Monday, December 5, 2022

স্পর্শ... নীলাঞ্জনা সরকার

 


          

বসন্ত এসেছিল সেদিন, যেদিন অমিয় তার সবচেয়ে প্রিয় ফুলদানিটি সাজিয়ে রাখা ছেড়ে দিয়েছিল। তার বদলে বাগানের সেরা গোলাপের সুগন্ধে ভরিয়েছিল তার মুক্তির ছবিতে বন্দি থাকা হাসিখানিকে।

         মুক্তি, সেও পায়নি শেষ যাত্রায় বসন্তের কাঁধটুকু। তবু সবকিছুর বিনিময়ে বসন্ত আজ পেল সেই স্পর্শ যা ঝরা পাতার দিনেও ঘাসের বিছানার মত সহজলভ্য। আর অমিয়... সেতো ওই পরিযায়ী পাখিদের মত মনটাকে ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল অমৃতের খোঁজে, অনেক আশায় বুক বেঁধে - এই বুঝি একটা অলীক হাতছানি তাকে কাছে ডাকে! 

 সেদিন বিকালে বাড়ির সামনের বাগানে খোলা আকাশের নিচে বসে বসন্ত অমিয়র মনটাকে বুঝে নিতে চায়। বাবাকে নিজের হাতে বানানো চা পরিবেশন করে ঠিকই কিন্তু অমিয়কে বড় উদাসীন দেখে তার কাঁধে নিজের দুটো হাত রাখে বসন্ত।

বাবা! এই শব্দটা শুনে চমকে যায় অমিয়। কতদিন পর.... যেন মনে হলো এই প্রথম কথা বলা শিখেছে বসন্ত। ঝাঁপসা হয়ে যাওয়া এই সম্পর্কটা মুক্তির সাথেই শেষ হলে ভালো হত, কিন্তু ঈশ্বরের ইচ্ছেটা বোধহয় তেমন নয়। বসন্তর ছলছলে চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে অমিয়র ইচ্ছা হলো বসন্তকে আর একবার সুযোগ দিতে, ক্ষমা করে বুকে টেনে নিতে। বাবা ছেলের এই মুহূর্তটাকে মুক্তি অলক্ষ্যে উপভোগ করলো, আকাশের কোণায় কোথায় যেন চুপকথারা খিলখিলিয়ে উঠলো। 

            বসন্ত সফ্টওয়ার ইঞ্জিনিয়ার, কর্মসূত্রে বিদেশ যাত্রা করে সময়ের সাথে ক্রমশ নিজের শিকড় থেকে অনেক দূরে সরে গিয়েছিল। ওখানে বিদেশিনী বিয়ে করেছিল মা বাবাকে না জানিয়ে। মুক্তি কিন্তু ছেলের খুশিতেই খুশি ছিলেন কিন্তু তাদের উভয়ের মধ্যে দূরত্ব তৈরি হয়েছিল বসন্তর ছেলের জন্মের পর। মুক্তি আর অমিয় তাদের নাতিকে চোখের দেখাটাও দেখতে পাননি শুধুমাত্র বসন্তর সময়ের অভাবে। এদিকে ধীরে ধীরে মুক্তির কান্না শুকিয়ে যায় কিন্তু জমা হয় ফুসফুসে জল। অমিয় মুক্তির পাশে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত ছিলে কিন্তু বসন্তকে স্ত্রীর কাছে এনে দিতে পারেনি কথা দিয়েও। তাই মুক্তি শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলে সেই খবর উনি বসন্তকে দেননি। এরপর তিন বছর কেটে গেছে। বসন্তরও জানার প্রয়োজন হয়নি মুক্তি আর অমিয় কেমন আছে! 

  রবিন বসন্তর ছেলে আর এলিসা তার আমেরিকান স্ত্রী। বিদেশে থাকলেও তারা কিন্তু প্রতি মুহূর্তে বসন্তর বাড়ির মানুষগুলোর সাথে সময় কাটানোর জন্য খুব আগ্রহী ছিল। তাই একসময় বসন্তকে হার মানতে হয় তাদের কাছে। নিজের অহংকার ভুলে ছুটে আসতে হয় নৈনিতালের সেই পরিবেশে যেখানে মুক্তির পায়ে পায়ে ঘুরত বসন্ত আর রোজ বিকালে খেলার শেষে পাহাড়ের কোলে সূর্যাস্ত দেখত। কিন্তু বসন্ত ফিরলেও তখন তো মুক্তি থামিয়ে দিয়েছিলেন তাঁর পথ চলা। বসন্তর ছোটবেলা কেটেছিল ফরেস্টের কোয়াটারে তার বাবার চাকরি সূত্রে। মুক্তির খুব পছন্দ ছিল সেই পরিবেশ,পাহাড় আর মেঘ..বৃষ্টি.. রোদের লুকোচুরি। তাই অবসরের পর নৈনিতাল ছেড়ে না গিয়ে অমিয় মুক্তির পছন্দমত একটা কাঠের বাড়ি কিনেছিল। সেই বাড়িতে এসে প্রথমবার সাত বছরের রবিন অমিয়কে ডেকেছিল -"ডাডু"....তার মিষ্টি গলায় বাংলিশ শুনে অমিয় থাকতে না পেরে জড়িয়ে ধরেছিল তাকে। এলিসা প্রথমবার ছুঁয়েছিল মুক্তির শরীর তার ছবিতে। এলিসা টিনএজ বয়সে তার মা বাবাকে এক অ্যাক্সিডেন্টে হারিয়েছিল সে খুব নরম মনের মেয়ে। লালচে কমলা বুকের আমেরিকান রবিন পাখি তার খুব প্রিয় তাই সেই নামের সাথে মিলিয়েই ছেলের নাম। বাঙালি ছেলের সাথে বিয়ে হওয়ার কিছুটা বাংলাও শিখেছে এলিসা, বলতে পারে কিছুটা কিন্তু বুঝতে পারে অনেকটাই। রবিনও মায়ের দলে। অমিয়র সামনে প্রথম দিন এসেছিল সে একটা লাল শাড়ি পরে, বলেছিল তাকে এলি বলে ডাকতে। গত পনেরো দিন ধরে এলি আর রবিন বেশ চেষ্টায় আছে অমিয়র বন্ধু হওয়ার, অমিয় যখনই তার চশমা খুঁজে পায় না এলি এনে দেয় হাতের কাছে, বই পড়তে বসলে এলি আর রবিন বলে তাদেরও শোনাতে। এছাড়া বিকালের পড়ন্ত আলোয় অমিয় যখন মুক্তিকে খোঁজে তখন হালকা ঠান্ডায় শালটা গায়ে জড়িয়ে দেয় এলিই। এভাবেই অজান্তে তিনটি ভিন্ন বয়সের মানুষের মধ্যে একটা সম্পর্ক তৈরি হয়। 

  এমনি এক বিকালে দাদু আর নাতি বসেছিল বাড়ির সামনের ছোট বাগানে, আর এলি দাঁড়িয়ে ছিল একটু দূরে। তাকে চুপচাপ দেখে অমিয় জিজ্ঞেস করে, 

-বসন্ত কোথায়? 

এলি বলে - কোটায় আর! উইথ ল্যাপটপ।

রবিন তাদের কথায় যোগ দেয়। সে তার দাদুর গলা জড়িয়ে ধরে বলে, -ডাডু, মম্মি মিস করে।

- কাকে দাদুভাই?

- বার্ডস।

অমিয় এলিকে কাছে ডাকে। সে এসে পাশের বেতের চেয়ারটাতে বসে। 

- এলি, তুমি খুব পাখি ভালোবাসো?

- ইয়েস বাবা, হামি উদের পিকচার টুলি। আই লাভ টু স্পেন্ড টাইম উইথ দেম। 

- তুমি ফটোগ্রাফি ভালোবাসো জানতাম না তো? আমারও একসময়ে খুব সখ ছিল। তোমায় আমার তোলা ছবির অ্যালবাম দেখাব একদিন।

- সিওর বাবা। হোয়াটস সে রবিন?

- ডাডু ইটস আওয়ার প্লেজার।

এলি খুব খুশি হয়ে যায়। সে বলতে থাকে অনেক কিছু। তার মম আর ড্যাড মারা যাওয়ার পর নিজেকে সামলেছিল এই ফটোগ্রাফির মধ্যে দিয়ে, পরে এটা তার প্যাশন হয়ে ওঠে।

রবিন তার পর থেকে প্রায়ই অমিয়কে বলতে থাকে সেই অ্যালবামের কথা। বসন্ত জানতে পেরে বলে,

-বাবার ছবি তোলা তো কাজের সুত্রে। ছবির সাথে সাথে গল্পগুলোও বলে দিও বাবা। ওদের সময় কাটবে।

- টুমিও জয়েন করো পাপা।

- ইউ নো বেবি, আই ডোন্ট হ্যাভ এনাফ ফ্রি টাইম।

অমিয় চুপ করে দেখে বসন্তকে আর ভাবে রবিন যেন বড় হয়েও শৈশবটা ভুলে না যায়।

ততক্ষণে অভিমান হয়ে গেছে রবিনের, এলি গিয়ে তার মান ভাঙায় আর বলে - 

- বাবা, টুডে নাইট হামি আর রবিন টোমার স্টোরি শুনবে অ্যান্ড স্ন্যাপ দেখবে। টুমি কিনটু না করে পারবে না।

অমিয় হো হো করে হেসে উঠে রাজী হয়ে গেল নতুন দুই বন্ধুর প্রস্তাবে।

রাতে ডিনার শেষ করে তিনজনে বসে, অমিয়র কাছে একটা বেশ বড় অ্যালবাম। তার প্রতি পাতায় অমিয় আর সাথে নানারকম জন্তুর ছবি। একটা পাতায় এসে আটকে যায় অমিয়... সেখানে তার কোলে একটি বাঘের শাবক। সে বলে..

-রবিন, এই গল্পটা অবশ্যই বলবো তোমাদের। আজ থেকে বেশ কিছু বছর আগে আমি সিনিয়র ফরেস্ট অফিসার পদে প্রোমোটেড হই। জঙ্গলে রোজ সকালে আর বিকালে একবার করে টহল মারতে হত আমায় জীপে করে। এমনি একদিন বিকালে জীপটাকে জঙ্গলের রাস্তায় একটু সাইড করে আমার ড্রাইভার আর একজন কর্মচারীর সাথে গল্প করছি, কানে এলো অদ্ভুত একটা আওয়াজ! একটু এদিক ওদিক তাকাতেই দেখি একটা ছোট্ট বাঘের শাবক। বুঝলাম বেশিদিনের নয় সে। কিন্তু বাঘ তো এত হালকা জঙ্গলে ঘোরে না, তাই বেশ অবাক হলাম। ওর মা কাছাকাছি থাকলে আমাদের বিপদও কম নয়। তবে বাচ্চাটাকে রেখে যেতেও মন করলো না, কারণ অন্ধকার হলে অন্য বুনো জন্তু ছিঁড়ে খাবে। নিয়ে নিলাম সাথে। কিন্তু ওটাকে রাখবো কোথায় সেই নিয়ে খুব চিন্তায় পড়লাম কারণ একেবারে দুধের শিশু, তারপর মনস্থির করলাম বাড়ি নিয়ে আসবো। কিন্তু আমার ড্রাইভার আমায় মানা করলো। তার মতে ওই বাচ্চার খোঁজ করতে গিয়ে কোনো কারণে তার মা যদি আমাদের সন্ধান পায় তখন সে সাংঘাতিক আঘাত আনতে পারে, আর তা আমি একা আটকাতে পারবো না। তাই শাবকটি অফিস ঘরেই থাকবে বলে স্থির হলো, সেখানে বাঘ আসলে প্রতিরক্ষার অনেক ব্যবস্থা আছে। শাবকটিকে কোনরকমে একটু দুধ খাওয়ানো হলো রাতে, কিন্ত সে কিছুতেই চামচে থেকে মুখ দিয়ে ভালো করে খেতে পারলো না। পরদিনও সেই একই ঘটনা, বুঝলাম এভাবে আধপেটা খেয়ে বাচ্চাটা বাঁচবে না। ওকে যেভাবেই হোক মায়ের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। তোড়জোড় শুরু করলাম আমরা। জঙ্গলের কোণায় কোণায় কড়া নজরদারি শুরু হলো, যদি কোনো সদ্য প্রসবা বাঘিনীর সন্ধান পাওয়া যায়। কিন্তু সব বেকার হলো। ততদিনে আমার গিন্নি একটা বাচ্চাদের দুধ খাওয়ায় বোতল কিনে দিয়েছিল আমায়, আর আমাদের পোষ্যটিও তাতে একটু হলেও দুধ টেনে খাচ্ছিল। 

রবিন মাঝখানে বলে উঠলো, 

-ও মাই গড! টোমার গিন্নি টো ভালো ইন্টেলিজেন্ট।

- তুমি জানো গিন্নি কাকে বলে?

- নো, বট আই গেস কি ও টোমার ফ্রেন্ড আছে।

- না রে পাগল। গিন্নি হলো বউ মানে ওয়াইফ। আমার বউ আর তোমার ঠাকুমা।

এলি চুপ করে বসায় রবিনকে। অমিয় আবার শুরু করে।

আসলে আমার গিন্নি আমার সাথে থেকে এই পরিবেশের প্রেমে পড়ে গিয়েছিল, সিনেমাও দেখতো নানারকম। সে নাকি "বর্ন ফ্রী" নামে কি একটা মুভি দেখে ওই বোতলের আইডিয়া পেয়েছিল। সে যাই হোক। কিন্তু এভাবে তো চলতে পারে না, কি বলো রবিন! যদি মা আর বাচ্চা আলাদা হয়ে যায় তাহলে কত কষ্ট তাই না.... থেমে যায় অমিয়। গলা ভারী হয়ে আসে তার। মুক্তির কথা মনে পরে যায়। এলি বুঝতে পেরে শ্বশুরের হাতে হাত রাখে, বলে...

-আই নো। ডোন্ট বি সো আপসেট। আজ এন্ড কর।️ কাল আবার বলো।

- না রে মা। আমি ঠিক আছি। আমি বলবো, রবিনের জন্য। চোখের জল মুছে অমিয় বলে চলে..

এরপর আমরা ঠিক করলাম এক দুদিন শাবকটিকে ঠিক সেই জায়গায় রাতে রেখে আসার যেখান থেকে ওকে আমরা পেয়েছিলাম। একদিন দুপুরের দিকে আমরা কয়েকজন মিলে গিয়ে একটা ছোট গর্ত খুঁড়লাম আর তার চারপাশে কিছু শুকনো গাছের ডাল দিয়ে পাঁচিল মতো করলাম যাতে বাচ্চাটা গর্ত থেকে বেরিয়ে জঙ্গলে হারিয়ে না যায়। কিন্তু সারারাত কি হবে তা তো আগে থেকে বলা মুশকিল ছিল, অনেক চিন্তা ঘুরছিল মনের মধ্যে। একবার ভেবেছিলাম আর বুঝি শিশুটিকে সকালে ফিরে পাবো না...এসে দেখবো গর্ত খালি আবার এও মনে হয়েছিল সাপের কামড়ে যদি কিছু অঘটন ঘটে! সব ভেবে সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম অনতিদূরে একটা বড় গাছে ক্যামেরা লাগানোর। যদিও খুব বেশি রকম সমস্যা হলে তদন্তের স্বার্থে জঙ্গলে এই ক্যামেরা লাগানো হয় তবুও ওই শাবকটির জীবনের ঝুঁকি নিতে পারবো না ভেবে সেবার আমরা এই ব্যবস্থাই নিয়েছিলাম। সবরকম আয়োজন করতে বেশ সন্ধ্যে হয়ে যাওয়ায় সেদিন ফিরে আসি। সেই রাতটা আমি আর মুক্তি খুব চিন্তায় ছিলাম। রবিন, তখন তোমার বাবা ক্লাস এইটে পড়তো। তখনকার বসন্ত আর এখনকার মধ্যে অনেক তফাৎ। আমাদের ভালো-মন্দের সাথে তখন ও যেভাবে জুড়ে থাকতো এখন তা কল্পনাও করতে পারি না। সত্যি, সময় কত পাল্টে গেছে! জানো, রবিন তোমার বাবা তখন ওই ছোট্ট বাঘের শিশুটাকে নিয়ে কত পাগলামি করেছিল! আমাকে বলেছিল বাবা ওর কিছু হবে নাতো তোমাদের এই এক্সপেরিমেন্ট... যদি বাচ্চাটার কিছু হয় আর পরে যদি ওর মা ওকে খুঁজতে আসে তখন?

এলি থামায় অমিয়কে। বলে,

- আই নো হি ইজ এ ডিফারেন্ট পারসন নাউ বাট.... কথা শেষ করতে পারেনা এলি। চোখ থেকে জলের ফোঁটা নেমে আসে, গলা বুজে আসে, চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই দিন যেদিন এলির সাথে প্রথম দেখা হয়েছিল বসন্তর। সাদা টি-শার্ট আর ব্রাউন প্যান্টের সুপুরুষ ব্যক্তিত্বময় সেদিনের বসন্ত আজ যেন কিছুটা হলেও এলির কাছে অজানা হয়ে উঠেছে। এলি বোঝে কাজের অনেক চাপ বসন্তর তবে তার চেয়েও অনেক বেশি স্ট্রেস ওপরে ওঠার, বসন্ত যে আকাশ ছুঁতে চায়। তার অ্যামবিশন তাকে সব কাছের মানুষ থেকে অনেক দূরে নিয়ে যাচ্ছে, যেখান থেকে তার সন্তানের ভালোবাসার চুমুটাও অধরা। নিজেকে সামলে নেয় এলি। অমিয় আর এলি যেন একটি বইয়ের ভিন্ন কবিতা যার আভ্যন্তরীণ অর্থ, ছন্দ, লয় একই শুধুমাত্র ব্যাখ্যা আলাদা। তাই একে অপরকে সহজেই বুঝতে পারে সামলাতে পারে। এদিকে রবিন অধৈর্য হয়ে উঠল সে তাড়াতাড়ি দাদুকে গল্পটি শেষ করতে বলে। অমিয় বলে,

- সত্যি দাদুভাই আমারও এমন হাল হয়েছিল সেদিন এই গল্পের শেষটা তাড়াতাড়ি চোখের সামনে দেখার জন্য। যেখানে শেষ করলাম পরদিন সন্ধ্যে হলে বাচ্চাটাকে দুধ খাইয়ে আমরা সেই জায়গায় পৌছালাম যেখানে গর্ত আর ক্যামেরা সব রেডি রেখেছিলাম। শাবকটিকে ওই গর্তে রেখে আমরা গাড়িটাকে একটু দূরে একটা গাছের আড়ালে রাখলাম আর রাত আটটা অবধি অপেক্ষা করলাম। কিছু হল না, তবুও ভয় হচ্ছিল যদি শেয়াল আসে তবে আমাদের তাকে তাড়াতে হবে আর তখন যদি আশেপাশে অন্যকিছু সতর্ক হয়ে যায় কারণ রাতের পর রাত তো এভাবে বাচ্চাটাকে ফেলে রাখা যাবেনা। আমরাও রোজ রাত জেগে পাহারা দিতে পারব না তাই যা ব্যবস্থা করার খুব তাড়াতাড়ি করতে হবে। সেদিন বাড়ি ফিরে সারা রাত দু চোখের পাতা এক করতে পারিনি খালি মনে হচ্ছিল মা তার সন্তানের দেখা পাবে তো আর আমার এ প্রশ্নের উত্তর একমাত্র সকালের সূর্যোদয় বলতে পারতো। তাই শুধুই ছিল অনন্ত অপেক্ষা। ভোর হতেই ছুটে যাই আর দেখি বাচ্চাটা নেই, প্রথমেই নেগেটিভ মনে হয়েছিল কি হলো! খারাপ কিছু নয় তো? তারপর ক্যামেরা নামানো হয় তাতে যা দেখি তাতে মনে হয় সত্যিই সর্ব শক্তিমান বলে কিছু আছে তা না হলে এ অসম্ভব সম্ভব হয়না কারণ ক্যামেরায়....

রবিন দাদুর মুখের কাছে ঝুঁকে বলে - ডাডু, প্লিজ এক্সপ্লেইন মি... কুইকলি! 

অমিয় জল খাচ্ছিলো তাড়াতাড়ি নাতিকে বলে,

- হ্যাঁ ভাই, দাঁড়াও একটু! গল্প বলতে বলতে গলা যে শুকিয়ে এসেছে বুড়ো হয়েছি তো। 

এলি আর রবিন হেসে ওঠে।

- আসলে ক্যামেরায় দেখি.. শুনশান অন্ধকারে ছোট্ট ছোট্ট পায়ে শাবকটি বারবার গর্ত থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করেছিল তারপর বেশ কিছুক্ষণ তার আর কোনো মুভমেন্ট ছিল না। বোধহয় সে ঘুমিয়ে পড়েছিল। তারপর একটা বড় সাপ চলে যায় গর্তের পাশ দিয়ে। এরপর বাচ্চার ঘুম ভাঙলে তার খিদে পাওয়ার দরুন সে আওয়াজ করতে থাকে। আরও কিছু পরে এক বাঘের আওয়াজ পাওয়া যায় বোধহয় এই শাবকের আওয়াজের উত্তরেই। কিছুক্ষণ পর ক্যামেরায় শাবকটির মা-বাবাকে দেখা যায়। তারা এসে প্রথমে গর্তের চারপাশ ভালো করে নিরীক্ষণ করে তারপর বাচ্চাটিকে মুখে করে গর্তের বাইরে আনে। এর পরের দৃশ্য খুবই মনোহর ছিল। বাচ্চাকে ফিরে পেয়ে মায়ের কি আদোর! গালে গাল ঘষে, জিভ দিয়ে চেটে ..সে দৃশ্যের বর্ণনা আজ বলে বোঝাতে পারব না আর মা সন্তানের এই লীলাখেলার সাক্ষী ছিল তাদের বাবা আর আমরা ক্যামেরার মাধ্যমে। আজ সত্যিই ভাবি তাদের পরিবারকে সম্পূর্ণ করতে পেরেছিলাম এ আমার বড় ভাগ্য সাথে মুক্তির আর আমার পুরো টিমের। 

এই গল্পটা শেষ করে অমিয় রবিনকে বলে, 

-দাদুভাই বাকি আবার কাল বলব আজকে খুব ক্লান্ত লাগছে এতক্ষণ টানা কথা বলার অভ্যেস আমার চলে গেছে। ফাঁকা বাড়িতে এখন তো আর কেউ নেই আমার সাথে গল্প করার জন্য। আজ অনেকদিন পর তোমাদের সাথে পুরনো কথা শেয়ার করে খুব ভালো লাগলো। 

রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর এলি ছাদ বারান্দায় দাঁড়ায়, সামনের খোলা আকাশটাকে দেখে তার মা বাবার কথা মনে পড়ে। অমিয়কে যত দেখছে ততো অবাক হচ্ছে এলি! আজকের যুগে একটা মানুষ এতটা নির্ভেজাল হতে পারে এ তার কল্পনার অতীত। সত্যি, বসন্ত কত বোকা! এমন ফ্যামিলির সান্নিধ্য ছেড়ে যে পয়সার পেছনে ছোটে তাকে আর নতুন করে কিছু শেখাবার থাকেনা। সব পেয়েও সে আসলে সত্যিকারের অভাগা। এলি উপরে তাকায় ...তারাগুলো কেমন ঝিকমিক করছে। ড্যাড মম নিশ্চয়ই আজ ওপর থেকে তাকে দেখছে। একা হলেই এলি তাদের সাথে গল্প করে, মনের সব কিছু উজার করে দেয় যা আর কাউকে বলা যায়না। আজও এলি ফিসফিসিয়ে উঠলো-

- মম, ডিড আই ডু সামথিং রং দ্যাট মাই লাভ চেঞ্জড সো মাচ! আই ডিড নট ওয়ান্ট এনিথিং বাট লাভ ফ্রম হিম, দেন হোয়াই ...হোয়াই মম! এস মাচ এস আই সি হিজ ফাদার আই রিমেম্বার মাই ড্যাড। দেয়ার ওয়াজ নো ল্যাক অফ হ্যাপিনেস ইন আওয়ার ফ্যামিলি দেন অ্যান্ড নাও হাউ রিচ উই আর টুডে বট মাই হাজবেন্ড হ্যাস নো টাইম ফর মি এন্ড মাই সন।

পিছনে কখন অমিয় এসে গেছিল বোঝেনি এলি। সে এলির কাছে এসে বলে,

- তুই এতো দুখী কেন রে মা? জানি আমার ছেলেটা দৌড়াচ্ছে আসলে আমরা ওকে যেভাবে বড় করেছিলাম আজ ওকে দেখে সত্যিই কষ্ট হয়। তবু বলি বসন্ত এতটাও খারাপ নয় রে ওর মনটা ভালো। আমার তো সত্যিই খুব রাগ হতো কিন্তু মুক্তি আমায় বোঝাত, ও বলতো দেখো ..আমাদের ছেলের তো একটা জীবন আছে আমরা ওকে আঁকরে ধরে থাকলে ওর প্রতি অন্যায় করা হবে। তাই বসন্তকে অনেক ছুট দিয়েছি জীবনে। সেটাই বোধহয় একটু ভুল হয়ে গেছে আমাদের সম্পর্কগুলোর গভীরতা ভুলে গেছে ও। তবে ওকে একটু সময় দে দেখবি তোর পুরোনো মানুষটাকে ঠিক ফিরে পেয়েছিস। আমাদের মধ্যেও অনেক ভুল বোঝাবুঝি আছে বিশেষ করে মুক্তির জন্য আমি আজও বসন্তকে ক্ষমা করতে পারিনি তবু বাবা তো তাই তোদের সবাইকে দেখে মনটা নরম হয়ে গেল। ঠিক তেমনি আমার বসন্ত এতটা কঠিন নয় যতটা ওকে বাইরে থেকে লাগে। তুই দেখ না কিছুতো টান আছে ওর, তাই ও তোকে বাংলা শিখিয়েছে, আমি মন খুলে তোর সাথে গল্প করছি। এটুকু তো কম প্রাপ্তি নয় আমার ছেলের কাছ থেকে।

এলি চোখের জল মোছে ...মনে মনে ভাবে হোপ সো।

 পরদিন সকাল হতেই রবিন হাজির দাদুর কাছে, চোখে মুখে তীব্র কৌতূহল আজ কোন গল্পটা হবে তাই নিয়ে। অমিয় বলল .. 

 - কি দাদুভাই রাতে ঘুম হলো তো নাকি ওই বাঘের বাচ্চার সাথে সারারাত খেললে?

- হোয়াট! টাকে হামি কোটায় পাবো? আর পেলেও ইস ইট পসিবল টু প্লে উইথ দেট কাব! ডাডু আর ইউ জোকিং?

- কেন গো? বাঘের ছানা তো কি হয়েছে! সব জন্তুই ভালোবাসা বোঝে। জানো আমাদের বাড়িতে এমন একটা জিনিস ছিল যাকে সবাই ভয় পেত কিন্তু তোমার বাবা আর আমরা তাকে চোখে হারাতাম।

এলি যোগ দেয়। অমিয় ভাবে বসন্তর নরম মনের পরিচয়টা তার পরিবারকে দেওয়া উচিত। আজ তার ছেলে বদলে গেছে কিন্তু অমিয় জানে তারাদের মধ্যে থেকে মুক্তি আজও বিশ্বাস রাখে বসন্ত ফিরবে। তাই পুরোনো ভালোবাসার কথাগুলো আজ মনে করিয়ে দিতে চায় অমিয় বসন্তকে।

এলিকে সে বলে বসন্তকে ডেকে আনতে। এলি হাবে ভাবে বুঝিয়ে দেয় বসন্ত বোধহয় কাজ ফেলে আসবেনা কিন্তু অমিয় জোর দেয়। এলিকে বলে আসতে না চাইলে বোলো জলির গল্প বলবো। এলি অবাক হয়ে তাকায়, অমিয় তাকে আশ্বস্ত করে। সে চলে যায় ডাকতে। সত্যিই বসন্ত আসে গল্পে যোগ দিতে। ওপরের ঘর থেকে প্রায় দৌড়ে নেমে আসে সে অমিয়র কাছে এসে বলে,

- বাবা, জলির কথা আজও মনে আছে তোমার? অমিয় হাসে। 

- হু ইস জলি?

রবিনের প্রশ্নে অমিয় বলে,

- বলবো দাদুভাই আজ আমাদের জলির কথাই বলবো। চলো আজ আমরা একটু রোদ পড়লে সামনের ছোট্ট পাহাড়টার কাছে যাব।

- কি দরকার বাবা? নতুন করে এসব আমার আর ভালো লাগেনা।

- বসন্ত একটা কথা বলি বাবা, তোমার আমার সম্পর্কটা হয়তো আর আগের মতো নেই কিন্তু তোমার পরবর্তী প্রজন্মের সম্পূর্ণ অধিকার আছে আমাদের বাড়ির সব কিছুর সাথে জুড়ে থাকার। জলি আমাদের পরিবারের একজন তাই তার কথা তো বলতেই হবে।

- এভাবে বোলোনা বাবা। আমি কোনদিন জলিকে আমার নিজের থেকে দূরে করিনি আজ এতদিন পরেও। হয়তো আমি তোমাদের মত করে প্রকাশ করতে পারি না তা বলে আমি এতটাও পাষাণ নই। আমি পুরোনো ক্ষতের জায়গাগুলো খোঁচাতে ভয় পাই তাতে ভালোলাগাগুলো অনেক দূরে সরে যায়। তখন আর বর্তমানে মন বসাতে পারা যায় না। 

- তবু তুমি কি অস্বীকার করতে পারো আমাদের মনের ঘরেই মনের খবর লুকিয়ে বসে থাকে! তাতে টক মিষ্টি ঝাল সব রকম স্বাদই থাকে। কখনো কখনো অপছন্দগুলোকে উল্টেপাল্টে না দেখলে মিষ্টির মহত্ব বুঝবে কেমন করে? দেখো আজ এতো বছর পর তুমি ফিরলে কিছুদিনের জন্য হলেও। তবুও তুমি কি অস্বীকার করতে পারো কদিন আগে ফিরলে তোমার মনের মনিকোঠায় মিষ্টি স্মৃতির ভান্ডার বাড়তো। বৌমা আর রবিন আমার খুব কাছের, এই কদিনের মধ্যে তারা যে ভাবে আমাকে বুঝেছে তা বোধহয় এত বছরেও তুমি পারোনি। 

-বাবা! এই কথা তুমি বলতে পারলে? আমি যোগাযোগ রাখতে চাই নি তা নয় আমার এত কাজের চাপ....বসন্তকে কথা শেষ করতে দেয় না অমিয়। বলে,

-আমাকে কাজ দেখিও না বসন্ত। আমি জলে ঝড়ে জঙ্গলে জঙ্গলে ঘুরে বেরিয়েছি প্রাণের মায়া ত্যাগ করে। অনেক সুরক্ষা ছিল ঠিকই তবু জীবন ছিল অনিশ্চিত। তার পরেও আমি মুক্তি আর তোমার প্রতি কোনো অবহেলা করিনি আর তুমি তো তোমার মায়ের খুব কাছের ছিলে তাকে কি কোনদিন দেখেছো কোন বাহানা দিয়ে পরিবারকে দূরে সরিয়ে দিতে? 

আজ এসব কথা থাক যে কটা দিন এখানে আছো আমি চাই পুরনো দিনের মত বাঁচতে.. আমার দাদুভাই আমার বউমা আর তুমি ছাড়া আর কে আছে আমার আপনজন? তাই সবার সাথে আমার সুখময় মুহূর্তগুলো ভাগ করে নিতে চাই। মুক্তির বিষয়ে নতুন করে তো কিছু বলার নেই আমার বৌমা দেখছি সবই জানে তোমার কাছে গল্প শুনে। তোমাকে তার জন্য অনেক ধন্যবাদ, অন্তত মাকে এভাবে মনে রেখেছো! 

বসন্ত, এলি আর রবিন দেখতে থাকে অমিয়কে। আর সে বলতে থাকে,

-বসন্ত যখন ছোট ছিল তখন আমাদের পরিবারের সদস্য হয় জলি। কাল জঙ্গলের অনেক ছবি দেখিয়েছি আর সবচেয়ে মিষ্টি ঘটনাটা তোমাকে বলেছি রবিন। আজ বলবো আমার পরিবারের আরেক সদস্যের কথা। চলো সবাই বেরিয়ে পড়ি ওই পাহাড়টার কাছে। ওখানে না গেলে যে আমার জলির গল্প অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।

পাহাড়ের কাছে আসে ওরা। মিষ্টি রোদ চারপাশে ঝলমল করছে। বাঁদরের কিচিমিচি শোনা যাচ্ছে। অমিয় বলে,

- জানোতো দাদুভাই জঙ্গলের ভেতর এই বাঁদরের আওয়াজ শুনে বাঘ আসে। আসলে বাঁদরেরা যত না খায় তার চেয়ে বেশি নষ্ট করে তাই সেই সব গাছগুলোর নিচে হরিণের আবির্ভাব হয় আর সেটা বাঘ বাবাজি জানে। তবে ভয় পেওনা এখানে বাঘ আসবে না। ওই যে একটা গাছ দেখতে পাচ্ছো ওটার নিচে আমার জলি আছে... আমাদের জলি। 

- বাট হু ইজ জলি? বলেই যাচ্ছ জলি.. জলি! বাট ও কে আছে?

 রবিনকে একটা ছোট পাথরের উপর বসায় অমিয়। নিজে বসে তার ঠিক পাশে আর জলির গল্প শুরু করে,

-জলি একটা পাহাড়ি সাহসী কুকুর। খুব ছোট্ট বয়সে ও আমাদের বাড়িতে আসে। তখন তোমার বাবা স্কুলে পড়ত। আমার ড্রাইভার জলিকে কুড়িয়ে পেয়েছিল, আসলে ওর মাকে কোন এক জংলি জানোয়ার মেরে ফেলেছিল। তার আধ খাওয়া শরীরের পাশ থেকে জলি আর তার বোনকে পাওয়া গেছিল। কোথায় নিয়ে যাবে বাচ্চা দুটোকে তাই প্রথমেই মুক্তির কাছে নিয়ে এসেছিল। মুক্তির মনটা বড় নরম ছিল কাউকে ফেলতে পারতো না। সেই ওদের যত্ন করে রেখেছিল কিন্তু হপ্তা দুয়েক পর জলির বোন মরে যায়। রবিন তোমার বাবা তখন আরো বেশি করে জলিকে আঁকড়ে ধরে। জলির বোন দুধের শিশু অবস্থায় মারা যায় তাই দেখে বসন্ত স্বজন হারানোর দুঃখ পেয়েছিল। রবিন তুমি জানো স্বজন কাকে বলে?

- নো ডাডু। পাপা, হোয়াট ইজ সজন?

-খুব আপনার জন যেমন তুই আমার, বসন্ত এগিয়ে এসে রবিনকে কোলে নেয়। অনেকদিন পর তার কপালে স্নেহের পরশ রূপে গভীর চুমু খায়।

এলি খুব খুশি হয়, সে এসে বসন্তকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে। উঠে দাঁড়ায় অমিয়, এগিয়ে যায় জলির শেষ শয্যার দিকে। আকাশের দিকে তাকিয়ে বলে, মুক্তি! তুমিতো এই দিনটার অপেক্ষায় ছিলে তাই না? চোখে জল এসে যায় তার। ততক্ষনে রবিন চলে এসেছে তার দাদুর কাছে। জিজ্ঞেস করে সে জলির কি হয়েছিল?

-জলি আমার আরেকটা ছেলের মত ছিল। সকাল বিকেল তার আবদার রাখতেই তোমার ঠাকুমার অবস্থা কাহিল হত। খুব চঞ্চল ছিল জলি। কিছুতেই একজায়গায় থাকত না তাই আমাদের খুব ভয় হতো। আমরা তখন ফরেস্টের কোয়াটারে থাকতাম তাই এদিক ওদিক ছুটে গিয়ে যদি জঙ্গলের বিপদের মুখোমুখি হত সে, সেই ভয় পেতাম সারাক্ষণ। জলি একটু বড় হলে আমি জঙ্গল সফরে জীপে ওকে সঙ্গে নিতাম। প্রতি সফরের পর তখন আমি সিগারেট খেতাম কারণ এই সফরে বন্দুক নিয়ে গেলেও সব সময় খুব টেনশনে থাকতাম আর সফর শেষে এই ধোঁয়ার টান আমায় রিলাক্স করতো। জলি কিন্তু একদম এই ধোঁয়া পছন্দ করত না সে যতটা রোমান্স ও আনন্দ পেত জঙ্গলের পথে ঠিক ততটাই বিরক্তি দেখাতো সফর শেষে। ওর এই না পছন্দ আমার খুব মজা লাগতো। আমিও আস্তে আস্তে পাখির কাকলি, পাতার মর্মর শব্দ, হরিণের লুকোচুরি আর বানরের ডাক শুনে আমার মনটাকে অন্যদিকে ভুলিয়ে রাখতে শিখলাম যাতে সিগারেট না খেতে হয়। আমার বন্ধুরা অবধি বলতো আমার গার্জেন হল আসলে জলি। আমার সাথে থেকে থেকে জঙ্গলে নিঃশব্দে চলাফেরার কায়দা শিখে গিয়েছিল জলি। ফলে আমাদের বাড়িতে বাইরের কোনো লোক আসতে দুবার ভাবতো কখন জলি নিঃশব্দে এসে তাকে ভয় দেখাবে সেই ভেবে! তবে বসন্ত খুব সুন্দর ট্রেনিং দিয়েছিল জলিকে সে কখনো কাউকে কামড়ায়নি। 

- হোয়াট ডিড জলি লুক লাইক? লিসেনিং টু হিজ স্টোরি ইট সিমস এস ইফ আই কুড গেট ক্লোজ টু হিম! 

এলির কথার উত্তরে অমিয় কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে, তারপর বলে...

- ভাগ্যিস তুমি তাকে দেখোনি তাহলে তার অনুপস্থিতি তোমাকে আজও তাড়া করে বেড়াতো। সে ছিল ঘন কালো পশমের মতো, সাহসিকতায় ভরা মুখে উজ্জ্বল দুটি মায়া ভরা চোখ তোমায় হিপনোটাইজ করে ফেলত, যেমন আমাদের করেছিল। পাহাড়ি কুকুর হওয়ার দরুন ওর গতি খুব তীব্র ছিল। লেজটা ছিল লোমশ এককথায় বলতে পারো আমাদের জলি খুব হ্যান্ডসাম ছিল। তবে কাল হলো ফরেস্টের চাকরি। আমার চাকরির দরুন অনেকেই আমার শত্রু ছিল। পরোপকারী বন্ধুরা সর্তক করলেও কখনো কখনো অজান্তেই কিছু লোকের রোষের মুখে পড়তাম আমি। তখন মাধব বলে একজন প্রায়ই আমাকে ধমকাতো। সে ছিল জঙ্গলের সাফাই কর্মীদের একজন। আমি তাকে একবার হাতেনাতে ধরে ছিলাম সাপের বিষ পাচারের সময়। সে সাপ দেখতে পেলে ধরে সাপটিকে মেরে অথবা জ্যান্ত অবস্থায় তার বিষ সংগ্রহ করে চালান দিত আর পয়সা পেত। পাহাড়ি এলাকায় চোরাকারবারি কম ছিল না। এই বিষ দিয়ে কত রকমের ওষুধ বানিয়ে সাধারণ মানুষকে ঠকানো হত। আমি তার এই ব্যবসায় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। তবে আমার খুব ভুল হয়েছিল তার আর্থিক অবস্থার কথা ভেবে তাকে কাজে রেখে দেওয়া, তার নামে উপর মহলে নালিশ না জানানো। একদিন তো সাংঘাতিক ঝামেলা হয়- সে আমাকে শাসায়, দেখে নেবে বলে। জলি সেদিন আমার সাথে ছিল আর বসন্তও। আমার খুব রাগ হয়ে গেছিল কিন্তু বসন্ত আমাকে ভুলিয়ে বাড়ি ফেরত নিয়ে আসে কিন্তু জলিকে দেখে বুঝেছিলাম মাধবকে সামনে পেলে সে ছেড়ে দেবে না। দুদিন পর রাতে শুয়ে আছি তখন একটা ঝুপ করে আওয়াজ হয়, আমার ঘুম ছিল খুব পাতলা ফলে চট করে উঠে আমি বারান্দায় আসি। কিছু দেখতে পাই না অন্ধকার বলে, তাই আবার ঘর থেকে টর্চটা নিয়ে আসি। রাতে আমরা জলিকে বেঁধে রাখতাম না। টর্চের আলোয় পাঁচিলের চারপাশটা ভালো করে দেখি। পাঁচিলটা কাঁটাতারে ঘেরা ছিল ফরেস্ট এর মধ্যে বলে। তাতে চোখে পড়ে এক জায়গায় খানিকটা তার কাটা। একটু হলেও ভয় পেয়ে যাই আমি চিৎকার করে ডাকি জলিকে কিন্তু তার সাড়া পাই না। ততক্ষনে আমার চিৎকারে মুক্তি আর বসন্ত দুজনেই উঠে আসে আমার কাছে। আমরা তিনজন সামনের বাগানটায় ছুটে যাই কোথাও পাই না জলিকে।

অমিয়কে থামিয়ে দিয়ে বসন্ত বলে সেই রাতের বাকি ঘটনা। সব শুনে কুঁকড়ে যায় এলি।

- বাবা, সেই রাতটা এখনো মাঝে মাঝে আমার দুঃস্বপ্নে আসে। কি করে ভুলি বলোতো জলির রক্তেভেজা শরীরটা। কে আমাদের জলিকে কেড়ে নিয়েছিল তা বুঝতে বাকি ছিল না তবু প্রমাণের অভাবে আমরা তাকে শাস্তি দিতে পারিনি। সে ঘুরে বেরিয়েছে বুক ফুলিয়ে। 

- সত্যি বসন্ত, আমার জলি প্রাণ দিয়ে আমাকে বাঁচিয়েছিল। তোরা খুব কেঁদেছিলিস। আমি শত চেষ্টা করেও জলিকে ফিরিয়ে দিতে পারিনি তোদের কাছে। ছুরি বিদ্ধ নিষ্প্রাণ শরীরটা কোলে করে নিয়ে এসেছিলাম এখানে। মুক্তি বলেছিল এই পাহাড়ের কোলটাই জলির আত্মাকে শান্তি দেবে। ছোট থেকে অনেকবার জলি এই পাহাড়ের কোলে এসেছিল সূর্যাস্ত দেখতে। এখানে এলে ও আর বাড়ি ফিরতে চাইতো না। 

বসন্ত মাটিতে বসে কেঁদে ফেলে, আঁকড়ে ধরতে চায় জলিকে। রবিন তার মাকে জড়িয়ে ধরে আর অমিয় নিজের ভাবনার অন্দরমহল খুলে ধরে মুক্তির কাছে।

বসন্ত নিজেকে সামলে বাবাকে বলে তাদের সাথে যেতে, তাদের কাছে থাকতে। অমিয় হেসে বলে,

- আমি চলে গেলে মেঘ পিয়ন জব লেস হয়ে যাবে যে। তার হাত দিয়ে রোজ তোর মাকে চিঠি লিখে পাঠাই । তোদের বিদেশি মেঘ আমাদের বুড়ো বুড়ির ভালোবাসার, স্পর্শকাতরতার ভার বহন করতে পারবে না রে। আর জলি, আমৃত্যু তার খেয়াল রাখব কথা দিয়েছিলাম যে। অন্য কোথাও গিয়ে মরেও সুখ পাবো না রে আমি। তার চেয়ে এই ভালো, মনের স্পর্শগুলোকে বাঁচিয়ে রাখা ...স্মৃতিরূপে অ্যালবামে সাজিয়ে নেওয়া। এর জোরেই তো সম্পর্কগুলোকে বেঁধে রাখা যায়। এ বড় কঠিন কাজ রে। এই করতেই আমার বাকি দিনগুলো কেটে যাবে। 

সূর্য মধ্য গগনে। আর বয়সের ভারে ঝুঁকে পড়া অমিয় তার নির্ভেজাল ব্যাক্তিত্বের প্রতিটি অনুভবে ভরিয়ে দিলেন নাতির মন, টেনে আনলেন তাকে মাটির কাছাকাছি। ছেলে বউয়ের সম্পর্কের মাধুর্য্যটুকু ফিরিয়ে দিতে পেরে পরম সুখের অধিকারী হলেন। এভাবেই যদি দিন যায় যাক না তবু বেঁচে থাকুক মুক্তির সেই প্রথম দিনের হাতের স্পর্শ তার অস্তিত্বের জিওন কাঠি হয়ে।।

প্রেম ডট কম... নীলাঞ্জনা সরকার

  একটুখানি খোলা আকাশ দেখার সৌভাগ্য যে কবে হবে! নির্মল দীর্ঘশ্বাস ফেলে...সব সুখ বিলীন হয়ে গেছে মৃন্ময়ীর সাথে। মনে আনাগোনা করে মৃন্ময়ীর সাথে...