি? ওরা যদি ওদের লোক হয়! হয়তো তোমায় পরীক্ষা করতে এসেছিল। ওরা তো আর জানে না তোমার মাথা কত নিরেট!


 নমিতা ধীর পায়ে বাথরুমে গিয়ে চোখে মুখে জল দেয়, দামি আয়নায় তাকায়, সত্যি কি পেটি কেস? কখনো কখনো নমিতার ইচ্ছার বিরুদ্ধে সজল যখন জোর করে, নমিতা বারণ করলেও শোনে না সেটাও তো একধরণের ধর্ষণ! নিজের ওপর ঘেন্না হয় নমিতার, পাশের ঘরে যে নিষ্পাপ শিশুটি বসে হোমওয়ার্ক করছে সেও তো একটা মেয়ে। চোখের জলটা মুছে নেয় নমিতা। বাথরুম থেকে বেরিয়ে শান্ত হয়ে সজলের পাশে বসে টিভি দেখতে শুরু করে। পরদিন সকালে সে থানায় যায়। সেখানে খবর পায় লায়লার স্বামী অন্য পাড়ার এক গুন্ডার কাছে অনেক আগে বেশ কিছু টাকা ধার নিয়েছিল কিন্তু ফেরত দিতে পারেনি তাই সেদিন ওই গুন্ডার পোষ্যগুলো এসেছিল টাকা আদায় করতে তখন লায়লার বরকে না পেয়ে ওকে টার্গেট করে। নমিতার বুকের ভিতরটা ছটফট করে ওঠে। লায়লার শরীরটা যখন মুচড়ে ভেঙে দিচ্ছিল ওরা, ওর কপালের ছোট্ট ভেলভেটের টিপটা ওদের ঘামে নিশ্চয় খুলে হারিয়ে গেছে...নমিতার বুকটা কেঁপে ওঠে। ও ভাবে ওরা যখন মদের গন্ধ মাখা ঠোঁট দিয়ে লায়লার শরীরে রক্তের কামড় দিচ্ছিল তখন নমিতা এ.সি ঘরে আরাম করছিল!


-লায়লা, সারাজীবনেও নিজেকে ক্ষমা করতে পারবো না রে... কান্নাগুলোকে ঢোক গিলে ফেললো নমিতা।


 


          আজ  নমিতা বাড়ি ফিরল মেয়েকে স্কুল থেকে নিয়ে। তুলি মায়ের গলা জড়িয়ে ধরে বললো,


-কি হয়েছে মাম্মা? তোমার শরীর খারাপ?


-না রে। আজ লায়লা মাসির জন্য বাড়িতে আবার পুলিশ কাকু এসেছিল। ওদের সাথে অনেকক্ষণ কথা বলেছি তাই একটু ক্লান্ত।


-মাসির কি হয়েছে মাম্মা?


নমিতা তুলির প্রশ্নের উত্তরে বলে,


-সব বলবো তোমায়। আচ্ছা তুলি, তুমি কাকে বেশি ভালোবাসো? মাম্মাকে নাকি বাপিকে?


 মায়ের এরকম প্রশ্নে অবাক মেয়ে ! কি বলবে বুঝে পায় না! ভাবতে বসে সে আর তাই দেখে নমিতা তাকে আদর করে বলে,


 -সবার আগে নিজেকে একটু ভালোবাসিস মা ... কাউকে হিংসা করবি না কিন্তু নিজেকে এমন ভাবে তৈরি কর যাতে সবাই তোকে দেখে ভাবে, সত্যি! আমি যদি তুলি হতে পারতাম...ব্যস এইটুকুই।


এইসব শুনে তুলি হেসে কুটোপুটি হয়। সজল ফোনে বলেছে আজ অফিস থেকে ফিরতে দেরি হবে। ওর গলাটা বেশ গম্ভীর ছিল আজ।


নমিতা তানপুরা নিয়ে বসে আজ অনেকদিন পর। "আগুনের পরশমণি" গানটা খুব প্রিয় তার, ধীর লয় গানটা ধরে সে, আর তার  চোখের জলে ভেসে ওঠে বিয়ের পর শ্বশুরবাড়িতে লায়লার সাথে দেখা হওয়া, তার প্রথম দিনের ‘বৌদি’ ডাকেই ছিল খুব আপন করে নেওয়া। বিয়ের সময় নমিতার শশুরমশাই অসুস্থ ছিলেন... বিয়ের চার বছরের মধ্যেই তিনি গত হয়েছিলেন। শাশুড়িমা, সজল কলেজে পড়াকালীন সবাইকে ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন, তবু সবকিছু আগলে রেখেছিল লায়লা। এবাড়িতে সে যেন মায়ের বিকল্প হয়ে ছিল। ঠিকে কাজের লোক কে বলবে? বড় মায়া ছিল ওর মনে। রাতের খাবার সার্ভ করার সময় সজল নমিতাকে জিজ্ঞেস করে,


-আজ আবার পুলিশ এসেছিল?


-তুমি কি করে জানলে? আমি তো এখনো বলিনি তোমায়!


-আমার শুভাকাঙ্খী কম নেই। তোমাকে এসব থেকে দূরে থাকতে বলেছিলাম। কিসের শোধ নিচ্ছো তুমি আমার ওপর?


-আমার ওপর নজরদারি করছো করো কিন্তু লায়লার সাথে যা হয়েছে তাতে আমি চুপ করে থাকতে পারবো না। তুলিকে কি শেখাবো তাহলে যদি আমার নিজের বিবেকটাই শেষ করে দি!


তুলিও এক টেবিলে। জীবন প্রায় আঁতকে ওঠে, মুনিকে বলে,


- এই কথাগুলো তুলির সামনে না বললে চলছিল না তোমার!


নমিতা খুব কঠিন আজ,


 - কেন সজল! তুলি তো খুব ছোট তার মনের কথা এত ভাব তুমি, তাহলে তার সামনে তার মাকে কেন এত অপমান কর?


সজল চমকে ওঠে! নমিতা বলে চলে,


-সজল, আমি চাই  তুলির চোখে আমাদের দুজনের জন্য সমান শ্রদ্ধা থাকুক। আজ ও যা দেখবে তাই শিখবে। লায়লা মাসির প্রতি ওর যে অকৃত্তিম ভালোবাসা, তাতে মরচে পড়তে দেব না আমি। ও জানবে ঠিকই লায়লা মরে গেছে, কিন্তু তার কারণটা! তুলি বড় হচ্ছে আসল বাস্তবটা যদি লুকিয়ে যাই তাহলে ঐ বিকৃত গলির বন্ধ মুখের চাবির সন্ধান ওর কাছেও থাকবে না।  তুমি কি চাও না তোমার মেয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচুক.. ওর অস্তিত্বের গ্যারান্টি ও নিজে নিক?


সজল আজ নিশ্চুপ। কোন কথা খুঁজে পায় না। সে আজ নিজের কাছেই কোণঠাসা হয়েছিল। নমিতা আজ অপ্রতিরোধ্য...তাকে ভালো করে দেখে সজল। নমিতার চোখ দুটো ফোলা, চোখের কাজল ধেবড়ে গেছে। আজ খুব রাগ হয় সজলের নিজের ওপর। কে যেন একটা ভারী পাথর বসিয়ে দিয়েছে বুকের ওপর...অপরাধবোধের পাথর।


সজল শুধু নমিতার হাত দুটো জড়িয়ে বলে,


- তুমি আমাকে আর ভালোবাসো না- তাই না?


 নমিতা সজলের হাত ধরে বারান্দায় নিয়ে আসে, সাথে তুলিকেও, রাতের নিস্তব্ধতায় সজলের কোলে তুলি আর পাশে নমিতা, এ যেন সবচেয়ে সুখের মুহূর্ত।


 পরদিন সকালে নমিতা চোখ খুলেই দেখে সজল হাসি মুখে বসে, সে বলে, -চলুন ম্যাডাম আজ আমার হাতের চায়ের টেস্ট কেমন দেখুন!


নমিতা হেসে ওঠে। বলে,


- আসছি।


 তার চোখে ভালোবাসায় জেতার আনন্দ আজ, পিছন থেকে সে ডাকে সজলকে,


- শুনছো, আমাদের লায়লা...


সজল ঘুরে দাঁড়ায়। বলে,


 - আজ থানায় যাব কেসটা নিয়ে কথা বলতে। তোমার লায়লা চলে গেলেও তার সম্মান এভাবে বিসর্জন হতে দেব না।


নমিতার সামনে ভেসে ওঠে লায়লার হাসি মুখ, ‘বৌদি অভিমান করে থেকো না গো’...নমিতার রান্নাঘরটা বড় শূন্য কদিন ধরে।।

Thursday, November 5, 2020

মহাকাল....নীলাঞ্জনা সরকার

 



দুর্ভিক্ষ শব্দটা সেই মহাকালকে মনে করায়

যা প্রতিনিয়ত চরম মুহূর্তগুলোকে বুনে চলতে শেখায়।

      অপ্রাপ্তির চরম সীমায় গলা শুকিয়ে কাঠ
       তবু জলের বদলে থালায় নুনের তৃষ্ণা!

মাঝে মাঝেই,

নিজের অজান্তে পাড়ি দিই সেই আনমনা পথে
যার আঁকে বাঁকে নস্টালজিক ঝালমুড়ির আড্ডা, 
কলসি কাঁখে পাড়ার মেয়েটা!
সব আবছায়া আজ প্রাকৃতিক ভয়ঙ্কর উৎসবে।
যাতে, পঙ্গু....আমি, তুমি সব আর স্তব্ধ কলরব।

       কষ্টগুলো কান্না হয়ে ঝরে পড়লেও 
       দুচোখ ভেজে কিন্তু পাথর সিক্ত হয়না!

তবু দেখো,

হাজারো পোশাক আর মেকি ঠোঁটের আঁড়ালে
হাড্ডিসার শরীরে কেমন যেন আজ 
দুর্ভিক্ষ স্বাধীনতার।।

Wednesday, November 4, 2020

দুগ্গা.....নীলাঞ্জনা সরকার






শরৎ এসেছে....
ত্রিনয়নীর অপেক্ষায়  লাল ডুরে শাড়ি পরে  ছোটো মেয়েটি পুকুর ঘাটে বসে। মায়ের কাছে গল্প শুনেছিল সে ঈশ্বরী পাটনির তাই আজ অপরিসীম কৌতূহল তার। কি যে হলো কিছুদিন ধরে সে কিছুই বুঝতে পারছে না! দোষের মধ্যে সে কদিন আগে মা দুগ্গা আসার আনন্দে সন্ধ্যেবেলা গ্রামের বড় মাঠে গিয়েছিল- যেখানে অনেকে মিলে বড়, অনেক উঁচু প্যান্ডেল বানাচ্ছে। মেয়েটি তার নিষ্পাপ হাসিতে কলকলিয়ে উঠেছিল, চারপাশের বুনো অন্ধকার টের পায়নি সে। স্বতস্ফূর্ত হয়ে জিজ্ঞেস করেছিল,
-ও কাকু, দুগ্গা আসতে আর কত দেরি!
-এই তো রে, আর মাত্র কদিন। 
কাকু খুব হেসে কথা বলায় সরল মেয়েটি কাকুর পাশে পাশেই ঘোরে আর এটা সেটা জিজ্ঞেস করে।
মেয়েটির হাতে ছিল একটা ভেঙ্গে নেওয়া কাশফুল। তাদের গ্রামে ছড়িয়ে আছে এখন এই ফুল। বেশ কিছুক্ষণ এদিক সেদিক ঘুরে মাঠের পাশের একটা পুরোনো পাঁচিলের ওপর উঠে বসেছিল সে। পা দুলিয়ে দুলিয়ে আপন মনে নিজের হাতের ছোট ছোট সুন্দর আঙ্গুলগুলো দিয়ে কাশফুলের গায়ে হাত বোলাচ্ছিল। কি নরম! ঠিক মায়ের হাতের মতো। তখন কাকু জিজ্ঞেস করে,
-কি রে বাড়ি যাবি না?
-হ্যাঁ কাকু, যাবো তো।
-চল, পৌঁছে দি। উঠে আয় আমার সাইকেলে।
মেয়েটির এ সৌভাগ্য আগে কোনোদিন হয়নি তাই স্বাভাবিক ভাবেই সে খুব উচ্ছ্বসিত হয়ে পড়ে। বাড়ির পথে চলে সে কাকুর সাইকেলের সামনে বসে। মাঠ, গাছ, গরু, ছাগলের পাল সব নিমেষে পিছনে পড়ে রইলো আর সে চললো হাওয়ার বেগে। কত কিছু মনের মধ্যে আসতে লাগলো তার! সে বলে,
-আচ্ছা, পোস্টমাস্টার কাকু তাই এত তাড়াতাড়ি সবার বাড়ি পৌঁছে যায়! আর ওই স্কুলের মাস্টারবাবু সেও। উফ্! কি সুন্দর ঠাণ্ডা হাওয়া, বাবারে বাবা! জানো কাকু, আজ পুটি খুব রেগে যাবে।
-কেন রে? পুটি কে হয় তোর?
-কে আবার! আমার বোন। ওকে না বলেই চলে এসেছি আজ একা একা। ও তখন ঘুমাচ্ছিল যে। কাকু সাইকেল থামায়। মেয়েটি দেখে চারিদিক ফাঁকা।
-কোথায় এলাম গো কাকু? 
-সাইকেল চড়ার আনন্দে বাড়ির রাস্তাটাও খেয়াল করলি না? কি মেয়েরে তুই ... কাকু হাসে এক নেকড়ের হাসি। 
ভয় পায় ছোট মেয়েটি। কাকু সুর পাল্টে বলে -
-চল না ! লজেন্স খাবি?
 ভয় ভুলে আনন্দে হাততালি দিয়ে ওঠে ছোট মেয়েটি। এতে তার কি দোষ বলো! সে কালেভদ্রে লজেন্স খেতে পায়....
কিন্তু অন্ধকারে লজেন্সের মিষ্টি স্বাদের বদলে সে রক্তের নোনা স্বাদ পায়। মায়ের পরিয়ে দেওয়া শাড়ি ছিড়ে যায় তার। আমপাতায় পাতা কাজল পড়ানো চোখে কাকুর রূপ বদলে যেতে দেখে সে। সত্যিই তো
তার কি দোষ বলো! কেউ কি তাকে বলেছিল- "ওরে মেয়ে, অচেনা মানুষের এত কাছে যাস না!" সে তো জানেই না বুনো অন্ধকার কি? সে তো জানে কাকুর হাতের বানানো বাড়িতে মা দুগ্গা বসে। সেই হাত দিয়ে যে কুমারী পুজো হয় না তা ও মেয়ে বুঝবে কেমন করে? 
মাটি মাখা ছেড়া শাড়িতে বাড়ি পৌঁছায় সন্ধেবেলায়। ওই কাকুই পৌঁছে দিয়েছিল আর অন্ধকারে মিলিয়ে গিয়েছিল। সারা শরীরে ব্যথা নিয়ে মার কাছে গিয়েছিল ছোট মেয়েটি। মা চোখের জলে তাকে পরিষ্কার করে বলেছিল,
-দুগ্গা, কাউকে কিছু বলিস না মা আমার। লোক জানাজানি হলে মুখ দেখাতে পারবো না।
মেয়েটি অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে তাতেই সায় দিয়েছিল।
কিন্তু তবু জানাজানি হলো, কি করে তা এই রক্ত মাংসের দুগ্গা জানে না, বোঝেও না। আজও সে পুকুর পাড়ে বসে অভিমানে চোখের জল মোছে আর ভাবে,
- আমি যখন রোজ পুকুর সাঁতরে এপার ওপার করে জিতি, কই! কেউ তো আমায় নিয়ে আনন্দ করে না? আর সেবছর পলাশ, পুটি  দৌড়ে আমার থেকে হেরে গেল। সেবেলা! কত ইচ্ছে হলেও বাকিদের মত স্কুল যেতে পারিনা আমি। আর মা খালি আমাকেই বকে, কি এমন করলাম আমি যে মা মরতে বললো আজ। আরও বললো এ সমাজে তার জায়গা নেই। 
আচ্ছা, সমাজ কি? সে কি ওই মাটির ঠাকুরের থেকেও বড়? 
বুঝে পায়না সে। দুগ্গার জল ভরা চোখ দেখে সামনে সূর্যাস্তের আলো বুঝি মন ভোলায় তার। জলের ঢেউয়ে সেই সূর্যের আলো সিঁদুরের লেপ্টে যাওয়া লাল টিপ। মায়ের কপালেও তো এমন টিপ।
মন কেমন করে ওঠে তার মায়ের জন্য, দৌড় লাগায় বাড়ির দিকে। শুনতে পায়...বুঝতে পারে, মা আসলে বলছে - 
                    ।। দুগ্গা লাঠি ধর তুই।।

Tuesday, November 3, 2020

প্রিয় আমার..... নীলাঞ্জনা সরকার

 



এই ঝড় খুব প্রিয় আমার।
খোলা চুলের মতই ঘন অন্ধকারের ছটা,
ছাদে আকাশ দেখা,
উদ্ভিদের মত পাঁচিলটাকে আঁকড়ে ধরে ওঠা..
ভয়ে মন কাঁপে না, মনে হয়না একবারও
যদি রক্ত পড়ে, যদি হৃদস্পন্দন বাড়ে-
শুধু মনে হয় এই ঝড় খুব প্রিয় আমার।
আমি ডানা মেলে উড়ি
এই ভেজা গোঁধুলিও খুব কাছের
সবুজ শ্যাওলা ঘন কালো দেওয়ালে
পিছলে পড়াও খুব প্রিয়।
খিলখিলিয়ে হাসি যৌবন কান্না
দূরে ভিড়ে ফিরে ফিরে আসে যায়।
তনয়ার ছায়া দুপুরের আলোয় কুৎসিত,
তবু তার মনে রজনীগন্ধার আঘ্রাণ, যা-
তার খুব কাছের ভালোলাগা।
ঠিক যেমন এই ঝড় খুব প্রিয় আমার।
তবু ভালোবাসা বলতে যখন ক্লান্ত হই আমি
তখন আমার খোঁপার ফুল ছুড়ে দি, আর-
গায়ে ঝড়কে মেখে ভিজি, বলি - দাঁড়াও
তুমি সৌন্দর্যের ওপারে..
আমার সকল কামনায়, বাসনায়, অঙ্গে, রন্ধ্রে-
চাই তোমার আকাশ জোড়া গভীরতা,
আর আমার দুচোখের শীতলতা - 
ঝড় উঠলেই জুড়াবে আমার অলীক মনের স্বপ্ন দেখা,
তাই তো এই ঝড় খুব প্রিয় আমার।। 

**********  নীলাঞ্জনা সরকার **********

মাইতি ও রূপকথা..... নীলাঞ্জনা সরকার

 


..............

তখন অন্ধকার। আর দূরের ঝোঁপগুলো এলোপাথাড়ি নড়তে থাকলো তাই দেখে কানাই দৌড়ে সোজা মাচায় ওঠা শুরু করলো, আর আমি নিচে একা বাছুরের মুখ খুলতে লাগলাম তাড়াতাড়ি। সবে পিছন ফিরে এগোতে যাব এমন সময় ঠিক যে দিকের বিপদের আশঙ্কা আমরা করিনি সেই দিক থেকে একটা গরগর আওয়াজ! এমন শান্ত চারিদিক আমি আগে কখনো দেখিনি! কিছু বুঝে ওঠার আগেই গাছের ফাঁক দিয়ে আসা রাতের আলো আঁধারিতে দেখলাম আমার মৃত্যু তখন শূন্যে, উঁচুতে। বিশুর গল্পে আমি কল্পনা করলাম সেই মুহূর্তটাকে, থাবার আড়ালে জ্বলজ্বলে সুস্পষ্ট দৃষ্টিতে সুন্দরবনের সেই অশুভ শক্তি কালো চামড়ার পেশীবহুল শরীরটার লোভে লাফ দিয়েছে বিশুর দিকে। বাঘ আমাদের জাতীয় সম্পদ ওই সময় সাংবাদিক হিসাবে আমি সেটা একবারের জন্য ভাবিনি, মনে হচ্ছিল এ যেন বিশুর লড়াই নয় এ আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যে। আমার বুকপকেটের কলমটা হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখলাম একবার, এ গল্পের ভার আমি নিতে পারবো তো? নিজেকে সাংবাদিক বলে মনেই হচ্ছিলনা। জীবনে কিছুই করে উঠতে পারিনি যেন! মনে হচ্ছিল বর্শা হাতে ছুটে যাই এই বিশুর সাথে জঙ্গল থেকে জঙ্গলে। এদিকে বিশু বলে চলেছে মরণ নিশ্চিত জেনেও দুর্বল হইনি বাবু, দিলাম তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে! কত অল্পের জন্য ওর বুক ফসকালাম জানিনা তবে দুটো জিনিস টের পেলাম ............


মাইতি ও রূপকথা সুন্দরবনের এক চোরা শিকারির গল্প। যেখানে জঙ্গলের গভীরতার সাথে মিশে আছে রহস্যে ভরা দিন রাত। গল্পটি সম্পূর্ণ পড়তে গেলে সংগ্রহ করুন " কুহক" গল্পসমগ্র ( ই বুক)। বইটি monomousumi website এবং google play store এ পাওয়া যাবে।



কুহক সংগ্রহ করার জন্য নিম্নলিখিত দুটি লিংক দেওয়া হলো...

আসলে সুবর্ণগোলক যে..... নীলাঞ্জনা সরকার

 


আগুনের গোলাটা আসলে সুবর্ণগোলক

ছুঁলেই তোমার গোপনীয়তার বিকাশ।

তুমি যেমনটা চাও তেমনটা হতে পারো-

বিষবৃক্ষ অথবা পারিজাত,শুধু-

মুক্তটা খুঁজে বের করার অপেক্ষা।

তোমার মনের মণিকোঠায় সেই সেদিনের যে

স্ফটিক আয়নার পরিচয়ের পরিযায়ী হওয়া-

তাও হবে অসামান্য যদি একপশলা বৃষ্টি নামে। 

পাবে পলিমাটির ছোঁয়া যদি-

বিবেকের সাইক্লোনের ঘূর্ণিতে অসততা উড়ে যায়-

ধন্য হবে তুমি যদি 

সেই আগুনের গোলাটা খুঁজে পাও।

দেখো না তোমার হৃদয়ে অগুন্তি শুভকামনায়,

দেখোনা তোমার বন্ধুর আলিঙ্গনে,

খুঁজলে হয়তো পাবে তাকে সম্পর্কের উত্তরণে।

একদিন শীতল শুভ্র বরফের ছোঁয়ায় 

গোলাটাকে খুঁজেছি, ওই  আসমানী রঙ্গমঞ্চেও,

পাশের গলিটায় হাটতে গিয়ে গুলাবির চোখেও,

আমার সফেদ হাতের রক্তকরবীতেও-

তবু শুভেচ্ছার চোখের বাদামী তারাটা বোধহয়

বেশি আকর্ষণীয় বোধোদয়ের আগুনের গোলার।

বিশ্বাসে অগ্নিময় হয়ে ওঠার-

গল্প শোনানোর প্রতীক্ষায় তা।

আগুনের গোলাটা আসলে সুবর্ণগোলক যে।।

.......... নীলাঞ্জনা সরকার..........

Monday, November 2, 2020

ভালোবাসার রবীন্দ্রজয়ন্তী..... নীলাঞ্জনা সরকার



বাড়ির সামনে দিয়ে ছোট ছোট বাচ্চারা লাইন করে যাচ্ছে, কি সুন্দর লাগছে ওদের - গাঁদা ফুলের সাজে অপরূপা। মালতি জানলা দিয়ে ওদের দেখছে আর মিষ্টি গলার গান শুনছে.....'বাংলার মাটি বাংলার জল'। আজ রবীন্দ্রজয়ন্তী, খুব পছন্দের 'বীরপুরুষ' কবিতাটা মনে পড়লো....
     
মনে করো, যেন বিদেশ ঘুরে
মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে।
তুমি যাচ্ছ পালকিতে মা চড়ে
দরজা দুটো একটুকু ফাঁক করে,
আমি যাচ্ছি রাঙা ঘোড়ার পরে
টগবগিয়ে তোমার পাশে পাশে.......

কবিতাটি মালতির কাছে এখন অনেকটাই স্মৃতি, শুধু বিগত বছরের প্রতিটিক্ষণ মনের সাথে দিন - রাত লুকোচুরি খেলছে। মালতি নিজের গর্ভ- কে স্পর্শ করে, চোখ টিপে রাখে যাতে একফোঁটা জল বেরিয়ে না আসে। ভালোবাসার বিয়ে হয়েছিল মা হারা অতনুর সাথে। সবাই খুব খুশি হয়েছিল এই বিয়েতে। বিয়ের তিন বছর কেটে যায় নিমেষে আর মনের মধ্যে মা হওয়ার বাসনা আঁকরে বসে। অতনুকে তখন রোজ আঠেরো ঘণ্টারও বেশি ডিউটি দিতে হচ্ছে....হবেই... মনকে শান্ত করেছিল মালতি, অতনু যে ক্রাইম ব্রাঞ্চ এ আছে সেকথা ভুললে চলবে না। জীবন তখন রূপকথার দেশ থেকে বাস্তবের মাটিতে পা রেখেছে,  মালতি জানতে পারে সে মা হতে চলেছে, তখুনি ফোন করে তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে বলতে চেয়েছিল অতনুকে কিন্তু তার আগেই ফোন এসেছিল ওর অফিস থেকে। পাগলের মত রাস্তাতেই বসে কাঁদছিল সেদিন মালতি আর অতনুর বাবা হন্যে হয়ে ট্যাক্সি খুঁজছিলেন, ছেলে যে বোম্ব ব্লাস্টে সাংঘাতিক ভাবে আহত! আজ সেই ঘটনার ছয় মাস কেটে গেছে, অতনু পা হারিয়ে তার বীরপুরুষ তকমা খুইয়েছে নিজের কাছে, একসময়ের ডাকসাইটে পুলিশ আজ ক্লার্কের কাজ করে অফিসে বসে। এ বড় যন্ত্রণার !অতনুর দু চোখের দিকে তাকালে মালতি ভয় পায়, তবু তাকে বুকে জড়িয়ে আগলে রাখে রোজ....যখনই রাত হয় - আঁধারের বিভীষিকা অতনুকে মানসিক ভাবে গ্রাস করার আগেই মালতি খুলে বসে তার জিওন কাঠির বাক্স।  আজও তার ব্যাতিক্রম নয়, যখন সবাই সারাদিন রবীন্দ্রনাথকে সন্মানের উচ্চ শিখরে নিয়ে গেল, তখন রাত নামলে মালতি তার আবেদনের পুষ্প বিছিয়ে অতনুর হাতটা নিজের মধ্যের ছোট্ট সোনাটার ওপরে রাখল আর দুজনে গেয়ে উঠলো...

                 "বিপদে মোরে রক্ষা করো,
                  এ নহে মোর প্রার্থনা
                  বিপদে আমি না যেন করি ভয়।
                  দুঃখতাপে ব্যথিত চিতে নাই-বা দিলে সান্ত্বনা,
                   দুঃখে যেন করিতে পারি জয়।।"

               ....... নীলাঞ্জনা সরকার......


একাকিত্ব নয়.... নীলাঞ্জনা সরকার



                    

একটা শব্দ শুনলাম,
ভাবলাম ওপাশে তো নিস্তব্ধতা-
তবুও আকুলতা শ্বাসপ্রশ্বাসের,
আমরণ অবিচল একপেশে ব্যবহারে-
ব্যর্থ সে আকন্ঠ কৌতূহল,
শব্দটা শেষে শবে পরিণত
প্রতিদিনের একচেটিয়া সেই একাকিত্বের মতো!
আর ঠিক তখন -
পড়ন্ত আলোয় সেই চূড়া থেকে নিচে দেখা
মনখারাপেরা অপেক্ষায়-
কখন ভালোলাগাগুলো তীক্ষ্ম আঁচড়ের আঁড়ালে
ঝাউ গাছের ওই উঁচু মগডালে হারিয়ে যাবে -
আর পড়ে থাকবে গাল না ভেজা কান্না।
আর ঠিক তখন - মনখারাপেরা অপেক্ষায়,
কখন আমি হারিয়ে যাব আমিতে-
বাঁধ না মানা উচ্ছ্বাস খুঁজতে গিয়ে,
ভেসে যাব স্তব্ধতার নদীতে -
দাঁড়াও একটু দাঁড়াও ,
মনখারাপেরা সবুর কর - 
জুঁই ফুলের সুবাস এখনও আমার বুকেতে।।

........নীলাঞ্জনা সরকার.......


মরীচিকা..... নীলাঞ্জনা সরকার

 


বালির দেশে সম্রাট। ব্যবসা ডুবে যাওয়ার পর অনেকদিন কোথাও বেড়াতে যায়নি সে। তারপর একদিন কি যেন সব ঘটে গেল, তার ভালোবাসার মানুষ দু বছর আগে একটা অ্যাক্সিডেন্টে তাকে ছেড়ে অনেকদূর চলে গেল... চাইলেও যেখান থেকে আর ফিরে আসা যায় না। তাই বউ এর নামে করা ইনস্যুরেন্সের সব টাকা পেয়ে সম্রাট আবার পায়ের নিচে জমি খুঁজে পায়। গত পরশু সে বেড়াতে এসেছে জয়শলমীর, আর আজ উট সফরে বালির রহস্যে নিজেকে আবদ্ধ করতে। কিন্তু ঘটে গেল অঘটন। মাঝে একজায়গায় সম্রাট উটের পিঠ থেকে নেমে একটু আরাম করছিল আর চোখ লেগে যাওয়ার কখন সবাই বেরিয়ে গেছে ও খেয়াল করেনি। যদিও এটা খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার, সওয়ারি ছাড়া উট ফেরত গেল এত লোকের মাঝে আর তার খোঁজ পড়ল না এটা আবার হয় নাকি! খুব চিন্তা হতে লাগলো তার, এদিকে মোবাইলের ব্যাটারিও প্রায় শেষ, তাহলে অন্ধকারে টর্চটাও তো জ্বলবে না! একজায়গায় ঝুপ করে বসে পড়ল সম্রাট। অন্ধকার হলে এদিক ওদিক হাত ঘোরাতে লাগলো কোনো পোকা মাকড় থাকে যদি সেই ভয়ে। কিছুক্ষণ পর হাতের কাছে একটা সবুজ আলো দেখতে পেয়ে হাতে তুলে নিল সে, অন্ধকারে মনে হলো একটা বালির ঘড়ি। উজ্জ্বল সবুজ রঙের বালি, ঘড়িটাকে সোজা করতেই বালি ঝুর ঝুর করে ঘড়ির নিচের ঘরে পড়তে লাগলো আর সম্রাট অনুভব করলো তার নিচের বালিও সরে যাচ্ছে। মনের ভুল ভেবে ঘড়িটা উল্টো করলো সম্রাট কিন্তু একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটলো! হাত থেকে ঝেড়ে ফেলতে গেল বালির ঘড়িটা কিন্তু পারলো না, ঘড়ি একটু নড়লেই নিজের বিপদ অনিবার্য বুঝে গেল সে। হঠাৎ একটা মিষ্টি গন্ধ নাকে এলো তার, খুব চেনা একটা পারফিউমের। অজান্তে কখন সর্পিলাকারেবালির ঝড় ঘিরে ধরলো সম্রাটকে, কানে এলো... মণি ই ই ই!   

- কে? কে কথা বলছো?     

- চিনতে পারছো না? আমি মণি। তোমার অর্ধাঙ্গিনী। 

- মণি! এ কি করে সম্ভব!

- কেন গো! মরেছি বলে কি তোমায় দেখতে ইচ্ছে করে না?

কাছে এগিয়ে আসে একটা আবছায়া মরীচিকা, যার শরীরের একটা অংশ পুড়ে ছাই হয়ে গেছে, আছে শুধু হাড় আর ভালোবাসার শাখা পলা। সম্রাটের দম বন্ধ হয়ে আসে। 

বালি ঝরে সর সর  ............সর সর......হাওয়া কাঁদে মণির সাথে, গ্যাসের তীব্র গন্ধটাও। সবাই কাঁদে, সম্রাট ছাড়া... সে যে তখন ব্যস্ত দেশলাই কাঠির আগুনে নিজের প্রতিষ্ঠিত ভবিষ্যতটাকে দেখতে। ধীরে ধীরে মণির পুড়ে যাওয়া শরীরের আলিঙ্গনে বালিতে বিলীন হতে থাকে সম্রাট, আর মণি সযত্নে ধরে থাকে বালির ঘড়িটা সম্রাটের হাতে হাত রেখে, বিয়ের মন্ত্র উচ্চারণের সময় থেকেই তো একসাথে পথ চলার কথা। 

-বাবু, চলিয়ে। 

ঘুম ভেঙে যায় সম্রাটের। চারপাশে খোঁজে বালির ঘড়ি, ঝড় আর মণিকে। কিন্তু সে তো কবেই হারিয়ে গেছে লোভের মোড়কে।   খবরের কাগজে উঠেছিল সিলিন্ডার ফেটে গৃহবধূর মৃত্যু, কিন্তু সম্রাট কি কোনোদিন আয়নায় নিজের মুখোমুখি হতে পারবে? ফেরার পথে সম্রাট ভাবে বাড়িতে রাখা মণির কেনা ছোট্ট বালির ঘড়িটা অশুভ, গিয়েই ফেলে দেবে ওটাকে। আর তার ভালোবাসা! সেটা কি! বোধহয় বালির মতই অনিশ্চিত।।

শ্রদ্ধার্ঘ্য আব্দুল কালাম....নীলাঞ্জনা সরকার

 


মিসাইল ম্যানকে অনেক সন্মান জানিয়ে.....

🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹🌹

আমার শিরায় রক্তের রঙ লাল, স্বাদ নোনা -

তোমার দীপ্ত পৌরুষের সংস্পর্শে-

ধর্ম - বর্ণ নির্বিশেষে আজ ভারতীয় আমি।

তোমার দরদী চোখে নিজেকে খুঁজি প্রতিনিয়ত,

আমার আমিকে, খুঁজি এক টুকরো ইতিহাসকে।

খুঁজি তোমার কলমের অমোঘ বাণীতে বিশ্বাস।

খুঁজি বিস্মৃত হয়ে মনে জমে থাকা ক্ষত, যাতে -

অপলক হয়ে থাকা ক্ষণিকের পরাজয় ভুলে,

উঠে দাঁড়াই ওই স্ফটিক আয়নার স্বচ্ছতায়।

হে কালাম, তোমাকে আমার সেলাম।

আমার প্রতিটি স্পন্দন.. প্রতিটি অশ্রুবিন্দু..

আর রোজ সকালের প্রতিটি শিশির বিন্দু,

হয়ে উঠুক তোমাকে আমার শ্রদ্ধার্ঘ্য।

হে কালাম, তোমাকে আমার সেলাম।।


.........নীলাঞ্জনা সরকার.......

Sunday, November 1, 2020

জলছবি..... নীলাঞ্জনা সরকার






মল্লিকা, সারাজীবন পাশে থাকবো - ওই রক্তগোলাপের রক্তাভ রঙটির মত। তোমার কোলে মাথা রেখে আকাশপানে চেয়ে দূরে সুদূরে..........
মল্লিকা, ও মল্লিকা কোথায় গেলি? বাবা ডাকছেন, মল্লিকা তাড়াতাড়ি শেষ পাওয়া প্রেমপত্রটি গুছিয়ে ফেললো। এখন অতটা কষ্ট হয়না তথাগতর কথা মনে পড়লে। তথাগত খুব সুন্দর ভাবতে পারতো আর তার কলমের বিন্যাস সে তো বলাই বাহুল্য। তবে মল্লিকা পরে বুঝতে পেরেছিল তার প্রেমিক সবচেয়ে বেশি ভালো পারে কাঁদাতে, কষ্ট দিতে।
                কোথায় ছিলি মা! কখন থেকে খুঁজছি তোকে? তোর ইন্টারভিউ কেমন হলো? পাশ থেকে মায়ের ছবিটা নিয়ে আঁচল দিয়ে পুছতে পুছতে মল্লিকা বললো বাবা, এত চিন্তা করো না। প্রতিবারের মতো এবারেও একই প্রশ্ন, বিশেষ করে সেই অগ্নিবান - এখনও বিয়ে হয়নি আপনার? আচ্ছা বাবা, মেয়েদের জীবনে বিয়েই কি সব! সব দোষ ক্ষমা করা যায় ওই একটু লাল দাগে! সকল পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে উঠতে পারে একজন বিবাহিত মহিলা? বাবার পায়ের কাছে বসে বাবার মুখের দিকে চেয়ে অপার বিস্ময়ে তাকিয়ে থাকে মল্লিকা। জীবন বাবু মেয়ের দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকলেন যে এতকাল ভেবে এসেছিলাম মা বাবার দেওয়া এই জীবন নামটা সার্থক। তাই মেয়ের প্রতিটি রোমকূপে ভরিয়ে দিয়েছে খালি আদর্শ আর আদর্শ! কিন্তু কি লাভ হলো তাতে? শুধু নামটাই সার্থকতা পেলো কিন্তু মনটা! একটি পুরুষ ও একটি নারী সমাজের আলো আঁধারির খেলায় রোজ মগ্ন। সকাল থেকে রাত হয়, আবার নতুন দিনের শুরু হয় কিন্তু দশচক্রে আদর্শের ফুল ফোটে কই? শুধু অপেক্ষা সত্যিই, শুদ্ধ একটা স্বপ্নের বাস্তবিকতা পাওয়ার অপেক্ষা।।  



তথাগত মল্লিকার থেকে মাত্র দু বছরের বড়। কিন্তু সবসময় একটু গার্জেনগিরি করত। প্রথম প্রথম তা থেকে ঝগড়া তারপর খুনসুটি আর তারপর এক পাড়া হওয়ার দরুন লুকিয়ে প্রেম। দুরন্ত প্রেম - সবাই বলত রাজযোটক, সবার চোখ লেগে গেল বোধহয়!
তথাগতর প্রথম প্রেমপত্র পেয়ে মল্লিকার মনে হয়েছিল কেউ যেন প্রতিটি মুহূর্ত বুনে দিয়েছে নিজের উপলব্ধি দিয়ে......

খাতা কলম নিয়ে বসেছিলাম কাল
কিন্তু প্রেমের একটা শব্দও এলোনা কলমে
তার বদলে উদ্ভিদের মত জড়িয়ে ধরলো
তোর গায়ের সেই গন্ধটা, যেটা
আতরকে হার মানায়।।
জানলা দিয়ে পূর্ণিমার চাঁদ আলোয় ঝলমল
কিন্তু হৃদয়টা আলোকিত হলোনা
তার বদলে তোর গালের টোল ছড়িয়ে পড়লো
আমার মনের আনাচে কানাচে, যেটা
হৃদস্পন্দনকে স্তব্ধ করে দিতে যথেষ্ঠ।।
তবু আর একবার এই আঙ্গুলে তোর ছোঁয়া চাই
যাতে শিরা উপশিরায় গান ছড়িয়ে পড়ে
ইতিহাসটা লিখতে ব্যর্থ হতে চাইনা
তার বদলে তোর চোখের তারায় ডুবে গিয়ে
নক্ষত্রের উজ্জ্বলতা ব্যর্থ করি চল।।

পড়ার পর যখন তথাগতর সামনে এসেছিল তখন খুব হেসেছিল মল্লিকা। এখন আর অত হাসে না মল্লিকা। মনে হয় কাকে দেখে আর হাসবো? মাঝে মাঝেই সে দেখতে পায় তথাগত আর তার সুগৃহিনীকে। কিন্তু দেখেও না দেখার ভান করে চলে যেতে হয়। এক পাড়ায় যে, কি করে পালিয়ে বাঁচবে বুঝতে পারে না মল্লিকা। না, মেনে নেয়নি তথাগতর পরিবার.. মল্লিকা হারিয়েছিল সবকিছু। মা মারা যাওয়া গরীব বাবার মেয়েটি বড়লোক বাড়ির ছেলের হৃদয় থেকেই অদৃশ্য হয়ে গিয়েছিল। এক মাথা সিঁদুর নিয়ে ও বাড়ির লাল সাদা শাড়ি তে আলতা পায়ের ছাপ রাখতে হয়নি তাকে।একটা ভালো স্কুলে পড়াতো মল্লিকা, সেখান থেকেও তাকে বরখাস্ত হতে হয় বড়লোক ছেলের প্রেমে পড়ার জন্য। সেই থেকে একটার পর একটা স্ট্রাগল করছে সে। খোলা হাসিতে ভরিয়ে দিতে চায় নিজের দমবন্ধ করা ঘরটাকে, কিন্তু পারেনা। মায়ের ফটো আর বাবার শুকিয়ে যাওয়া চোখের দিকে চেয়ে মনে মনে ভিজে যায় সে। চরম অপমানিত হওয়া ভালো নাকি প্রতিশোধ? মাঝে মাঝে মনে হয় চিঠিগুলো জ্বালিয়ে দিলে ভালো আবার কখনো প্রতিহিংসার আগুনটা জ্বলে ওঠে তার মনে তখন সে ভাবে ওবাড়ির সুগৃহিনী কে দিয়ে আসি, কিন্তু পা সরে না তার। চোখ দিয়ে জল পড়লেও সে জলে দাবানল নেভে না।



আমাদের সুগৃহিনী কিন্তু বাস্তব জীবনেও খুবই সংসারী। বিয়ের প্রথম রাতেই স্বামীর কাছে তার প্রেমিকার কথা শুনেছিল সে, তবে তার কৃতিত্ব সেখানেই যেখান থেকে সে তার স্বামীর মনে তার প্রতি শ্রদ্ধা, বিশ্বাসের বীজ রোপণ করতে পেরেছিল। স্বামীর মুখে যেদিন প্রথম সে ' মানসী ' নামটা শুনেছিল সেদিন তার চোখ থেকে জল পড়েনি বরং এক সাহসী মেয়ের উপাখ্যানের সূত্রপাত ঘটিয়েছিল সে ভালোবাসার চুম্বন এঁকে দিয়ে।
  মানসী সত্যিই মল্লিকার জায়গাটা নিতে পেরেছিল কিনা, তা নিয়ে নিজেকে কখনো প্রশ্ন করেনি সে, বরং নিজের নামের সত্যতা প্রমাণ করে শ্বশুরবাড়ির মধ্যমণি হয়ে উঠেছিল। মানসী প্রথম যেদিন দূর থেকে তার স্বামীর প্রিয়তমাকে দেখেছিল- মুগ্ধ হয়েছিল সে, মল্লিকার চোখের তীব্র ঘৃণা ভরা ভালোবাসা দেখে। স্বামীকে বলেছিল, একবার আমি দিদির সাথে দেখা করতে চাই, তার সতীন থেকে সখী হতে চাই। চমকে উঠেছিল তথাগত! তখনই শেষ করে দিয়েছিল মানসীর মনস্কামনা কে। বলেছিল - কি লাভ, ভালোবাসা দিতে পারিনি সন্মানও নয়। অপমানের যে প্রলেপে সে আজও বিভ্রান্ত তাকে মুছতে গিয়ে কলঙ্কিত না করাই ভালো। প্রতিদিন দুপুরে শাশুড়ির পানের ডিবে সাজিয়ে তার ঘরের জানলায় দাঁড়িয়ে মানসী দূরের মেঘগুলোকে দেখে। সত্যি সে কত সুখী। কিন্তু তথাগত ভালোবাসে তো তাকে, আচ্ছা এমনও তো হতে পারে মানসী কে আঁকরে ধরে মল্লিকাকে ভুলতে চায় সে! এমন অনেক প্রশ্ন মানসী কে তাড়া করে বেড়ায়। আজ বিয়ের তিন থেকে চার বছরে পা দিল মানসী কিন্তু মাতৃত্বের স্বাদ সে এখনও পায়নি।ধীরে ধীরে শ্বশুরবাড়ির সবাই অধৈর্য্য হয়ে উঠছে। কবে যে একটা ছোট্ট শিশু খেলবে পুরো উঠোনটায়, তার ছোট্ট আঙুল দিয়ে আকাশ দেখাবে আর মানসী গান গাইবে - আয় আয়  চাঁদ মামা টিপ দিয়ে যা..... এই একটি না পাওয়া তাকে বড় দুর্বল করে দেয়।
                     


দূরে আকাশে ছোট ছোট তারা
আর আমার মনের ধিক্ ধিক্ করে জ্বলা আশা
মানসী, তুমি আমি মিলে
জলাশয়ের পদ্ম পাতার বিলে, ভাসাই চলো।
প্রাণভোমরা নাইবা পেলো ভোরের আলো,
নাইবা পেলো প্রাণ - ভাসাই চলো।
দূরে যেখানে ছোট্ট শিশুর প্রাণ,
আমার কোলে তোমার নাড়ির টান
মানসী, তুমি আমি মিলে গড়ে নিয়ে
রোজ একটু তিলে তিলে, ওড়াই চলো।
আকাশ কুসুম নাইবা এলো হাতের মুঠোয়
নাইবা পেলাম মিষ্টি হাসি - ওড়াই চলো।
দূরে যেখানে বিশাল সবুজ মাঠ
একলা পেয়ে দিত যদি বাবা বলে ডাক
মানসী, তুমি আমি মিলে
অনেক মানুষের ভিড়ে, ফোটাই চলো
সুপ্ত কুঁড়ি নাইবা এলো ফুলদানিতে
নাইবা পেলাম সুগন্ধী - ফোটাই চলো।

রাতের অন্ধকারে ছাদে দাঁড়িয়ে তথাগত যখন বুকের গভীর থেকে এই আবৃত্তি করছিল তখন মানসী চোখের জলে ভেসে যাচ্ছিল, সে আজ জানতে পেরেছে সে কোনোদিন মা হতে পারবে না। আর তথাগত যেন শক্ত পাথর হয়ে গেছে, আজ তার কেবলই মনে হচ্ছিল এ তার পাপের ফল। যেদিন মল্লিকাকে পুরোপুরি জীবন থেকে মুছে দিয়েছিল, প্রত্যাখ্যান করেছিল তাকে, আচ্ছা সেদিন মল্লিকাও কি এমন করে কেঁদেছিল! কোনদিন জানতে চায়নি সে যে মল্লিকা ওই অভিশপ্ত রাতটা কেমন করে কাটিয়েছিল? আজও মনে পড়ে তথাগতর সেদিন মল্লিকার সাথে শেষবারের মতো দেখা করে বলেছিল, আমি তোমার উপযুক্ত নই, তুমি নতুন জীবন শুরু করো। অবাক হয়েছিল মল্লিকা, চিৎকার করে বার বার জানতে চেয়েছিল কি তার অপরাধ? কিন্তু চলে এসেছিল তথাগত, আর একটিবারের জন্য ফিরে তাকায়নি সে। কি বলবে সে? সে কতটা ভীরু, কতটা কাপুরুষ! নিজের পরিবারকে সন্মান করতে গিয়ে নিজের ভালোবাসাকে বিসর্জন দিয়েছিল সে। তা যে বড়ই লজ্জার আজও তার কাছে। আজকের তথাগত আর সেদিনের মধ্যে কত পার্থক্য! সময় আর সংসার তাকে দায়িত্ব নিতে শিখিয়েছে। আজ মানসী তাকে জিততে শিখিয়েছে যে।

  ৫                                          

মল্লিকা বহুদিন পর তথাগতর বাড়িতে এলো। মল্লিকা এখন একা থাকে। বাবা গত হয়েছেন এক বছর হলো। তথাগতর মা খুব অসুস্থ, উনি মল্লিকাকে ডেকে পাঠিয়েছেন। ইচ্ছা না থাকলেও মল্লিকাকে আসতে হলো, বাড়িতে ঢোকার সময় অনেক পুরনো কথা মনে পড়ছিল তার। মল্লিকা আগে কোনদিন এ বাড়িতে আসেনি তবু সবকিছু ছবির মত তথাগতর মুখে শুনে শুনে অথচ আজ এমন সময় সে এলো যখন এ বাড়ির ছায়াটাকেও অভিশপ্ত মনে হচ্ছে। তথাগতর বাবা মারা যাওয়ার পর মল্লিকা তার জীবনের বিপর্যস্ত সময়গুলো কিছুটা হলেও সামলে উঠেছিল।সে এখন আবার একটা স্কুলের সাথে যুক্ত, একটু দূরে হলেও মল্লিকা মানিয়ে নিয়েছে সব ঠিকমতো। সবকিছু যখন ঠিকঠাক চলছে তখনই হঠাৎ এ বাড়িতে ডাক পড়ল তার। মল্লিকা যখন তথাগতর মায়ের বিছানার পাশে বসে, ঠিক তখন দরজার পাশে মানসী তার বহুদিনের দেখা কিন্তু অজানা মানুষটির অপেক্ষায়.....মল্লিকার! মৃত্যুসজ্জায় শায়িত মানুষটি আজ মল্লিকার কাছে অনেক কাঁদলেন, বললেন তিনি কত অনুতপ্ত। মল্লিকার জীবনে অভিশাপ ডেকে এনেছিলেন বলেই বোধহয় এ জীবনে বংশধর না দেখে মরতে হচ্ছে ওনাকে এই ছিল তথাগতর মায়ের বিলাপের প্রধান কারণ।মল্লিকার অস্বস্তি বাড়তে থাকে সে যে কি বলবে ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। একদিন সে বঞ্চিত হয়েছিল ঠিকই কিন্তু মানসীর অপরাধটা ঠিক কোথায় তা সে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারেনা! জীবনের এক একটি দিন দিগন্ত বিস্তৃত অধ্যায়ের মতো, যার অন্ত খুঁজে পাওয়া বড়ই বিচিত্র অনুভূতি। কিছু সান্ত্বনা বাক্য বলে মল্লিকা বেরিয়ে আসে আর মুখোমুখি হয় মানসীর। এক অদ্ভুত পরিস্থিতি, জীবনে যাকে শত্রু মিত্র কোনোটাই ভাবতে পারেনা মল্লিকা তাকে কি বলবে সে? মানসী তার হাত ধরে, ঈশ্বর জানেন হয়তো কেন সেদিন মল্লিকার চোখের জল বাঁধ মানে নি। মানসী কিন্তু খুব শান্ত ছিল, হয়তো সে মানসিক প্রস্তুতি নিয়েই এসেছিল মল্লিকার সামনে। তার শাশুড়ী যা যা বললেন মল্লিকাকে সব শুনেও কেমন যেন নিরুত্তাপ ছিল মানসী - সে বললো আবার আসবে তো? এ বাড়িতে আমার সাথে সারাদিন কথা বলার কেউ নেইগো। আজ একটু সময়ের জন্য আমার ঘরে চলো....শুনে চমকে ওঠে মল্লিকা - এ ঘরটা তো তারও হতে পারতো! মল্লিকা ইতস্তত করে বলে, আজ থাক। তুমি বরং একদিন এসো আমার কাছে। মল্লিকা মানসীর হাত ছাড়িয়ে বাইরের দরজার দিকে এগোয়। কিন্তু তার হাতের স্পর্শে মানসীর পরম প্রাপ্তি হয়, যেন খুব আপনজনকে ফিরে পেলো সে। হেঁটে বাড়ি ফিরতে ফিরতে একটা কথাই খালি মনের মধ্যে ঘুরছিল মল্লিকার, বোধহয় মানসীকে আঘাত করে ফেললো সে, আর কি আসবে মানসী তার বাড়ি?

 ৬

মানসী সত্যিই এলো মল্লিকার বাড়ি। তবে শাশুড়ী মারা যাওয়ার এক বছর পর....অনেক গল্প করলো সে। মল্লিকারও ভালো লাগছিল। মানসী যখন সংসারের কথা বলছিল তখন খুব মন দিয়ে সে মানসীর চোখে তথাগতকে নতুন করে চেনার চেষ্টা করছিল। একটা সময় মল্লিকার মনে হলো যে তার সাথে বিয়ে না হয়ে মানসীর সাথে হয়েই ভালো হয়েছে, সব কিছু জেনে মানসী তথাগতকে যেভাবে আপন করেছে তা কজন পারে? সে নিজেই তো এখনও মেনে নিতে পারেনি। মল্লিকার ভাবনায় ব্যাঘাত ঘটে হঠাৎ মানসীর কান্নায়, সে বলে ওঠে সত্যি করে বলো তুমি কি আমায় ক্ষমা করেছ? করোনি বোধহয়! তাই ভগবান এমন শাস্তি দিয়েছেন আমায়, আমার শ্বশুরবাড়ির সবার তো তাই মত। মানসী বলে চলেছে - অনেক চেষ্টা করেও আমি মা হতে পারলাম কই? ইচ্ছে ছিল অনাথ আশ্রম থেকে একটা বাচ্চা নিয়ে আসব যে আমার কোল জুড়ে থাকবে, কিন্তু তাও হলনা। শ্বশুরবাড়ির অনেক নিয়ম যে, আমরা দুজন তাতে বাঁধা পরে আছি গো। আজ স্বামীকে লুকিয়ে তোমার কাছে এসেছি। আচ্ছা, তুমি তো আমার স্বামীকে ভালোবাসতে! পারোনা তাকে বাঁচাতে? মল্লিকা চমকে ওঠে - কি বলছে মানসী! মানসী বলতে থাকে - আমি তোমার মত অত লেখাপড়া জানিনা, দিদিমনিও নই। কিন্তু শুনেছি আজকাল কিসব নিয়ম হয়েছে মা ভাড়া পাওয়া যায়, কিন্তু সে বড় লজ্জার আমার কাছে।মল্লিকার হাত ধরে বলে মানসী - তুমি তো কোনো একদিন দুজনের একটা পূর্ণ সংসার চেয়েছিলে, আজ সে স্বপ্ন পূরণ করতে ইচ্ছে হয়না তোমার? মল্লিকা ছিটকে যায়, এত অপমান! লজ্জায়... ঘৃণায় অবাক হয়ে যায় সে। মানসী আমি কি শুধু একটা নারী শরীর? মল্লিকা ফুঁসে ওঠে - কে বললো তোমাকে আমি শুধু সন্তানের মা হতে চেয়েছিলাম! তার ভালোবাসার মন্দিরে থাকবো, দুজনে মিলে সমদক্ষতায় সে সংসার এগিয়ে নিয়ে যাবো...এসব অনেক স্বপ্ন দেখেছিলাম। কিন্তু নিজেকে বিক্রি করে নয়। মানসী, আমি তোমাকে আমার ভালোবাসা দান করেছি - এক নিশ্বাসে কথাগুলো বলে যায় মল্লিকা.... তুমি সংসার করছো মেনে নিয়েছি, তোমার সংসার যাতে সুখের হয় তাই প্রতিদিন নিজেকে আয়নায় অপমানিত হতে দেখেছি, কিন্তু নিজেকে এতটাও ছোট করিনি যে তোমার কথায় সায় দেব। আমার মনে কোনো লোভ নেই মানসী যে তোমার সুখ থেকে খানিকটা নিজের করে নেবো। তুমি আজ যাও মানসী, আর কোনোদিন বাড়িতে না জানিয়ে এসো না। মানসী চলে যায় আর বলে যায় মল্লিকা যেন তাকে ভুল না বোঝে কিন্তু তা বললে কি হয়.......এদিকে অগ্ন্যুৎপাত ঘটে মল্লিকার মনে এতদিনের চেপে রাখা ব্যথার।

 ৭

এরপর বেশ কিছুদিন কেটে গেছে। মল্লিকা তার নিজের জীবনযাত্রায় ব্যস্ত, মনের কোণে মানসীর কথাগুলো মাঝে মাঝে আনাগোনা করে ঠিকই তবে তাজা ঘায়ের মত অত কষ্ট দেয় না।
            সেদিন ছিল শনিবার, খুব বৃষ্টি ছিল রাতে।পরদিন স্কুল যাওয়ার তাড়া নেই তাই মল্লিকা জানলায় দাঁড়িয়ে অনেক রাত অবধি ঝমঝম আওয়াজের সাথে বাইরের আলোয় বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা উপভোগ করছিল। বৃষ্টি থামলে ভেজা হাওয়ার স্পর্শে মা বাবার ছবির দিকে তাকিয়ে নিশ্চিন্তে ঘুমাতে যায় সে। ভোরের দিকে একটা ফোন আসে, স্কুলের খুব ঘনিষ্ঠ সহকর্মীর - তখুনি মল্লিকাকে তার বাড়ি আসতে বলে। মল্লিকার বাড়ি থেকে বেশ অনেকটাই দূরে তার বাড়ি.... বলা যায় পুরো উল্টো দিকে। ওদের দুজনের বাড়ির প্রায় মাঝখানে ওদের স্কুল, কি করে তাড়াতাড়ি পৌঁছাবে ভেবে মল্লিকা আজ বাসের বদলে ট্যাক্সি করে নেয়। সেখানে পৌঁছে মল্লিকার মাথায় হাত - এ কি দুর্বিষহ কাণ্ড! চারিদিকে আগুন তার ছাপ রেখে গেছে,রাতের বৃষ্টির সোঁদা গন্ধটা পুরোপুরি চাপা পড়ে গেছে আগুনের পোড়া গন্ধে! মল্লিকার সহকর্মী সম্পূর্ণ ভাবে বিপর্যস্ত... তার মুখে হাতে কালো ছোপ, বছর তিনেকের এক শিশু তার কোলে। শিশুটি কেঁদেই চলেছে। মল্লিকার কোলে তাকে দিয়ে বন্ধু রিয়া বললো বাচ্চাটির মা বাবাকে বাঁচানো যায়নি আরও অনেকের মতই। পুলিশ, দমকল বাহিনী সবই মল্লিকা পৌঁছানোর বেশ কিছু সময় আগে এসে পৌঁছে গেছে । ঘন্টা দুই বাদে পরিস্থিতি কিছুটা ঠিক হলো। সব লাশ এক জায়গায় জমা করা হয়েছে - এ দৃশ্য দেখা যায় না। মল্লিকার গা গুলিয়ে উঠলো, তার বমি পাচ্ছে কিন্তু কোলের বাচ্চাটার কথা ভেবে শান্ত হওয়ার চেষ্টা করলো। শিশুটি অনেকক্ষন কেঁদে এখন ঘুমিয়ে পড়েছে। রিয়া পুলিশের সাথে মল্লিকার পরিচয় করিয়ে দেয় আর ওরা অনুরোধ করে মল্লিকাকে শিশুটিকে কিছুদিন তার কাছে রাখার জন্য। মৃত পরিবারগুলির মধ্যে এই শিশুটি সবচেয়ে ছোট আর খুব কপাল ভালো যে ও আহত হলেও বেঁচে আছে, কিন্তু এই বিপর্যয়ের পর এত ব্যস্ততা থাকবে যে ওর দেখাশোনা ঠিকমতো হবে না হয়তো। মল্লিকা বুঝে উঠতে পারেনা যে ওর কি করা উচিৎ, তার তো কোনো অভিজ্ঞতাই নেই! তবু শিশুটিকে সে বাড়ি নিয়ে আসে। অনেক বেলা হয়ে গেছে আর মল্লিকা ভোর বেলা বেরিয়ে যাওয়ায়  বাড়িতে দুপুরের খাবার মত কিছুই তো নেই। অনেক ভেবে বিস্কুট দুধে ভিজিয়ে বাচ্চাটাকে খাইয়ে দেয় সে। ছোট্ট মানুষটি বেশ বুঝতে পেরেছিল সে অপরিচিত জায়গায় তাই তাকে খাওয়ানো বেশ কঠিন হলো মল্লিকার, তবে পেট ভরার পর একটু কান্না থামে তার। তারপর অনেক চেষ্টায় আবার তাকে ঘুম পাড়ায় মল্লিকা, ঘুমন্ত শিশুর মুখের দিকে তাকিয়ে বড় মায়া হয় তার.... ও জানেই না ওর সবচেয়ে প্রিয়জনেরা আজ কত দূরে চলে গেছে। ঠিক তার মতই - নিজের কথা ভাবে মল্লিকা.. সে আর বাচ্চাটা তো ভাগ্যের একই খেলার শিকার, চাইলেও আর কখনো মা বাবার স্পর্শ পাবে না তারা, চাইলেও তাদের বুকে মুখ লুকিয়ে কাঁদতে পারবে না। তিন চারদিন হয়ে গেছে কিন্তু শিশুটির কোনো ব্যবস্থা এখনও হয়নি। রিয়ার সাথে কথা হলে সে জানায় এক অনাথ আশ্রমের সাথে যোগাযোগ করা হয়েছে। মল্লিকা অনেকবার নিউজ এ দেখেছে অনেকসময় এইসব জায়গা থেকে বাচ্চারা বেপাত্তা হয়ে যায়, একটু ভয়ে আছে সে। মল্লিকা শিশুটির নাম দিয়েছে - মিষ্টি। বেশ ভাব হয়ে গেছে দুজনের। স্কুল থেকে কদিনের ছুটি নিয়েছে সে, একদিন বিকালে মিষ্টিকে নিয়ে রাস্তায় হাঁটছিল মল্লিকা হঠাৎ তথাগতর সাথে দেখা তার - দুজনেই খুব অপ্রস্তুত। মল্লিকা তাড়াতাড়ি বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করে, কিন্তু খানিকটা এসে পিছন ফিরে দেখে তথাগত একই জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। অবাক আজ তথাগত........ মল্লিকার মেয়ে!

 ৮

মিষ্টিকে মল্লিকা দত্তক নিয়েছে....মিষ্টি আর মল্লিকা এখন দুজন দুজনের চোখের মণি। সকালে মিষ্টিকে দেখাশোনার জন্য একজন মহিলাকে রেখেছে মল্লিকা।
মল্লিকা স্কুল থেকে ফিরলেই শুধু ওরা দুজন। কত গল্প, কত খেলা, মিষ্টির আধো কথা - সারাদিন এরই অপেক্ষায় থাকে মল্লিকা। বিকালে মিষ্টিকে নিয়ে ঘোরার সময়ে প্রায়ই দেখা হয় তথাগতর সাথে, সে ওই সময়ে অফিস থেকে ফেরে। তথাগতর মুখ চেনা হয়ে গিয়েছিল মিষ্টির তাই একদিন হঠাৎ ডেকে ওঠে - কাকু!  তথাগত পাশ কাটিয়ে চলে যেতে পারেনি, ঐটুক বাচ্চার মায়া কাটানো কি অতই সহজ! তাই তথাগতও মিষ্টির ডাকে সাড়া দেয়। কিন্তু মল্লিকার সেটা একদম পছন্দ হয়নি। আজকাল বেশ ভাব জমে উঠেছে দুজনের, এমনকি মিষ্টির কাকু মাঝে মাঝেই অফিস ফেরত বেলুন নিয়ে আসে, আবার টফিও। মল্লিকা বারণ করেও কোনো লাভ হয়নি। মাঝে মাঝে মল্লিকা ভাবে বিকালে বেরোবেনা কিন্তু মেয়ে শুনলে তো! এরকমই একদিন বিকালে মল্লিকার সামনে মানসী আর তথাগত - তোমার মেয়ে কি সুন্দর গো! একটু আদর করি? ভয় পেওনা, তোমার মেয়ে তোমারই থাকবে.....মল্লিকা খুব লজ্জা পেয়ে গেল। জিজ্ঞেস করলো কোথায় যাচ্ছো মানসী? ডাক্তারের কাছে গো, শরীরটা ভালো নেই কবে কি হয়! অনেকদিন পর মানসীকে ভালো করে দেখলো মল্লিকা - এ কি চেহারা হয়েছে? চোখ কোটরে ঢুকে গেছে, কালি পরে যাওয়া মুখে এখনও ঠোঁটে হাসি তবে তা স্বতস্ফূর্ততা হারিয়ে বড় মলিন। খুব কষ্ট হলো মল্লিকার, বাড়ি ফেরার পথে তথাগতর লেখা সেই কবিতাটা মনে পড়লো.........

বিষ পান করা আর হলো না
তোমায় আমায় মিশে গেলাম অন্তহীনে
নীলকন্ঠ হওয়া আর হলো না -
তোমার কোলে মাথা রেখে বিনিদ্র রজনীও শেষ
বিষের পাত্র হাতেই আমার, গলায় ঢালা হলো না
পাছে বিষ চুম্বন দি তোমায়
জ্ঞান হারাও তুমি, তখন?
আমার শত শত না বলা কথা
সব মিছে হয়ে যাবে যে!
তাই বিষ পান করা আর হলো না।
যেদিন স্তব্ধ হবে চারিদিক, অন্ধকারে ভয় ভীত হয়ে
মনের দ্বার খুলে দেবে তুমি
সেদিন বিষ পাত্র শূন্য করে - স্বপ্ন দেখবো আমি।
তাই নীলকন্ঠ হওয়া আর হলো না।।

চোখের জল বাঁধ মানছে না আজ মল্লিকার, বালিশে মুখ গুজে পড়ে আছে সে।

 ৯

কদিন ধরেই মল্লিকার মনে হচ্ছে সে যেন হেরে যাচ্ছে। এক অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে তার, ঠিক যেমন মাকে হারিয়ে হয়েছিল....ঠিক যখন বাবার কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে কানে কানে বলেছিল -  বাবা আমি তোমার মেয়ে না আমি তোমার মা...ঠিক যেদিন শুনেছিল মিষ্টির মা বাবা ওকে ছেড়ে চলে গেছে...সব কিছু কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে তার। জিততে গিয়ে এক নির্দোষ মানুষকে শাস্তি দিয়ে ফেলছে সে, কি করে তার প্রায়শ্চিত্ত করবে মল্লিকা! বড় কঠিন সময় আজ তার জীবনে। মনে হলো বাবা বলছে, তুই ঠিক পথে যাচ্ছিস মা, আমরা তোর পাশে আছি। না, সত্যিই হারবে না মল্লিকা!
  দরজা খুললো মানসী - এত রাতে মল্লিকা তুমি? মল্লিকা বলে, ভিতরে আসতে বলবে না! মানসী লজ্জা পেয়ে তার হাত ধরে ঘরে আনে....সাথে মিষ্টিকেও। মল্লিকা জিজ্ঞেস করে তথাগত আছে? মানসী তাকে ডাকে। চারিদিক বড় শান্ত, নিস্তব্ধতা ভেঙে মল্লিকা মানসীকে বলে - তুমি মা ভাড়া পাওয়া যায় বলেছিলে মনে আছে? তাই আজ তোমার কাছে এলাম। মানসীর চোখে জল, মল্লিকা তার হাত ধরে মিষ্টির কাছে নিয়ে আসে। বলে, আমার মেয়ের দায়িত্ব নেবে তুমি? মানসী মিষ্টিকে জড়িয়ে হাউহাউ করে কেঁদে ওঠে। মিষ্টি মল্লিকার কাছে ঘেঁষে আসলে মল্লিকা বলে- মিষ্টি, এই তোমার মাসী। আর তথাগতকে বলে, তোমার একটা ঋণ ছিল আমার কাছে - আমায় একটা সুন্দর সরল বোন উপহার দিয়েছো তুমি। তার বদলে তোমায় একটা নতুন জীবন দিতে চাই। তবে তোমাকে ক্ষমা করতে পারবো না কোনোদিন তাই শাস্তি দেবো। মিষ্টির প্রতিপালনের সমস্ত দায়িত্ব আমার, আমি ওর মা। আজ থেকে আমার মেয়ে আমার বোনের কাছে বড় হবে, তুমি তাকে সাহায্য করো, কিন্তু বাবা ডাক শুনতে চেওনা। পিছন ফিরে তাকায় মল্লিকা, মানসীর কোলে মিষ্টি। মল্লিকার চোখের জলে সব তিক্ততা জলছবির মত ধুঁয়ে যাচ্ছে শুধু ফুটে উঠছে সুন্দর এক সম্পর্কের রঙিন বাঁধন......।।

              ............ নীলাঞ্জনা সরকার..........

প্রেম ডট কম... নীলাঞ্জনা সরকার

  একটুখানি খোলা আকাশ দেখার সৌভাগ্য যে কবে হবে! নির্মল দীর্ঘশ্বাস ফেলে...সব সুখ বিলীন হয়ে গেছে মৃন্ময়ীর সাথে। মনে আনাগোনা করে মৃন্ময়ীর সাথে...