Monday, February 22, 2021

বৃংহণ.....নীলাঞ্জনা সরকার

 

         
দুলি খুব যত্ন করে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল মণির পিঠে। মণির জন্ম হয়েছে দু'হপ্তা আগে। কাজিরাঙায় পর্যটক সওয়ারি করায় মণির মা, মালতি - এক সুন্দর উঁচু হাতি। সেই ভোররাতে শুরু হয় মালতির কাজ তারপর দুপুরে একটু বিশ্রাম। তখন বাচ্চাকে একটু আদর করতে পারে সে, তারপর বিকাল হলেই আবার জঙ্গলের পথে যাত্রা। মণি বড় একা হয়ে যায় ওই সময়টা। সবেমাত্র কদিন হল এই পৃথিবীর আলো দেখেছে সে, কিছুই বোঝে না মা ছাড়া আর কে আপন! তবু দুলি তার কাছের মানুষ হয়ে উঠেছে এই কদিনেই। 
মৈনাক চন্দ্রর বিশাল ব্যবসা। এই কাজিরাঙাতে তার হোটেল বেশ সুনাম কুড়িয়েছে। শুধু ভারতবর্ষ নয় বিদেশ থেকেও অনেক পর্যটক আসে তার হোটেল ' মুনলাইট' এ। এখানকার সব হোটেল থেকেই জঙ্গল পরিদর্শনের ব্যবস্থা আছে হাতির পিঠে চাপিয়ে অথবা জীপে করে। তবে মৈনাকবাবুর বিশেষত্ব হচ্ছে এসব কিছু ছাড়াও তার হোটেলে প্রতি রাতে কাজিরাঙ্গার স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর বন ফায়ার। মুনলাইট হোটেলের পরিবেশও অদ্ভুত সুন্দর, অনেকটা জায়গা নিয়ে। ঠিক যেন জঙ্গলের মধ্যেই ছোট ছোট কাঠের দোতলা বাড়ি, অনেকটা নিজস্ব বাংলো মতন। মুনলাইট হোটেলের যত হাতি আছে তাদের থাকার জায়গাও ওই হোটেলের খুব কাছাকাছি, কেউ চাইলে বিকালে হাঁটতে বেরিয়ে দেখেও আসতে পারে। মৈনাক বাবু প্রায় গোটা দশেক হাতির মালিক। পর্যটকরাই ওনার ভগবান তাই তাদের যাতে কোনো অসুবিধা না হয় সেদিকে খুব খেয়াল রাখেন তিনি। হাতিগুলোর দেখাশোনা আর পরিচালনা করার জন্য প্রায় গোটা পনেরোজন মানুষ দিনরাত খাটে। দুলির বাবা, সন্তোষ। সে এই মৈনাক বাবুর কাছেই মাহুতের কাজ করে। দুলির বয়স ষোলো, লেখাপড়া খুব ছোটবেলাতেই বন্ধ হয়ে গেছে টাকার অভাবে। দুলিকে ওর বাবা বলে এখন থেকেই কাজ বুঝে নিতে। হাতির সাথে ওঠাবসা কখন প্রাণ যায় কে বলতে পারে, সব জানা থাকলে দুলি ওর বাবার জায়গায় কাজে লেগে যেতে পারবে। বাবার মুখে এমন কথা শুনে দুলির খুব মন খারাপ হয় কিন্তু ওর মা ওকে বোঝায়, বলে- ওরে, না খেতে পেয়ে মরার চেয়ে হাতির পিঠে চেপে ঘোরা অনেক ভালো। এই হাতিই আমাদের ভগবান। 
সেই থেকে দুলি ওর বাবার সাথে হাতিগুলোর কাছে রোজ আসে, ওদের খেতে দেয়, চান করায়... গল্প করে। ওদের বন্ধু হয়ে উঠেছে। এই মণিকেও হতে দেখলো দুলি। খুব ভাব দুজনের। বাবার বন্ধুরাও দুলিকে কাজ শেখায়, এখানকার মানুষগুলোর মধ্যে আপনপর নেই আছে শুধু আত্মীয়তা - বোঝাই যায় না যে এরা রক্তের সম্পর্কের নয়। দুলি ওর বাবাকে যত দেখে তত অবাক হয়, মাঝে মাঝে মনে হয় মালতি বুঝি মানুষ! সন্তোষ তাকে যেভাবে সবকিছু শেখায় তা দেখার মত। দুলি তখন মণির ওপর খবরদারি করে... ওকে বলে, "তুই তাড়াতড়ি বড় হয়ে ওঠ মণি। তোর পিঠে চেপে আমি জঙ্গলের পথে যাব, তখন যদি তুই কথা না শুনিস তাহলে জেনে রাখ তোর কানে সুড়সুড়ি দেব".....মণি কত বোঝে জানে না দুলি কিন্তু এইসব বলে সে নিজেই হেসে গড়াগড়ি খায়।
দুলি খুব শিখতে ভালোবাসে, বিশেষ করে জঙ্গলের যেমন কোনো শুরু আর শেষ নেই তাকে নিয়ে তেমনই দুলির কৌতূহলেরও শেষ নেই। সন্তোষ তো দুলিকে প্রায়ই বলে জঙ্গলের প্রকৃতির বৈচিত্র্যের ওপর আকর্ষণ বাড়ে বই কমে না। সেদিন দুপুরে সন্তোষ জঙ্গলে গেলে দুলি মণির সাথে অনেকক্ষন খেললো তারপর মণিকে জল দিয়ে একটু এগিয়ে আসতেই সামনের গাছটার দিকে চোখ গেল তার। কি সুন্দর ফুল ফুটেছে গাছটায়, বেশ কয়েকরকম রঙ-বেরঙের পাখি এসে ডালে ডালে ঘুরছে। দুলি খুব ভালোবাসে সবুজ পরিবেশ কিন্তু কত গাছ কাটা হয় এইসব হোটেলগুলোর স্বার্থে। হোটেলের ঘর তৈরির দরকার পড়ছে ঠিকই ব্যবসার খাতিরে কিন্তু জঙ্গল কমে যাওয়ায় কত জানোয়ার এখন বসতির কাছে চলে আসছে। বাবুদের কোনো ক্ষতি হয় না ওরা পাকা বাড়িতে থাকে কিন্তু দুলিদের মেঠো বাড়ির জন্য তা অনেক ভয়ের ব্যাপার। দুলির চিন্তায় ব্যাঘাত ঘটে... চন্দনকাকা পিছন থেকে এসে চমকে দেওয়ায়। দুলির পিঠ চাপড়ে দিয়ে বলে..
-কিরে সন্তোষের পোলা, এত কি ভাবছিস?
-না কাকা, তেমন কিছু নয়। ভাবছি সামনের গাছটা কতদিন বাঁচবে!
-কেন রে বাঁচবে না কেন? দিব্যি সুন্দর গাছ।
-এই জঙ্গলে বড় হচ্ছি কাকা, কত জমি খালি হয়ে গেল। আমরা তো চাষবাস করি না, অপেক্ষায় থাকি কখন এই হাতিগুলো নিয়ে জঙ্গলে ঢুকবো। এই সব আমাদের বাঁচার উপায়। সেই জঙ্গল তো এখন আর ঘন নেই গো। এই তো সেদিন দেখলাম পল্টুদের ক্ষেতে দুটো গন্ডার, ওরা ভুল করে চলে এসেছে আমাদের মধ্যে।
-ধুর ওত ভাবিস না। ওরা ওদের মত আমরা আমাদের মত। যখন সত্যিকারের জঙ্গলে ঢুকবি তখন বুঝবি। তোর বাপ, আমি সবাই তো ঘন জঙ্গলে ঢুকি না। একটুখানিক ঘোরাই হোটেলের লোকগুলোকে।
-তবু কাকা, এই হাতিগুলোর যদি কিছু হয়... এই ভয়ে মরি আমি।
-ওরে দুলি, তুই চিনিস না এই হাতির জাতকে। সময় আসলে এরাই তোকে জঙ্গলে বাঁচাবে আবার এরাই রেগে তোকেই মারতে পারে। কিচ্ছুটি বলা যায় না!  জঙ্গলের কোন জন্তুর বুকের পাটা আছে যে এই হাতিগুলোর পিছনে লাগতে যাবে! চল চল এবার উঠে পড় দেখি। মেলা কাজ বাকি আছে আমার।
দুলি নিজের কাজে যায় চন্দনকাকাও। তবে যেতে গিয়ে মাঝপথে পিছন ফিরে সে হাঁক দেয় দুলিকে, বলে.."তোর বাপকে একবার জিজ্ঞেস করিস, জঙ্গলের রানীর কথা!" দুলি থমকে যায়। জঙ্গলের রানী আবার কে? এমন নাম তো বাবার মুখে আগে শুনিনি, মনে মনে অপেক্ষায় থাকে বাবার।
সেদিন রাতে বাপ ছেলে বাড়ির উঠোনে বসে অনেকক্ষন গল্প করলো, জঙ্গল সফরের কত কথা। তবু দুলির মন অশান্ত। যখন থেকে সে জঙ্গলের রানীর কথা শুনেছে তার মনের ভিতর উথাল পাথাল হচ্ছে কিন্তু সন্তোষকে কিছু জিজ্ঞেস করতে ভয় হচ্ছে তার। সত্যিই তো বাবা কোনোদিন এই নিয়ে কোনো কথা বলেনি তাহলে চন্দনকাকু কেন জিজ্ঞেস করতে বললো? কিন্তু কতক্ষন লুকাবে! বাবা ছেলের মুখ দেখেই বুঝেছে.....
- কিরে এত চুপচাপ!
- না বাবা, শুনছি তোমার কথা। আর মনে মনে ভাবছি কবে আমি নিজে একা জঙ্গলের পথে যাবো।
- তাই কি? আমার যেন ভালো ঠেকছে না তোর মুখটা। কি হয়েছে রে দুলি, সত্যি করে বল।
দুলি চুপ করে থাকে, সন্তোষও .... ভাবে, ছেলেটা বড় হয়ে গেল। আগে কত কলকল করত, ওর কথা শুনতে শুনতে প্রায় ভোর হয়ে যেত।
অবশেষে নিস্তব্ধতা ভাঙ্গে দুলির....
- বাবা, জঙ্গলের রানী কে?
- তুই কি করে জানলি! সন্তোষের চোখে বিস্ময়..
- বলোনা, তুমি তো কত গল্প কর কিন্তু এ নাম তো আগে শুনিনি তোমার মুখে।
- ও নাম তুইও মুখে আনিস না। ওই নামে আমার খুব কষ্ট লুকিয়ে আছে।    
শুতে চলে যায় সন্তোষ। কিন্তু দুলি বসে থাকে অনন্ত অপেক্ষা নিয়ে..."কে এই জঙ্গলের রানী! কেন তার সাথে সন্তোষের কষ্ট জড়িয়ে আছে! বাবাকে কোনদিন এত মনখারাপ করতে দেখেনি সে, তাহলে ঠিক কি ছিল ঘটনাটা"....এরকম আরও অনেক প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বেড়ায় সে আকাশের তারাদের মাঝে। ভাবতে ভাবতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল সে নিজেও জানে না। মায়ের ডাকে ঘুম ভাঙ্গে তার,
- কি রে বাপ, রাতের বেলা এখানে শুয়েছিলিস! আমি তোর বাবাকে খুব বকেছি। আমার সোনা ছেলেটাকে যদি কোনো জানোয়ারে ধরত?
- কি যে বলো মা, আমি কি এখনও ছোট আছি?
- সে আর বলতে.... পিছন থেকে সন্তোষ বলে ওঠে, তুই এখনও সেই ছোটটাই আছিস। 
ওরা তিনজনেই হেসে ওঠে। দুলির মা বলে, 
-আমি সব শুনেছি রে। আসলে তোর বাবা ভয় পায় জঙ্গলের আসল রূপটা জানলে তুই যদি এই কাজ থেকে সরে আসতে চাস! তাই ধীরে ধীরে জানাই ভালো রে।
- না মা। জঙ্গলকে ভালোবাসতে গেলে পুরোটাই তো জানতে হবে নয়তো আসল সময় লড়ার সাহস পাবো কোথা থেকে!
- তা ঠিক। ও দুলির বাবা, তুমি বরং বলেই দাও।
- এত করে বলছিস যখন শোন তাহলে, শুরু করে সন্তোষ ....
                আমি তখন মৈনাক শেঠের ওখানে বছর চারেক হলো কাজে লেগেছি। মালতি তখন অনেকটা ছোট। ওর মা ছিল মিথিলা- তাকে এক সার্কাস কোম্পানির কাছ থেকে পোয়াতি অবস্থায় কিনেছিল শেঠ, সেই সার্কাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল বলে। মালতির জন্মের পর  মিথিলা অল্পদিনের মধ্যেই কাজের জন্য সক্ষম হয়ে ওঠে। সার্কাসের হাতি ছিল বলে তাকে জঙ্গলের জন্য তৈরি করতে এতটুকু কষ্ট হয়নি আমাদের। সে ছিল খুব বাধ্য। মিথিলার মুখখানাও ছিল খুব সুন্দর। প্রথম প্রথম জঙ্গল থেকে কাঠ আর ঘাস আনানো হতো মিথিলাকে দিয়ে, ওর মাহুত ছিলাম আমিই। সার্কাসের হাতি হওয়ার দরুন মাল বইবার অভিজ্ঞতা ওর ছিল না তাই কয়েক সপ্তাহ খুব খাটুনি হয়েছিল বটে তবে খুব তাড়াতাড়ি কষ্টসহিষ্ণু হয়ে উঠেছিল সে। মাঝে মাঝে মিথিলাকে নিয়ে ঘুরতে যেতাম আমি। এমনই এক ভোরে এই গ্রামের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলাম আমি আর সঙ্গে ছিল মিথিলা। হঠাৎ আমি নালার ধারে নরম জমিতে বেশ খানিকটা এলাকায় কিছু পায়ের ছাপ দেখতে পেলাম। যদিও ছাপটা একটু ঘেঁটে গিয়েছিল তবুও নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝলাম ওটা একটা গন্ডারের। আবার সোজা হাঁটতে লাগলাম কারণ কাজিরাঙায় গন্ডার ঘুরে বেড়ানোটা কোনো নতুন ঘটনা নয়, প্রায়ই ক্ষেতে চলে আসে তারা। কিন্তু মনের মধ্যে ভয়টা চেপে বসলো যখন সামনে কিছুটা গিয়ে আবারও সেই পায়ের ছাপটা পেলাম আর একটা রক্তাক্ত ছোট ছেলের দেহ। কোন সাড়া ছিল না শরীরে। খুব ভোর তাও আবার শীতের সকাল তাই রাস্তায় লোক ছিল না বললেই হয়। ছেলেটা বোধহয় ঘুম ভেঙে যাওয়ায় রাস্তায় খেলে বেড়াচ্ছিল যা গ্রামের দিকে খুবই সাধারণ ঘটনা। আশপাশে কাউকে দেখতে না পেয়ে জোরে হাঁক দিলাম -" কেউ আছো? এ কাদের বাড়ির ছেলে গো"? সাড়া না পেয়ে বুঝলাম বাড়ি থেকে দূরে ছিল ছেলেটা তাই আর অপেক্ষা না করে মিথিলার পিঠে চাপিয়ে সোজা শেঠের কাছে এলাম। হোটেলে তখন অনেক লোকের ভিড়, শেঠের ব্যবসা দারুন চলছে। সকাল থেকেই তোড়জোড় হোটেলের রান্নাঘরে। শেঠ অফিস ঘরে বসে চা খাচ্ছিল। হোটেলের ডাক্তার এসে বলল দেহে প্রাণ নেই, কেউ যেন কুপিয়ে দিয়েছিল বাচ্চাটাকে। 
      দুলি মায়ের গা ঘেঁসে বসে। বাচ্চাটার রক্তমাখা শরীরটা তার কল্পনায় চলে এলো। শক্ত হয়ে যাওয়া শরীরটা ধরে খুব কেঁদেছিল বোধহয় বাড়ির লোকজন। ওদিকে সন্তোষ বলে চলে ...              
 - পরে সেই বাচ্চার বাড়ির লোকের খোঁজ পাওয়া গিয়েছিল। এমন ভাবে আরও তিনদিন কেটে গেল আর মাঝে মাঝেই গ্রামের বাড়ির পোষা জন্তুগুলোর একটা দুটো এমন খবর আসতে লাগলো। তবে মানুষ মরার খবর আর না এলেও আমার মনে ওই পায়ের ছাপটা নিয়ে খটকা থেকে গিয়েছিল। বুনো জন্তুর কাজ বলে ওই বাচ্চাটার মরণ নিয়ে পুলিশেরও বিশেষ কিছু করার ছিল না। তবে সবকিছু এখানকার বন দপ্তরকে জানিয়েছিল আমাদের শেঠ। বাবুদের নিয়ে জঙ্গল যাওয়াও বন্ধ রেখেছিল কিছুদিন। একদিন বিকালে মালতিকে পরিষ্কার করছি তখন কানাঘুষো শুনলাম গ্রামের কার বাড়ির সামনে  কাল রাতেই আবার একটা কুকুর মরে পড়ে ছিল। ব্যাপারটা সাধারণ ঠেকলো না। নিরীহ জন্তুগুলোই বা এত মরবে কেন?  যাইহোক তবু জীবন তো থামিয়ে দিলে চলবে না। জঙ্গলের জীবন এমনই হয় তবু কেন জানি না সেদিন রাতে আমার কিছুতেই ঘুম আসছিল না। খালি মনে হচ্ছিল কিছু অঘটন ঘটতে চলেছে সামনে। অনেক ভেবে সকালেই সময় মত আমি হোটেল পৌঁছে শেঠের সাথে কথা বলি, তাকে রাজি করাই  আমায় জঙ্গলে একা যেতে দেওয়ার জন্য। তাকে বলি যে আমি একবার ওই পায়ের দাগের মালিকের খোঁজ করতে চাই। সব ঠিক থাকলে ফিরে এসে আমি বন দপ্তরের বাবুদের নিয়ে আবার যাবো। শেঠ খুব বুদ্ধিমান, তিনি কিছু আঁচ করতে পেরে আমার প্রস্তাব মেনে নেন। তবে আমায় বলেন সাথে জঙ্গলের একজন অফিসারকে নিতে। কিন্তু আমি আর কাউকে নিতে রাজি হই না।
- কেন বাবা? একসাথে গেলে তো জোর বাড়ে।
- না দুলি, তাদের কথা আরও ভাবতে হয়। তাদের নিয়ে ঢুকলে কিছু বিপদ ঘটলে নিজেকে ক্ষমা করতে পারতাম না। আর আমি তো কতবারই জঙ্গলে গেছি কিন্তু মন কখনো এত ছটফট করেনি রে আগে। বন দপ্তরের বাবুরা তো প্রায় গভীর জঙ্গলে যায়, তাদের প্রাণের কত ঝুঁকি! আমি যদি তাদের একটু সাহায্য করতে পারি তাহলে আমার মনের শান্তি।
- তোর বাবা আজও বেঁচে আছে এ আমার অনেক কপাল রে....দুলির মা আঁচলে চোখ পোঁছে। 
- আমি সেদিন মিথিলাকে নিয়ে সময় মত জঙ্গলে ঢুকি। যে পথ দিয়ে বাবুদের নিয়ে যেতাম রোজ তার দুপাশে বেশ উঁচু ঘাস আর মাঝের একটা অংশে রোজ হাতি যাতায়াতের জন্য ঘাসগুলো চেপে গিয়ে একটা রাস্তা তৈরি হয়েছিল। বেশ অনেকটা রাস্তা ঘুরত দুলকি চালে হাতিরা আর বড় ঘাসের ফাঁকে ফাঁকে গন্ডার দেখা গেলে বাবুরা তার আনন্দ নিত। এই ছিল রোজের ব্যাপার। ঠিক সেই পথেই সেদিন এগোই কিন্তু কেমন যেন নিস্তব্ধ ছিল সবকিছু , ঠিক  রোজের মত নয়। প্রথমে ভাবলাম এইসব ঘটনায় জঙ্গলে এখন শহুরে বাবুদের নিয়ে ঘোরানো বন্ধ বন দপ্তরের হুকুমে তাই বোধকরি এত চুপচাপ। কিন্তু আমার সন্দেহ সত্যি হলো যখন এক জায়গায় এসে মিথিলা থেমে গেল আর এগোতে চাইলো না আর আমার নাকেও একটা পচা গন্ধ এসে পৌঁছালো। ওর পিঠের ওপর থেকে দেখার চেষ্টা করলাম আশপাশে কিছু ভয়ের আছে কিনা! হঠাৎ এক জায়গায় ঘাস নড়ে উঠতেই আমার চোখে এলো গন্ডারের একটা খড়্গের মত আর তাতে লাল ছোপ। এক নিমেষে আমি সেই পায়ের দাগের কথা মনে করলাম আর লাল ছোপটা যে রক্তের তাও বুঝতে বাকি রইল না! ভয়ে গলা শুকিয়ে এলো আমার। কিন্তু পঁচা গন্ধটা কিসের? মনে মনে ভাবলাম মিথিলার পিঠ থেকে নামাটা ঠিক হবে না আমার কিন্তু মিথিলাকে যেভাবেই হোক নড়াতে হবে। কিছুক্ষণ সব স্থির, মিথিলাও শান্ত...গন্ডারটাকেও আর দেখতে পাচ্ছিলাম না অথচ এত পচা গন্ধ যে মনে হচ্ছিল মরেই যাবো। সব ভেবে ঠাণ্ডা মাথায় ঠিক করি ফিরে যাবার কথা। আজ ভাবি ভাগ্যিস ফিরে এসেছিলাম নয়তো যে কি হতো? শেঠের সাথে সব আলোচনা করে বন দপ্তরকে জানানো হলো। তারা সেদিন বেলার দিকে শেঠের হোটেলে এসেছিল আর আমিও ছিলাম।
          বন দপ্তরের অফিসারেরা ঠিক করলেন, সেদিন দুপুরেই আবার জঙ্গলে ঢুকবেন, ছবি তোলার যন্ত্র লাগাবেন ঠিক যেখানে আমি গন্ডারটাকে দেখেছিলাম তার আশেপাশে। 
- কেন বাবা, ওরা কি তোমার কথা বিশ্বাস করেনি?
- ঠিক তা নয় রে দুলি, তোর বাবা তো আন্দাজ করেছিল গন্ডারটাই খুনি কিন্তু সেটা ঠিক কিনা যাচাই না করে তাকে কিছু করলে ভগবান পাপ দেবে তো রে।
- শোন দুলি। আমাদের এখানে জঙ্গলে গন্ডার দেখতেই তো সব আসে। শুধু শুধু একটা পশু মরলে এ নিয়ে অনেক জল ঘোলা হবে ওপর মহলে।
আর আমার কথা বিশ্বাস করার থেকেও অনেক বড় কাজ হল ঠিকঠাক বিচার করা। এমন না হয় আসল অপরাধী বেঁচে গেল, তাই এই ছবি তোলার ব্যবস্থা।
     যাইহোক মিথিলার পিঠে চেপে আমি আর জীপে করে তিনজন অফিসার গেলাম সেদিন দুপুরেই। ঠিক জায়গা চিনিয়ে দিল সেই পচা গন্ধ, সকালের থেকে তা আরও তীব্র হয়ে উঠেছিল। মিথিলা ছিল আমার খুব কাছের। এমনিতেই পশু পাখিরা অনেক আগে থেকেই বিপদের গন্ধ পায়, তাই সেও নানা ব্যবহারে আমাকে নিচে নামতে বাঁধা দিয়েছিল। কিন্তু আমি নিরুপায় ছিলাম। ওই অফিসারদের যদি সাহায্য করতেই না পারি তাহলে কেন গেলাম!... এই সব ভেবে আমি মিথিলার পিঠ থেকে নামি। কাছাকাছি গন্ধ ছাড়া আর কিছু ছিল না তাই সেটাকে খুঁজে বের করতে পারলেই অনেকটা এগোনো যাবে মনে হওয়ায় সেই চেষ্টাই শুরু হয়েছিল। মিথিলার গায়ে হাত বুলিয়ে দিয়ে ওকে ইশারা দিলাম শান্ত থাকতে আর আমরা এগিয়ে গেলাম। যদিও বন দপ্তরের লোকের কাছে বড় একখানা বন্দুক ছিল ঘুমের গুলি ভরা আর একটা ছোট পিস্তল তবুও এত লম্বা ঘাসের মধ্যে ঢুকতে বেশ ভয় লাগছিল, কি জানি কি অপেক্ষা করে আছে? একটু দূরে সামনে একটা উঁচু গাছ আছে দেখে আমি প্রস্তাব দিই সেটায় চড়ে চারদিকটা একটু দেখে নেওয়ার জন্য। অনেকক্ষণ ভেবে অফিসার বাবুরা রাজি হল, আমি পা টিপে টিপে এগিয়ে চললাম পিছনে তারা অপেক্ষায়। ঠিক হলো আমি ইশারা করলে তারা সেই গাছেই ছবি তোলার যন্ত্রটা লাগবে। বেশ কিছুটা ঢুকতেই আমার সারা শরীরটা গুলিয়ে উঠলো একটা পচা গলা গন্ডারের বাচ্চার শরীর দেখে। এক নিমেষে বুঝে গেলাম তার মায়ের প্রতিহিংসার কথা। কিন্তু সেদিনের সেই মানুষের বাচ্চাটারই বা কি দোষ ছিল!  যাইহোক কোমরের গামছা দিয়ে নাক মুখ বেঁধে আরও একটু এগিয়ে গাছটায় চড়লাম। গাছটা জুড়ে বেশ শক্তপোক্ত ডাল, বেশ আধঘন্টা নজর রেখেও যখন কিছু দেখতে পেলাম না তখন ভরসা করে আরও একটু ওপরে উঠলাম। এবার পরিষ্কার অনেকটা দেখতে পাচ্ছিলাম, বাচ্চা গন্ডারটার পচা গলা শরীরটা আর তার চারিদিকের ঘন লম্বা সবুজ ঘাস। হাত নেড়ে ইশারা দিলাম যে কিছু বিপদ নেই আর তাই দেখে অফিসারেরা এগোতে লাগলো। মাছি ভনভন করছিল, আর দেখে মনে হচ্ছিল গন্ডারটা বেশ কিছুদিন হলো মরেছে... যার ফলে তার মা  আমাদের এলাকায় অদৃশ্য মৃত্যু রূপে কালো ছায়ার মত ঘুরে বেড়াচ্ছে। গাছে বসে ভালো করে অফিসারের দলটিকে দেখলাম ওদের মধ্যে যে সবার আগে ছিল সে মস্ত লম্বা এক মানুষ আর খুব কম কথা বলত, কারণ শেঠের হোটেলে যতবার দেখেছিলাম সে খালি শুনতো। কিন্তু এবার সেই প্রথম মুখ খুললো - সবাইকে বললো সোজা একটা লাইন করে আসতে। আমার গাছ অবধি পৌঁছানোর আগে একটা নালা মত ছিল, আসলে বর্ষায় মাটি নরম থাকাকালীন জন্তুগুলোর পায়ের চাপে কোথাও কোথাও এমন গর্ত হয়ে জল জমে তারপর বৃষ্টি থামলে শুকিয়ে ছোট বা বড় নালার আকার নেয়। লম্বা অফিসারটি একবারও কোনদিকে না তাকিয়ে নালা পেরোলো আর পিছনে ধীরে ধীরে বাকিরা এলো। সূর্য মাথার ওপরে ছিল তাই খুব গরম লাগছিল, মায়া হচ্ছিল মিথিলার ওপর। আমরা ঘেমে নেয়ে একাকার তাহলে মিথিলার নিশ্চয়ই খুব জল তেষ্টা পেয়েছে! গাছের নিচের খালি জমিতে অফিসারেরা পৌঁছালেই আমি গাছ থেকে নামি আর মিথিলার কাছে যেতে চাই, কিন্তু ওরা আমায় আটকায়, বলে - পাগল হলে নাকি! যদি গন্ডার টের পেয়ে থাকে আমরা এসেছি তাহলে ও এখন বেশ সতর্ক আর তুমি একা এগোলেই তোমায় ধরবে। তার চেয়ে চুপটি করে অপেক্ষা করো। কিন্তু মিথিলা আমার এত কাছের ছিল যে ওর বিপদেের আশঙ্কায় আমি পাগল হতে লাগলাম। 
  আমার অস্থিরতা দেখে ওরা আমায় মিথিলাকে ডেকে নিতে বলে। আমি মুখে বিশেষ রকমের আওয়াজ করি, সেটা বুঝতে পেরে মিথিলা এগোতে থাকে আমার দিকে। সেই লম্বা লোকটি বলে, ক্যামেরা পরে লাগাবো এখন সবাই তৈরি থেকো। আমার ভালো ঠেকছে না।
সত্যিই তার অভিজ্ঞতা অনেক বেশি। তার মুখের কথা শেষ হতে পারলো না সাথে সাথে মিথিলার গগণভেদি আওয়াজ। আমি খুব ভয় পেয়ে যাই আমার মিথিলার জন্য কিন্তু গাছের নিচে থাকার জন্য লম্বা ঘাসের মধ্যে আসলে কি হচ্ছে বুঝতে পারিনা। গাছটার পাশেই একটা বড় ঢিবি ছিল তার পিছনে দুজন অফিসার বসে পড়ল আর লম্বা জন সবচেয়ে সাহসী সে ঢোকে নালার মধ্যে। আমি তরতর করে গাছের ওপর উঠে দেখি সেই খুনি গন্ডার একেবারে মিথিলার সামনে পথ আটকে দাঁড়িয়ে। বুঝি, ভাগ্যিস আমি একা যাইনি! মিথিলা খালি শুঁড় নাড়িয়ে ওটাকে সরাতে চাইছে কিন্তু গন্ডার বেটা মনে হয় পাগল হয়ে গিয়েছিল তার বাচ্চা হারিয়ে। সে বার বার বিভিন্ন দিক দিয়ে মিথিলার গায়ে মারছিল। ঠাকুর ডাকতে শুরু করলাম, তারপর হঠাৎ কি মনে হওয়ায় চিৎকার করে ওই নালায় বসা সাহেবকে বললাম গুলি না চালাতে যদি মিথিলার লেগে যায়। সাহেব তাকাচ্ছে না দেখে হাত নেড়ে বলতে যাই তাতেও কাজ না হওয়ায় হাততালি দিয়ে শব্দ করে ডাকি। আমি যে কত বোকা তখন বুঝি, এতদিন জঙ্গল ঘুরলেও কিছুই শিখিনি! আমার নড়াচড়ায় ওই খুনিটার নজর পরে গাছের দিকে আর সে ধুলো উড়িয়ে তার খড়্গ উচিয়ে আসতে থাকে আমার দিকে। নালার সাহেব গড়িয়ে সরে যায় একদিকে। আমার মনে হচ্ছিলো তখন আমি আর বাড়ি ফিরবো না, ঠিক তখন হঠাৎ দেখি তার পিছনে মিথিলা তার সব শক্তিটুকু নিয়ে দৌড়ে আসছে। আমার চোখে জল এসে গেছিলো রে দুলি, বিশ্বাস কর! ভাবতে পারিনি মিথিলা আমায় এত ভালোবাসে। সে এসে শুঁড়ের ধাক্কায় গন্ডারটাকে ফেলে দেয়, কিন্তু খুনিটা আবার ওঠে। চোখের সামনে সেদিন দেখেছিলাম আমার শান্ত মিথিলার অশান্ত রূপ, ওদের লড়াইতে মনে হচ্ছিল মাটির ধ্বস নামবে আর আমরা সবাই ঢুকে যাবো তাতে। কিন্তু এক সময়ে খুনিটা হার মানলো সে হাঁপিয়ে উঠলো আর সেই সুযোগে বন দপ্তরের অফিসারেরা ঘুমের গুলি ছুঁড়ে মারলো তাকে। গন্ডারটা নিস্তেজ হলে আমি গাছ থেকে নেমেই সোজা দৌড়ে গিয়েছিলাম মিথিলার কাছে, তার অবস্থাও ভালো ছিলনা। শরীরের অনেক জায়গায় রক্ত ঝরছিল তার। সেই থেকে সবাই ওকে জঙ্গলের রানী বলতো রে দুলি। 
- আচ্ছা বাবা গন্ডারের বাচ্চাটাকে কে মেরেছিল?
- তা জানিনা রে দুলি! কেউ মেরেছিল নাকি সাপের কামড়ে মরেছিল তা আর জানা যাইনি। কিন্তু মা টা সেই শোকে সামনে কাউকে পেলেই মারতে লেগেছিল। আর জঙ্গলের সামনের দিকটায় থাকার জন্য আমাদের মানুষের মধ্যে আসাটা কোনো ব্যাপার ছিলনা খুনিটার। আসলে ওটার মাথা খারাপ হয়েছিল আর কিছুদিনের মধ্যেই মরেও ছিল শুনেছিলাম।
- আর মিথিলার কি হয়েছিল, বাবা?
- সেইটাই সবচেয়ে দুঃখের দুলি, সে মাস দুয়েক ভুগে আমায় ছেড়ে চলে যায়। সেই থেকে আমি মালতির সব দায়িত্ব নিয়েছি। আমার জন্যই সে মা হারা।
তুই শুনতে চাইলি তাই পুরোনো কথা বললাম রে দুলি, নয়তো মিথিলার গল্প কাউকে করতে ইচ্ছে হয়না, মনে হয় সে শুধু আমার একার মনে থাকুক।
সন্তোষ মনমরা হয়ে ঘরের মধ্যে যায়, আর দুলি মনে মনে ভাবে...
 -এমনও হয়! আচ্ছা মণিও কি এমন সাহসী হবে বড় হয়ে নাকি দুলি নিজেই জঙ্গলে ঢুকতে ভয় পাবে? তার চোখের সামনে ভেসে ওঠে এক আগামী ভোরের ছবি তাতে দুলি আর মণি.... জঙ্গলের পথে এক দুঃসাহসিক অভিযানে।
- কিরে দুলি এবার তৈরি হয়ে নে। এতক্ষণ তো গল্প শুনলি, এবার আর দেরি করিস না বাপ আমার।
মনে মনে মায়ের ওপর রেগে যায় দুলি, কি সুন্দর একটা দিবাস্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিল আর সেটা ভেস্তে গেল। যাইহোক সত্যিই তার প্রাণের বন্ধু মণি তার অপেক্ষায় বসে আছে এই ভেবে এক দৌড়ে সামনের পুকুরে ঝাঁপ দিল, মনটা খুশি থাকলে সে এখানেই চান করে।
সন্তোষ আর দুলি সেদিন যখন কাজে ঢুকছে তখন তাদের সাথে মৈনাক বাবুর দেখা হয়।
- কি সন্তোষ আজ এত দেরি?
- শেঠ কিছু মনে করবেন না। আজ অনেকদিন পর আমার জঙ্গলের রানীর গল্প শোনালাম দুলি কে। তাই একটু দেরি হয়ে গেল।
- তা বেশ বেশ। জানো দুলি এই হাতিগুলো আসলে আমাদের জীবন। এরা আমাদের অর্থ উপার্জনে সাহায্য করে ঠিকই কিন্তু আসলে এরা আমাদের বন্ধু। তুমি যেমন ব্যবহার করবে প্রতিদানে তাই পাবে। আমাদের মানুষ জাতির মধ্যে অনেক ছল কপটতা থাকে কিন্তু এদের মন নিষ্পাপ।
- শেঠ তুমি আমায় মণির থেকে আলাদা করবে না তো?
- কেন রে? হঠাৎ এ প্রশ্ন!
- না ভাবলাম মণি বড় হলে যদি তুমি ওকে অন্য কাউকে দিয়ে দাও।
মৈনাক বাবুর মনটা খুব ভালো। বাচ্চা ছেলের এ প্রস্তাবে তিনি হেসে উঠলেন আর বললেন ...
- ঠিক আছে মণি তোর। তবে মণিকে তৈরি করার সাথে সাথে নিজেকেও ওর উপযুক্ত করে তোল, যাতে ও তোকে মান্যি করে। জানিস তো ওরা হলো হাতির জাত, বীরের ভক্ত।
ঝুপ করে প্রণাম করে দুলি। মৈনাক বাবুর চোখ দুটো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। আর দূরে শোনা যায় বৃংহণ, যা বহুযুগ ধরে পরিচিত ঠিকই তবু আজও আমাদের মনে এক চাঞ্চল্যকর অনুভূতির সৃষ্ট করে।।


Monday, February 15, 2021

গুপ্তকথার সন্ধানে......নীলাঞ্জনা সরকার

 



কালোবাসাতে সাঁঝবাতি টিমটিম,

মনের মোমবাতি দহনে কাঁপছে,
দুরু দুরু বুকে খালি হৃদপিণ্ডের ওঠানামা,
সেখানে ভালোবাসা অপেক্ষায়।
স্মৃতিটুকু বয়ে নিয়ে চলেছে রোজ রোজ,
যেখানে পদ্ম পাতায় বৃষ্টির ফোঁটা,
খবরের কাগজে রক্তের দংশন,
আর ভোর রাতে পূর্ণিমাকে খোঁজে সমাজ,
সেখানে ভালোবাসা অপেক্ষায়।
একটা ছোট্ট গুপ্তকথার অপেক্ষা মনে মনে,
সিগারেটের ধোঁয়ায় কুয়াশাচ্ছন্ন দৃষ্টি,
মনের দহনে ধর্ষিতার নোনতা বারিধারা,
সেখানে ভালোবাসা অপেক্ষায়।
শান্ত স্নিগ্ধ ঢেউয়ের মাঝে মন্থনের দলাদলি,
আর কলঙ্কিত রাতের পর মাতাল শহর,
কণ্ঠস্বর অপরিচিত যেখানে,
সেখানে ভালোবাসা অপেক্ষায়।
অভিশপ্ত আঁচড়ে সুপ্ত ফেনিল ঢেউ মলমল,
তবু গুপ্তকথার আকাঙ্খায় জীবন,
নিঃসঙ্গতা বটবৃক্ষের মতো আঁকড়ে জমি,
চাওয়া পাওয়ার সম্ভাবনায় বৃষ্টির মেঘ,
আজ বোধহয় শেষ ভালোবাসার অপেক্ষা,
উপেক্ষিত সকল অন্তরায়,
গুপ্তকথা বলছে একলা আকাশ।

প্রেম ডট কম... নীলাঞ্জনা সরকার

  একটুখানি খোলা আকাশ দেখার সৌভাগ্য যে কবে হবে! নির্মল দীর্ঘশ্বাস ফেলে...সব সুখ বিলীন হয়ে গেছে মৃন্ময়ীর সাথে। মনে আনাগোনা করে মৃন্ময়ীর সাথে...