Saturday, June 26, 2021

মাইতি ও রূপকথা... নীলাঞ্জনা সরকার

                      


              
আমি প্রতিষ্ঠিত বাংলা পত্রিকার সাংবাদিক। সৌভাগ্য না দুর্ভাগ্য জানি না, হঠাৎ অফিস থেকে হুকুম এলো সুন্দরবনের ওপর একটা কিছু লিখতেই হবে আমাকে। কিছুদিন আগেই এক ঘূর্ণিঝড়ের দাপটে সেখানকার অবস্থা নাকি বেশ খারাপ তাই আমায় সেখানে যেতে হবে। সত্যি বলতে কি শুনে খুব খুশি হইনি আমি! যতই হোক তবু তো সুন্দরবন! অগত্যা আমি শিবদাস পাঠক আর আমার নিত্য সহচর মলিন দাস যিনি পেশায় ক্যামেরাম্যান মানসিক প্রস্তুতি নিয়ে ফেললাম বাঘের পেটে যাওয়ার জন্য।মলিন দাসের নাম মলিন কেন তা গত দশ বছরে জানতে পারিনি, শুধু এটুকু বুঝেছি তিনি সর্বদাই কিছু না কিছু শারীরিক সমস্যাতে ভোগেন। একদিন ভোরবেলা দুগ্গা দুগ্গা বলে বাসে উঠে বসলাম। প্রথমে যাব গদখালী জেটি তারপর সেখান থেকে নৌকাতে চেপে যাব বাঘমামার ডেরায়। মনের ভার অনেকটা কেটে গেল নৌকা বিহারে। চারিদিকের কি অপরূপ বিস্তৃতি। মলিনবাবুর ক্যামেরা কাজ করতে শুরু করে দিয়েছে ইতিমধ্যেই। প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য্য
দেখতে দেখতে কখন একটু চোখ লেগে গিয়েছিল। যদিও একজন নিষ্ঠাবান সাংবাদিকের এমন হওয়া উচিত নয় তবুও নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম এই বলে যে সুন্দরবন আসতে হবে ভেবে অনেক রাত ভালো করে ঘুম হয়নি। নৌকা গিয়ে সজনেখালি ঘাটে থেমেছে। আমাদের আপ্যায়ন করতে দাঁড়িয়ে আছেন গেস্ট হাউসের ম্যানেজার স্বয়ং। দুপুরের ভোজনটা একটু বেশি হয়ে যাওয়ায় সেদিন সূর্যাস্ত দেখার পরিকল্পনা বাতিল করি। ম্যানেজার বাবুকে সকালের দিকে গ্রামের ভিতরের লোকালয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে বলি আমরা। তিনি ঘাড় নেড়ে আমাদের ঘরের বারান্দা পেরিয়ে অফিসের দিকে চলে যান। আর ঠিক সেই পথেই একজন কালো বেটে মানুষকে হেঁটে আসতে দেখি আমাদের ঘরের দিকে। 
            বাবু, আমি বিশু মাইতি, আপনাদের গাইড। হলদেটে সাদা দাঁত বার করে বিশু এক গাল হাসি হাসে। বাধ্য হয়ে আমাকেও হাসতে হয়। হঠাৎ আমার পিছনে মলিনবাবু এসে ক্লিক করে আওয়াজ করে। চমকে গিয়ে একটু রেগেই যাই আমি, কিন্তু মুখে কিছু বলি না। মনে মনে ভাবি কাজ নেই তো খই ভাজ -ছবি তোলার আর জিনিস পেলো না! যাইহোক শেষমেষ ভাবলাম যে কাজে আসা সেই কাজে একটু মন দেওয়া ভালো। বিশুকে ইশারায় ডাকতেই সে এসে একেবারে সামনে, তাকে ভালো করে লক্ষ্য করলাম এতক্ষণে- বয়স হয়তো চল্লিশোর্ধ , মাথায় কোকরানো চুল হলেও তা পাতলা হয়ে এসেছে। তবে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য হলো তার চোখের বাদামি তারার তীক্ষ্ম দৃষ্টি আর বা কান ঘেঁষে গলা ছাড়িয়ে কাঁধ অবধি একটা লম্বা কিছুর দাগ। সে বিষয় জিজ্ঞেস করার আগেই বিশু বলে উঠলো বাবু, রাতে বেরোবেন না, আমিও আজ আসি কাল সকালে দেখা হবে। কিন্তু বিশুকে মলিন বাবু আটকে দিল, হঠাৎ সে প্রশ্ন করে বসে বিশুর ওই অদ্ভুত দাগটা নিয়ে। তার উত্তরে বিশু যা বললো আমাদের চক্ষু চড়কগাছ। বিশু বললো সে পোচার (চোরা শিকারি) ছিল এক সময়ে, আর কোনও এক অজ্ঞাত কারণে দু বার বাঘ তাকে মেরেও মারেনি। সেই থেকে বাঘকে দেবতা রূপে গণ্য করে সে। সাংবাদিক হিসাবে যথেষ্ঠ নাম কুড়িয়েছি, কিন্তু এমন কাহিনীর কখনো সম্মুখীন হইনি, তাই এই সুযোগ হাতছাড়া করতে চাইলাম না। যে কাজে এসেছি সে কাজ কাল সকালে শুরু হবে তাই আজ রাতটা বিশুর গল্পের সাক্ষী হওয়াটাকেই সমীচিন বলে মনে করলাম। মলিন বাবুর সাথে চোখে চোখে কথা হয়ে গেল আমার - সে বিশুকে প্রস্তাব দিল সেই রাতটা আমাদের সঙ্গে কাটাবার জন্য। বিশু প্রথমটা রাজি না হলেও শেষে আমাদের অধীর আগ্রহ দেখে থেকে গেল। রাতের খাবার খেয়ে আমাদের ঘরের সামনের বারান্দায় বসলাম তিনজনে - শুরু হলো বিশুর গল্প।
বিশুর বয়ানেই পুরো গল্পটা তুলে ধরছি পাঠকের সামনে- বাবু, আমি তখন পনেরোতে পা দিয়েছি - আমার বাবা এই জঙ্গলে মধু সংগ্রহ করত। তখন সরকারের এত বিধিনিষেধ ছিলনা। এই গ্রামের অনেকে মিলে একসাথে রোজ কাজে যেত আর সন্ধ্যে হওয়ার আগে ফিরে আসত। তারপর সেই মধু তুলে দিত সরকারি বাবুদের হাতে, তারা তাদের টুরিস্ট অফিসে রাখতো সেই মধু আর যারা বেড়াতে আসত তারা ইচ্ছা হলে কিনতো। আমাদের ভাতের অভাব হতো না। রোজ নুন ভাত, পেঁয়াজ জুটতো সেই টাকায়। কিন্তু হঠাৎ একদিন আমার বাবা জঙ্গলে সাপের কামড় খেয়ে মরল। বাবার কাজে আমি বহাল হলাম ঠিকই কিন্তু মন ভরতো না আমার। খালি মনে হতো আরো এমন কিছু করি যাতে আরও বেশি কামাতে পারি। ততদিনে সরকার থেকে আমাদের কাজের জায়গার পরিধি অনেক কমিয়ে দিল। জঙ্গলের একটু গভীরে যেখানে ভালো মধু পাওয়া যেত সেটাকে "কোর এরিয়া" বলে চিহ্নিত করা হলো কারণ সেখানে নাকি মানুষের প্রাণের অনেক বেশি বিপদ! এতে আমাদের আরো বেশি সমস্যার মুখে পড়তে হলো। আমাদের গ্রামে একজন ছিল তাকে সবাই চোরা শিকারি বলেই জানতো যদিও সে কোনোদিন নিজে মুখে এ কথা স্বীকার করেনি। তবু তার সাথে একদিন আমি দেখা করতে গেলাম। তোর সাহস আছে? তুই জানিস এ কাজের বিপদ? তার প্রশ্নের উত্তরে আমি বললাম হ্যাঁ, আধপেটা খেয়ে মরার থেকে অনেক ভালো। সে বোধকরি তারি খেয়ে ছিল তখন, আমার দিকে লাল লাল চোখ দিয়ে তাকিয়ে বলল যদি কোনও সরকারি লোকের কানে যায় তাহলে সে আমার গলার নলি আধা কেটে আর আমায় আধা বাঁচিয়ে রেখে তেনার জন্য টোপ করবে। এরকম অদ্ভুত কথা আমি এর আগে কোনোদিন শুনিনি। তাই মনে খুব ভয় নিয়ে বাড়ি ফিরেছিলাম সেদিন। সারারাত ভেবেছিলাম তেনাদের জন্য টোপ কথাটার মানে কি? মলিন বাবু সেই চোরা শিকারি সম্পর্কে বিশদ জিজ্ঞেস করতে বিশু বললো ধরুন তার নাম লক্ষণ, বলে মুচকি হাসলো। বুঝলাম এর বেশি গভীরে যাবে না সে। বিশু বলে চললো এরপর বেশ কিছুদিন কেটে গেছে সেই লক্ষণ আমায় ডেকে পাঠালো একদিন। দেখা হলে বললো চল, আজ দেখবো - তুই কেমন কাজের? তেনার খোঁজ পাওয়া গেছে, আমি জিজ্ঞেস করলাম তেনার মানে কার কথা বলা হচ্ছে (কারণ লক্ষণ কিসের শিকার করে আমি তখনও জানতাম না)? লক্ষণ আর তার সঙ্গিসাথীরা গোল গোল চোখ করে আমার দিকে তাকালো আর অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। পথ চলতে চলতে বুঝলাম যে এত আয়োজন যার জন্য সে আর কেউ নয় এ জঙ্গলের অনেকের মধ্যে একজন বিশেষ- হলদে কালো ডোরাকাটা বড় বাঘ একটা। জঙ্গলের মধ্যে ঢোকার আগে প্রথামত বনবিবির পুজো করলো লক্ষণ। এ পুজোর কথা আমিও জানতাম বাবু - জঙ্গলে যাওয়ার আগে আমরাও করতাম, আমার বাবাও করতো। আমাকে একটা তীর ছোড়া ধনুক দেওয়া হয়েছিল। সেটা নিয়ে আমি দলের বাকিদের সাথে বীরদর্পে চলতে শুরু করলাম খানিকটা কাদা মাখা পথে। চারিদিকে ম্যানগ্রোভ ভর্তি, জলে কুমির থাকাও অসম্ভব ছিল না সে সময়ে। আগে তো প্রায় খবর আসত জলের ধারে কুমির দেখা গেছে বলে। যাইহোক আমার কাছে তীর ধনুক থাকলেও লক্ষণ আর দলের কয়েকজনের কাছে ছিল বন্দুক আর গুলিছোড়া ধনুক। এই শেষের জিনিসটি সম্পর্কে আমার বেশ ভালো ধারনা ছিল জঙ্গলে মধু সংগ্রহের কাজের সূত্রে, অনেককে দেখেছি ব্যবহার করতে। গুলি ধনুক ব্যবহার করা বেশ কঠিন, পারদর্শী না হলে নিজের গুলিতে নিজের হাতের বুড়ো আঙুল জখম হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। পথ চলতে চলতে একটা কথা বার বার নিজেকে বলেছিলাম "ওরা যদি পারে,আমিও পারবো - পারতেই হবে"। খানিকটা দূর এভাবে যাওয়ার পর দেখলাম একটা ঘন সবুজ বিস্তৃত জমি তার দুদিকে জল আর একদিকে একটা নৌকা বাঁধা আছে, আমরা যেদিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে আছি ঠিক তার উল্টো দিকে। লক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে বললো আমরা এবার আসল জঙ্গলের মধ্যে ঢুকবো তাই আমি যদি চাই এখনও কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারি কিন্তু একবার নৌকা চালু হলে আর থামবে না। আমি ভাবলাম এখন না বলাটা খুব লজ্জার হবে, পুরো গ্রাম জানবে কিনা সে তো পরের ব্যাপার কিন্তু আমার নিজের কাছে আমি নিজে মুখ দেখাতে পারবো না কারণ লক্ষণের কাছে আমি নিজে গেছি। খুব সাহস নিয়ে সবার দিকে তাকিয়ে বললাম, চল চল নৌকাতে উঠি। কিন্তু বিশ্বাস করুন বাবু, আমার এই সিদ্ধান্ত যে কত বড় ভুল ছিল তা পরে বেশ টের পেয়েছি। নৌকা তে লক্ষণের দুজন নিজের লোক আগে থেকেই ছিল। লক্ষণ বললো আমরা যে জলের ওপর আছি সেটা নোনা হওয়ার দরুন জঙ্গলের অনেক ভিতরে না গেলে শিকার পাওয়া অসম্ভব, কারণ পশুরা জঙ্গলের সর্বত্র এই জল পায়। কিন্তু সরকারের তরফ থেকে কৃত্রিম উপায় সংগৃহীত মিঠা জল মাঝেসাঝে তবুও জঙ্গলের পশুরা পান করতে বাইরে আসে যখন তাদের নোনা জলে অরুচি ধরে- আর তাতে পশু সংখ্যা গণনা করা সহজ হয়, কিন্তু শিকারের সুবিধা হয় না। এরপর কতক্ষন কেটেছে জানিনা বাবু হঠাৎ টের পেলাম নৌকা থেমে গেছে সবাই নিশ্চুপ হয়ে একদিকে দেখছে। আমি তাকালাম সেদিকে - দেখি একটা বাঘ অন্যদিকে মুখ করে ঘাপটি মেরে বসে আছে। একজন হাত দিয়ে ইশারা করলো কোনো শব্দ না করতে, আমি লক্ষণের দিকে তাকালাম - দেখি সে ইতিমধ্যেই বন্দুক নিয়ে তাক করে তৈরি। আসলে বাঘ ওরা আগেও দেখেছে তাই ভয় পেলনা কিন্তু আমার অবস্থা খুব খারাপ হয়েছিল। আমরা যে নদীপথে যাচ্ছিলাম তা আসলে শাখানদী, তাতে জল যৎসামান্য। আমি এত ভয় পেয়েছিলাম বাবু যে কল্পনায় ওইটুকু মুহূর্তে অনেক কিছু দেখে ফেলেছিলাম। মনে হচ্ছিল পূর্ণিমার চাঁদ উঠেছে আর বাঘ সবদিক আলো করে যেন আমারি অপেক্ষায়। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গেছিলো, হৃদপিন্ডের স্বাভাবিক গতি স্তব্ধ ছিল কিছুক্ষনের জন্য। যে পৈশাচিক শক্তির কথা গ্রামের লোকের মুখে মুখে শুনেছি তা একেবারে আমার চোখের সামনে- সেই অনুভূতির কথা বলা আজ বড়ো কঠিন। তক্ষুনি বাঘ যেদিকে মুখ করে বসেছিল সেদিকের লম্বা ঘাসের মধ্যে একটা নড়াচড়া অনুভব হলো আমাদের সবার। নৌকার সব নিশ্চুপ, লক্ষণ বোধকরি কিছু ইশারা করেছিল তা বাকি সবাই বুঝলেও নতুন হওয়ার দরুন আমি বুঝিনি। হঠাৎ সেই ঘাসের মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে এলো এক চিতল হরিণ আর তার শাবক। এতক্ষণে বুঝলাম যে বাঘ ওই শাবকটিকে চোখের আড়াল করবে না বলে সব ভুলে একদিকে চুপটি করে বসে ছিল। মা আর বাচ্চাটি বোধহয় দলছুট হয়েছিল, আমি তো নৌকার মধ্যে খুব মনখারাপ করছি হরিণ দুটির জন্য - বাঘের দ্বারা যে আমাদের বিপদ হতে পারে সে সম্ভাবনাও উড়িয়ে দিতে পারছি না। সব মিলিয়ে সাংঘাতিক অবস্থা! আশ্চর্যরকম নীরবতা আমাদের নৌকায়, এই রকম সময়ে হঠাৎ জলে বিশাল আলোড়ন- মা হরিণটি শাবকটিকে বাঁচাবার জন্যে যথাসাধ্য চেষ্টা করছে ঠিকই কিন্তু চোখের সামনে দেখছি বাঘের কি নিষ্ঠুর খেলা তার সাথে। বাঘ একসময় সুযোগ বুঝে একেবারে শাবকের সামনে। কিন্তু সবেতে বিঘ্ন ঘটালো সেই আলোড়ন - এক বিশালকায় কুমির জল থেকে তেড়েফুড়ে উঠে এলো। এরপর বাঘের গর্জন আর কুমিরের আস্ফালন এই দুই মিলে যা হলো তাতে আমার কান ফেটে যাওয়ার জোগাড়। বাকি সবাই অভিজ্ঞতা থেকে নিজেদের সামলে নিলেও আমি পারিনি বাবু। নিজের এবং নৌকার সবার চরম ক্ষতি ডেকে আনলাম নিজের নির্বুদ্ধিতায়! আমি ভয়ে হাউমাউ করে নৌকা থেকে জলে ঝাঁপ দিলাম। ভাবলাম সাঁতরে বাঘ আর কুমিরের থেকে অনেক দূরে পালিয়ে যাব। কিন্তু উল্টে পড়ে গেলাম শাখানদীর অল্প জলে আর আমার একটা পা নৌকার খাঁজে কাদায় আটকে গেলো। লক্ষণ বিশু বলে চেঁচিয়ে উঠলো, কিন্তু ততক্ষণে যা অঘটন হওয়ার তা ঘটে গেছে। বাঘ আর কুমির দুজনেই জলে ঝাঁপায়, হরিণের কি হয়েছিলো জানি না বাবু - শুধু টের পেলাম নৌকা চালু হওয়ার। আর আমার ধুতির একটা অংশ নৌকায় আটকে যাওয়ায় নৌকা আমাকে টেনে হিঁচড়ে নিয়েই রওনা দেয়। আমি শুধু একবার দেখলাম এক বিশাল চেহারার বাঘ যমদূতের মত এগিয়ে আসছে, আমি বোধকরি তারপর জ্ঞান হারিয়েছিলাম। যখন চোখ খুলি নিজেকে এক সরকারি চিকিৎসা ক্যাম্পে পাই। আমাকে নাকি নদীর ধারে কুড়িয়ে পেয়ে গ্রামের কয়েকজন সেখানে নিয়ে গিয়েছিল, বুঝতে পারি লক্ষণের লোকজন আমায় ফেলে পালিয়েছিল। ওরাই বা কি করবে বলুন বাবু! আসল ঘটনা সামনে এলে গরাদে ঢুকতে হবে যে, তাই ওদের আমি দোষ দিইনা। বিশু যে গল্পের মধ্যে দিয়ে আমাদের নিয়ে যাচ্ছিল তাতে বেশ বুঝতে পারছিলাম সুন্দরবনের মানুষদের জীবন। বিশুকে এক গ্লাস জল দি- গভীর দৃষ্টিতে ওকে দেখি আর ভাবি কত নিরাপদ আমরা। ওদের দিনে রাতে তীক্ষ্ম নখ আর ধারালো দাঁতের ভয়ে ভর করে জীবনযাপন করতে হয়। কিবা রোদ, কিবা ঝড় আর কিসের বা জলের ভয়, ওরা যে পৈশাচিকতা চোখের সামনে আর মনের গভীরে পরছায়া করে রেখেছে সেখানে বাকি সব সাহসিকতা নিমিত্ত মাত্র। মলিন বাবু বিশুকে জিজ্ঞেস করলেন ওই দাগটার কথা - তাতে বিশু বলল বাবু, এ গল্পের শেষ এখনো হয়নি, তারপর অনেকদিন লক্ষণের দেখা পাওয়া যায়নি। প্রতিদিন বিশু ছট্ফট করত, রাতে ভালো ঘুম হতো না শুধুমাত্র সেদিন ঠিক কি হয়েছিল তা জানার জন্য। সে সবার জন্য কতটা বিপদ ডেকে এনেছিল তা জানলে সে কোনোভাবে তার প্রায়শ্চিত্ত করত। এমনি এক বিকালে সূর্যাস্তের সময় বিশু নাকি নদীর ঘাটে বসেছিল আর সামনে দুজন মানুষ গামছায় মুখ ঢেকে কাদায় লাল লাল কাঁকড়া ধরছিল। তাদের একজনের চোখের দিকে বিশুর চোখ পড়ে, খুব চেনা লাগে চোখ দুটি। বিশু বলে চললো, জানেন বাবু আমি মনে সাহস এনে ডেকে ফেললাম - লক্ষণ। সাথে সাথে সেই চোখ জোড়ার মালিক আমার দিকে তাকালো, তারপর দুজনে কাঁকড়া ধরা ফেলে আমার দিকে উঠে এসে আমার হাত ধরে হিড়হিড় করে টেনে নিয়ে যায় নদীর ঘাটের ওপরে একটা গাছের পিছনে। এ গল্পের গতি আমাকে এমন মোহিত করেছে যে আমি তো ঈশ্বরকে ডেকেই চলেছি সূর্যোদয়ের গতি যেন বিলম্বিত হয়, আর মলিন বাবুর দিকে তাকিয়ে দেখলাম তার চোখের পলক পড়ছে না, মুখ হা হয়ে গেছে। যাই হোক বিশুর দিকে মন দিলাম আবার। বিশু বলে চললো - গাছের পিছনে নিয়ে গিয়ে আমার টুটি এমন চেপে ধরলো সে, যে আমার চোখ ঠিকরে বেরিয়ে আসে - তারপর সেই লোকটি বলল কি রে, আমাদের বিষয় কাউকে বলিস নি তো? ব্যাস, আমি তার গলার স্বরে বুঝে গেলাম সেই লক্ষণ। কোনোভাবে তার হাত ছাড়ালাম, বললাম লক্ষণ আমি তোমাকে কত খুঁজেছি! তুমি, তোমরা সবাই ঠিক আছো তো? আমি কেঁদে ফেলি বাবু , দু হাতে মুখ ঢেকে। লক্ষণ আমায় সোজা করিয়ে দিয়ে বলে - ওরে হতভাগা জীবন থেকে পালানো এত সহজ নয়। তাই আমি মৃত্যুকে বন্ধু করে বার বার ওই পিশাচের খোঁজে যাই। জীবনে কত জন্তু মারলাম কিন্তু ওই চামড়া আজও পেলাম না। নেশা হয়ে গেছে আমার, বড়ো লোভ ওই হলদে ডোরাকাটার মুন্ডুটার। কথা বলতে বলতে গামছাটা মুখ থেকে সরে যায় লক্ষণের শিউরে উঠি আমি বাবু, ঠোঁটটা ঝুলে গেছিলো আর থুতনি বলতে কিছু খুঁজে পাইনি সেদিন ওর। লক্ষণের সাথের লোকটি বলল সেদিনের ঘটনা - সেদিন নাকি আমাকে বাঘ আর কুমির দুজনেই মারতে পারতো, কিন্তু লক্ষণের গুলিতে কুমিরটা মরে। লক্ষণ দলে সবচেয়ে সাহসী ছিল বলে জলে ঝাঁপ মেরেছিল আমাকে তুলে নেওয়ার জন্য,তবে বাঘ একেবারে সাঁতরে নৌকায় উঠে আসায় নৌকার মধ্যে দৌড়াদৌড়ি লাগে আর নৌকা যায় উল্টে। দু -তিনজনের সাহায্যে লক্ষণ আমায় নিয়ে ডাঙায় ওঠে। অথচ বাবু আমি কিচ্ছুটি টের পাইনি! বাঘটাও বোধকরি সেই ফাঁকে জল থেকে উঠে এসে কোথাও ঘাপটি মেরে বসেছিল, যখন সবাই নৌকা সোজা করতে ব্যস্ত (তা না হলে বাড়ি ফেরা অসম্ভব) তখন বাঘটা ঝোপ থেকে বেরিয়ে এসে আমার পা ধরে টান দেয় - তাই দেখে দলের একজন গুলি বন্দুক ছুঁড়তে গিয়ে সামনে পাথরে হোঁচট খেয়ে পড়ে যায় আর তার বন্দুকের গুলি ছিটকে গিয়ে লক্ষণের চোয়াল ছুঁয়ে সামনের গাছের গুঁড়িতে গিয়ে লাগে। লক্ষণের তখন রক্তবন্যা মুখে, লোকজন তাকে নিয়ে পালাতে পারলে বাঁচে! এক নিশ্বাসে লোকটি বলে চলেছে আর আমি শুনছি বাবু। মনে মনে ভাবছি আহা রে, আজ আমার জন্য এই অবস্থা! তখন অবশেষে লক্ষণ বললো এত কাণ্ডের মধ্যে বাঘ শুধু তোর পা ধরে টান দিয়েছিল, চাইলে তোকে মারতে পারতো কিন্তু সে চলে যায়। তারপর আমার ছেলেরা আমার চিকিৎসার তাড়ায় তোকে গ্রামের নদীর ধারে ফেলে রেখে যায়, তারা ভেবেছিল কেউ না কেউ তোকে দেখতে পাবে। বিশু বললো - বাবু, বিশ্বাস করবেন না আমার প্রতিটি শিরায় রক্ত গরম হয়ে ফুটতে লেগেছিল তখন - মনে হচ্ছিল সেই মুহূর্তে ছুটে গিয়ে বাঘটার গলায় আমার বাড়ির নারকেল কাটার দা এর এক কোপ বসাই। কিন্তু সে কাজ ভাবা যতটা সহজ, করা ততটাই কঠিন। তখন লক্ষণকে অনুরোধ করা ছাড়া আর কোনো পথ খোলা ছিল না আমার কাছে। তার হাতে পায়ে ধরলাম অনেক করে, তাকে বিশ্বাস দিলাম যে অমন ভুল আমি আর করবো না। অনেক কষ্টে আর একবার সুযোগ দিল লক্ষণ, তবে তার একটা শর্ত ছিল যে আগে ছোট বড়ো অন্য জন্তু তে হাত পাকাতে হবে আমায়। সেই পরীক্ষায় আমি যদি পাশ করি তবেই সেই অপদেবতার শিকারে সে আমায় নিয়ে যাবে। আমার তখন একবারও মনে হয়নি চোরা শিকারে আমার জেল হতে পারে, বড় অন্যায় করতে চলেছি - কিচ্ছু নয় , কিচ্ছু নয়! খালি মনে হচ্ছিল সেই হলদে কালো ডোরাকাটা একটা বিশাল শরীর আমার পায়ের নিচে পড়ে আছে আর আমি বীরদর্পে লক্ষণকে বলছি দেখো, আমি আমার কথা রেখেছি। আমি বুঝতেই পারিনি আমি কত অন্ধকারের অতলে তলিয়ে যাচ্ছি আর সেখান থেকে একমাত্র আমার বনবিবি আমায় বাঁচাতে পারে! ধীরে ধীরে লক্ষণের দলের যোগ্য হয়ে উঠতে লাগলাম। সে ছিল আমার ভগবান। সে যে আসলে একজন পোচার তা তার ব্যবহারে প্রকাশ পেত না, তার দলের ছেলেদের সে খুব ভালোবাসতো আর আমরা তাকে মহাপুরুষ ভাবতাম - প্রতি শিকারে যাওয়ার আগে ঘটা করে বনবিবির পুজো, সিঁদুরের তিলক সব মিলিয়ে মনে হতো আমরা যুদ্ধে যাচ্ছি নিরীহ পশু মারতে নয়। মজে গেছিলাম বাবু সে কাজে, আস্তে আস্তে দু পয়সা হাতে আসতে শুরু করেছিল- সব মিলিয়ে খুব গর্ব করে গ্রামে ঘুরতাম। তবে সবাইকে বলতাম দূরসম্পর্কের এক দাদার ঠিকেদারির ব্যাবসা আছে তাতে আমার কাজ লেগেছে, মাঝে মাঝে আমাকে ডেকে পাঠায়। কখনো যদি গ্রামে লক্ষণের সাথে দেখা হয়ে যায় অন্যদিকে চলে যেতাম, কাউকে বুঝতে দিতাম না যে আমরা একে অপরকে চিনি। এমন করে বেশ কিছুদিন কেটে যায় হঠাৎ খবর এল তেনাকে জঙ্গলের কোর এরিয়ার এক অংশে দেখা গেছে। ব্যাস শুরু হলো আমাদের প্রস্তুতি পর্ব হাবভাব এমন ছিল যে "মরবো নয়তো মারবো"। সুন্দরবনে বাঘ তো অনেক বাবু, কিন্তু কেন জানিনা এই বাঘটা লক্ষণের আকর্ষণের কারণ হয়েছিল, আর আমাদেরও পরম শত্রু হয়ে উঠেছিল, বোধহয় ওর বিশালকায় হওয়ার দরুন! পরে বুঝেছিলাম ওই বাঘটার চামড়ার দাম অনেক ছিল। যাইহোক অনেক প্রস্তুতি নিয়ে আমরা যাত্রা শুরু করলাম জঙ্গলের গভীরে। এবার কিছুটা পথ নৌকা করে এসে বাকি পথ চলতে শুরু করলাম চারিদিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে, অবশেষে এক জায়গায় লক্ষণ থামতে ইশারা করলো শুরু হলো মাচা বাঁধার কাজ। তিনটে মাচা তৈরি হলো সারা দিন ধরে। এবার আমাদের সাথে বাঘের জন্যে দুটি টোপ ছিল, একটা ছাগল আর একটা বাছুর। নৌকায় তাদের চারা আর জল খাওয়ানো হয়েছিল তারপর তাদের মুখ ভালো করে দড়ি দিয়ে বেঁধে দেওয়া হয়েছিল যাতে তারা আওয়াজ করতে না পারে। বাবু, এবার যেমন ঘূর্ণিঝড় হলো সেবারও তেমনি এক তুফানে জঙ্গলের বহু সংখ্যক গাছ উপড়ে গেছিলো। তিনটে মাচার সবচাইতে মাঝখানের টার উল্টো দিকে একটা গাছ পড়ে ছিল, তার ডাল পালা ছিল আমাদের দিকে আর দুপাশে ছিল বুনো ঝোঁপ যা একটা বড়ো বাঘ গুড়ি মেরে লুকিয়ে থাকার জন্য যথেষ্ট। তাই সবমিলিয়ে এবার অনেক বেশি সাবধানতা ছিল। এতগুলো খাদ্য চোখের সামনে দেখলে মানুষখেকো না হলেও বাঘটার জন্মগত লড়াইয়ের সব প্রবৃত্তিগুলো পুরোপুরি জেগে উঠবে বলে আমাদের ধারনা ছিল। সবকিছু ভেবে ঠিক হলো প্রথম টোপ হিসাবে বাছুরটি ব্যবহার করা হবে কারণ ছাগলকে মাচার ওপরে তোলা এবং রাখা দুটিই সহজতর বাছুরের থেকে। বাছুরটি বেশ ছটপট শুরু করলো যেই ওকে আমাদের সামনের পড়ে থাকা গাছটার একটা ডালের সাথে বাঁধা হলো, তখনও তার মুখ খোলা হয়নি। জঙ্গলে তখন অন্ধকার হয়ে এসেছে, লক্ষণের নির্দেশ অনুযায়ী যে যার মাচায় উঠে গেছে এবং মুখ বাঁধা ছাগলটিকেও ওপরে তোলা হয়েছে। নিচে শুধু আমি আর কানাই (আমি আর মলিন বাবু বুঝে গেছিলাম যে এ নামটিও আসল নয়, আসল নামকে আড়ালে রেখে বিশুর দেওয়া নামেই কাজ চালাতে হবে আর কি) সে হলো গিয়ে লক্ষণের ডান হাত - আমরা মাচার ওপরের লোকেদের নির্দেশের অপেক্ষায়। ওরা ইশারা করলেই আমরা বাছুরের মুখ খুলেই ওপরে উঠে যাব। তখন অপেক্ষা করতে করতে আমার শিরদাঁড়া দিয়ে রক্তের স্রোত টের পাচ্ছিলাম বাবু, মনে হচ্ছিল আমার অন্তিম সময় এসে গেছে কিন্তু কিছুতেই নিজেকে ভয়ের কাছে সমর্পণ করাবো না বলে ঠিক করেছিলাম। কানাই বোধকরি টের পেয়েছিল কিছু, সে আমায় বললো - বিশু চিন্তা করিস না তোর ছিবড়ে মাংসের চেয়ে বাছুরটার নরম মাংস বাঘের বেশি পছন্দ হবে, বলেই হে হে করে হাসতে লাগলো। এই হাসি কাল হলো বাবু, আমাদের আগেই সে সতর্ক হয়ে বীরদর্পে এগোনো শুরু করে দিলো আমাদের দিকে। আর তা বুঝতে পারলাম লক্ষণের ইশারার আগেই জঙ্গলের হরিণদের ভয়ের ডাকে, কারণ তখন অন্ধকার। আর দূরের ঝোঁপগুলো এলোপাথাড়ি নড়তে থাকলো তাই দেখে কানাই দৌড়ে সোজা মাচায় ওঠা শুরু করলো, আর আমি নিচে একা বাছুরের মুখ খুলতে লাগলাম তাড়াতাড়ি। সবে পিছন ফিরে এগোতে যাব এমন সময় ঠিক যে দিকের বিপদের আশঙ্কা আমরা করিনি সেই দিক থেকে একটা গরগর আওয়াজ! এমন শান্ত চারিদিক আমি আগে কখনো দেখিনি! কিছু বুঝে ওঠার আগেই গাছের ফাঁক দিয়ে আসা রাতের আলো আঁধারিতে দেখলাম আমার মৃত্যু তখন শূন্যে, উঁচুতে। বিশুর গল্পে আমি কল্পনা করলাম সেই মুহূর্তটাকে, থাবার আড়ালে জ্বলজ্বলে সুস্পষ্ট দৃষ্টিতে সুন্দরবনের সেই অশুভ শক্তি কালো চামড়ার পেশীবহুল শরীরটার লোভে লাফ দিয়েছে বিশুর দিকে। বাঘ আমাদের জাতীয় সম্পদ ওই সময় সাংবাদিক হিসাবে আমি সেটা একবারের জন্য ভাবিনি, মনে হচ্ছিল এ যেন বিশুর লড়াই নয় এ আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যে। আমার বুকপকেটের কলমটা হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখলাম একবার, এ গল্পের ভার আমি নিতে পারবো তো? নিজেকে সাংবাদিক বলে মনেই হচ্ছিলনা। জীবনে কিছুই করে উঠতে পারিনি যেন! মনে হচ্ছিল বর্শা হাতে ছুটে যাই এই বিশুর সাথে জঙ্গল থেকে জঙ্গলে। এদিকে বিশু বলে চলেছে মরণ নিশ্চিত জেনেও দুর্বল হইনি বাবু, দিলাম তাকে লক্ষ্য করে গুলি চালিয়ে! কত অল্পের জন্য ওর বুক ফসকালাম জানিনা তবে দুটো জিনিস টের পেলাম - সে আমায় একটুর জন্য স্পর্শ করে ঝুপ করে উল্টো দিকে পড়লো, আর আমার বাঁ ঘাড় বরাবর রক্তের ধারা - তার সাথে বাঁ কাঁধ, হাত প্রায় অবশ হয়ে যাওয়া। তখন মলিন বাবু বেশ রেগে বলে উঠলেন, তখন তোমার সঙ্গী - সাথীরা কি ওপরে বসে মজা দেখছিল? এ তো দেখছি তোমাকেই টোপ বানিয়ে ফেললো ওরা। আচ্ছা, সত্যি বলতো লক্ষণ কি এতটাই বিশ্বাসী ছিল? দাঁড়ান বাবু, বিশু তার দিকে তাকিয়ে বলল - লক্ষণকে না জেনে তাকে দোষ দেবেন না। প্রত্যেক শিকারের কিছু নিয়ম থাকে। ওরা ছিল মাচায়, আর এই ঘটনাটি এত তাড়াতাড়ি ঘটে যায় যে ওপর থেকে তাড়াহুড়ো করে গুলি ছুড়লে তা বাঘের বদলে আমার লাগতে পারতো। যাইহোক আমি শুধু তখন এক মুহূর্তে এটাই ভেবেছিলাম বাঘটার নখের ছোঁয়ায় আমার এই হাল তাহলে ও যদি আমায় নাগাল পেত তাহলে কি হতো! আমি টলমল শরীরে পিছনে ঘুরে দেখলাম বাঘটা শুয়ে আছে আর বাছুরটি প্রাণপণে ডেকে চলেছে আর ছটফট করছে। এই কিছু সময়ের নিস্তব্ধতার ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই বাবু। আমি আহত হওয়ার দরুন পালিয়ে গাছে উঠতেও পারছিলাম না আবার ওখানে দাঁড়িয়ে মৃত্যুর অপেক্ষা করতেও আমার বাঁধছিল। ওপরে তাকিয়ে দেখি আমার সব সহকর্মীরা কত অসহায় হয়ে আমায় দেখছে। ব্যাস মাত্র কিছু সময় পেয়েছিলাম আমি, একটা অবাঞ্ছিত অতর্কিত আওয়াজের সাথে বাঘটা উঠলো - আমায় দেখলো। আমিও ওকে ভালো করে দেখলাম সে এক বিশাল চেহারার, কি গাঢ় রঙের হলদে কালো ডোরাকাটা শরীর, চকচকে কি অপূর্ব - আমি সম্মোহিত হয়ে গেছিলাম বাবু ওর চোখের তারাতে! ওর লেজটা দুবার উঠলো আর নামলো তারপর ঘুরে গিয়ে পিছন থেকে বাছুরটার ওপর লাফিয়ে পড়লো। এক নিমেষে কাঁধের কাছ থেকে উল্টে নেমে টুটি চেপে ধরলো ধারালো দাঁত দিয়ে। আমার যেন মাথা কাজ করছিল না বাবু, মনে হচ্ছিল আমিই যেন ওর পথে বাঁধা হয়ে ছিলাম। আর ও আমাকে তবুও ক্ষমা করে দিল। সম্বিত ফিরল গুলির আওয়াজে - বাঘটা যেই আমার থেকে দূরে গেছে ওপর থেকে গুলি চালাতে শুরু করেছে ওরা লক্ষণের নির্দেশে। এদিকে বাঘটার কি শক্তি ভাবতে পারবেন না বাবু - ওই বাছুরটাকে মেরে দড়ি টেনে ছিড়ে কিছুটা দুর ঘেসটে নিয়ে গেলো তারপর তাকে ফেলে রেখে অশরীরীর মত মিলিয়ে গেলো। আমার শরীর তখন রক্তে ভেসে যাচ্ছে তবুও আমি ওদের ওপর থেকে নামতে বারণ করলাম, বিশ্বাস নেই আবার কি বিপদ আসে! কিন্তু লক্ষণ কানাইকে নিয়ে নামে বলে সে দেখেছে বুলেট বিঁধতে। কোথায় জখম হলো বাঘটা সেটা অনিশ্চিত কিন্তু যেভাবে ধুলো ছিটকে হঠাৎ বাঘটা বাছুরকে ছেড়ে দেয় তার মানে বুলেটটা বাঘটার শরীরে ঢুকেছে - এ তার এতদিনের শিকারের অভিজ্ঞতা। লক্ষণ ছোট ভাই ভাবতো আমায় সে তার কোমরের গামছা দিয়ে আমার কাঁধ বেঁধে দেয়। একে একে সবাই নেমে আসে ছাগলটিকে ও সাথে নেওয়া হয়। লক্ষণ বলে রক্তের নিশানা পেলে অনুসরণ করতে হতে পারে সবাই যেন সতর্ক থাকি। তবে ও খুব বিমর্ষ ছিল। আমি জিজ্ঞেস করাতে বলেছিল, ভাই বিশু আজ তুই নিশ্চিত মরণ থেকে বাঁচলি আগেও মনে কর সে তোকে মেরেও মারে নি। অথচ আমার ভাইকে যে বাঁচালো আমার গুলি তাকে বিদ্ধ করলো তাই মনটা বড় অশান্ত। এত পশু মেরেছি কিন্তু আজ দুটো হাতকে প্রথমবার লাল রঙের লাগছে। খালি মনে হচ্ছে সে যেন বেঁচে যায়। পুরো অন্ধকার জঙ্গল খালি চাঁদের আলো গাছের ফাঁক দিয়ে এসে পড়ে আমাদের পথ দেখাচ্ছিল। মরা বাছুরটাকে অনেক পিছনে ফেলে এসেছি তাই সামনে যে রক্তের ছোপ গুলো পাচ্ছি মনে হচ্ছিল বাঘটার। তবে আবার চিতল হরিণ ডাকতে শুরু করলো বেশ কিছুটা দূরে - লক্ষণ হাত দিয়ে ইশারা করলো সেদিকে যেতে। সূর্য প্রায় উঠতে শুরু করেছে তখন বাবু, তাই জঙ্গলের বাকি সব প্রাণীদের চলাফেরা শুরু হওয়ায় আমাদের পথ চলা একটু ধীরে হতে লাগলো। আমার কাঁধ ততক্ষণে ফুলে ঢোল তাই নিয়েই চলেছি এতগুলো মানুষের মুখ চেয়ে। ভাবতে পারেন হোক সে চোরা শিকারি কিন্তু কত অদম্য সাহসী লক্ষণ, কোনো সরকারি বাবুরাও দল বেঁধে ওই আঁধারে বাঘের পিছনে জঙ্গলে যেতে দুবার ভাববে বাবু। একসময় দেখতে পেলাম জঙ্গলের মহারাজকে - খুব খুশি হলাম না কেউ বাবু তাকে অমন পড়ে থাকতে দেখে। এতগুলো মানুষ তার নিস্তেজ শরীরটার চারপাশে কাঠপুতলি হয়ে দাড়িয়ে থাকলাম। তার গোঁফের ফাঁকে বেরিয়ে থাকা দাঁতে তখনও বাছুরটার রক্তের দাগ, লক্ষণের গুলি তার পেট ফুটো করে দিয়েছিল। সত্যি তার তো কোনো দোষ ছিলনা। কানাই বলে - লক্ষণদা তুই জিতলি, লক্ষণ বলে না রে ভাই আমি বোধকরি জিতেও হারলাম। লক্ষণ আর বিশুর জীবনে যখন ঢুকে পড়েছি তখন আমাদের এখানেও সুর্যোদয় হলো। দিনের আলোয় বিশুর মুখের দিকে চেয়ে দেখি পুরনো কথা মনে করে তার চোখে জল। মলিন বাবু বললেন বিশু, লক্ষণ এখন কোথায়? তুমিই বা এ কাজে কিভাবে এলে? বিশু বললো কিছু কথা কল্পনা করেন বাবু, আমার এই দাগের গল্প আমি মন উজাড় করে শোনালাম কিন্তু এর বেশি কিছু আমার বলার নেই। বাকিটা তো সুন্দরবনের রহস্য, আপনাদের মত করে শেষ করুন। ততক্ষণে চা এসে গেছে, ম্যানেজার নিজে এসে বসলেন আমাদের সাথে - কি বিশু সারা রাত জাগিয়ে রাখলি তো এনাদের? বলে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন - গুড মর্নিং, ভাবলাম সক্কাল সক্কাল চা লাগবে আপনাদের বিশুর সাথে রাত জেগে। আমি বললাম একদম ঠিক বললেন, চা এর কাপ হাতে উঠে এলাম হোটেলের বাগানে - বিশু মাইতি আমাদের গাইড নাকি গল্প বলা স্বপ্ন বুড়ো? দূরে সাঁওতালি গান ভেসে আসছে, ম্যানেজার বললেন আমাদের হোটেলের কাজের মেয়েরা আসছে গান গেয়ে। " সুন্দরবনের মেয়ে আমরা, সুন্দরবনেই বাড়ি".......কি মিষ্টি কথা গানের। মলিন বাবুকে বলে উঠলাম , কি চলুন এবার - তৈরি হয়ে নিন। যে কাজে এসেছি সে কাজ ঠিকমতো না করলে এখানেই থেকে যেতে হবে - বিশু বাদে সবাই হেসে উঠলো। বিশুর শক্ত চোয়ালে ছিল সুন্দরবনের গভীরতম রহস্য যা অনেক রূপকথাকে হার মানিয়ে দেবে.....শুধু আমার দিকে তাকিয়ে বিশুর চোখের বাদামি তারাটা চকচক করে উঠলো, কিসের সাথে মিল পেলাম যেন আমি - চোখের সামনে একটা আগ্রাসী নখর থাবা এলো। তবু এগিয়ে চললাম আর এক ঝড়ের কাহিনী লেখার জন্যে।।

-----------------------------------------------------------------------------------------------------





একটা 'আমি'র খোঁজে...নীলাঞ্জনা সরকার

 





ঠিকানা ভুলেছে অনেকবার...
চলতি পথের বাঁকে,
পরিচিত কোনো ডাকে,
বহুবার চাঁদ ছিল মেঘের আড়ালে।
প্রেম ছিল অবেলার স্বপ্নে।
তিলে তিলে গড়েছে তোমার জন্য একটা আমিকে,
যাতে অনুভবে মিষ্টি হাসি খুঁজে পায়!
তবু, প্রেম তো গানে আসে না।
খাতার পিছনের পাতায় আঁকা প্রজাপতিতেও নয়।
সে আসে চুপিসারে অভিমানী ফুলের রঙে,
সে আসে চোখের জলে চিলেকোঠার ঘরে,
বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না প্রেমের!
একটা গল্প হয়ে তোমার বুকে তিন দশক থাকলেও-
কবিতা হয়ে মেয়েটির ঠোঁট হাসায় না।।
তাই সে এখন ছবি আঁকে, গান গায়!
সময় ভুলে থাকতে চায়।
এক পশলা বৃষ্টির ফসল যে বিস্তর স্বপ্ন
তাকে বুনে নিয়ে চলে সে দিনবদলের বাঁকে।
কত মেঘ গর্জায়, কত জল জমে...
তার সামনের উঠোনে।
তবু সে শুধুই মুহূর্ত গোনে মনে মনে,
বাউল সুরে আকাশকেও মাতায়।
মিথ্যে করে ঝড়ের বিশ্লেষণ।
সে ঘুমোয় না...বলা যায় তার ঘুম আসে না।
শরীরের ব্যথা মরলেও মন এখনও অতৃপ্ত,
সে ফিরে পেতে চায় শত শত ফেলে আসা মুগ্ধতা।।

Wednesday, June 9, 2021

নুন- হলুদের গন্ধ...নীলাঞ্জনা সরকার

 

 

গানগুলো আগের থেকে একটু বেসুরো।

নোংরায় হাত দিয়ে ফেলেছি যে...
তুমি তো এখন আর হাত ধুঁয়ে দাও না!
তোমার আঁচলে চোখের কালি ঠিক করে দাও না!
আমি ওই হাতেই স্বরলিপি লিখি রোজ...মা।
নিজের সাথে চোখাচোখি হতেই -
তোমার ঘামের গন্ধটা আসে বুকের মধ্যে।
ধুলো বন্দি হয় সামনের কাঁচেতে, ওগুলো পরিষ্কার হবে না আর।
সমুদ্রের মত প্রশস্ত অন্ধকারে কোথায় খুঁজব বলতো
নুন হলুদ লাগা স্বচ্ছ পোস্টকার্ডগুলো!

আমি যে নোংরায় হাত দিয়ে ফেলেছি মা!

চেনা পথের বাঁকে আসলে আমি অন্ধ
তোমায় ছাড়া একাই পথে ভাসিয়েছিলাম খেয়া।
সাজিয়েছিলাম ফুল দিয়ে, 
কৃত্তিম আলোয় বেজে উঠেছিল পাহাড়িয়া সুর
বুঝিনি একটা ফাটল ছিল বড়!
যেখানে কেউ নেই...তুমিও নেই...থেকেও নেই!
আসলে আমি সত্যিই অন্ধ, বুঝি...

তাই তো, আমি হাত দিয়ে ফেলেছি নোংরায়!

ভাবতাম কিছু ক্ষেত্রে ফেলে আসলে কষ্ট হয় না!
তাই একধামা মুড়ির মুহূর্তকে রেখেছিলাম অনেক দূর
কিন্তু স্মৃতিতে এখনও অবসরের গল্পের গন্ধ 
একটা নির্দিষ্ট বর্গক্ষেত্রের বৃষ্টি আমায় আকুল করে,
কিন্তু জলীয় বাষ্প আমায় বেশি টানে- 
আঁকিবুঁকিতে সেখানে তোমার ছবি আঁকি...
চাইলে হাতটা ভিজিয়ে রাখতে পারি তাতে, যাতে- 
উত্তাপে নোংরাগুলো মরে যায়, কারণ- 
তুমিতো আজকাল কিছুই বলো না, বারণও করো না

তাই বার বার নোংরায় হাত দিয়ে ফেলি আমি।।







বহ্নি... নীলাঞ্জনা সরকার


                         



পাড়ায় শাঁখ বেজে উঠলো কয়েক ঘরে। সন্ধ্যারতির সময়। তপন নাইট স্কুলে সেদিন সন্ধেতেই পৌঁছে গিয়েছিল। বিমল আর মনোরমাও ছিল।

গল্প হতে হতে তপন বিমলকে বলে,

-কবে যে চাকরি পাবো! স্কুলবাড়িটা পাকা করবো। ঝড় বৃষ্টি হলে বাচ্চাগুলোর অসুবিধে হবে।

বিমল উত্তরে বলে,

-হবেই তো রে। এই বাঁশ আর কাপড়ের ঘরে আর কতদিন চলবে? বাচ্চাদের বাড়ির লোক আমাদের কাছে ওদের পাঠায় এই অনেক ভাগ্য আমাদের।

ওদের মধ্যে যোগ দেয় মনোরমা,

-খুব শিগগির ভালো দিন আসবে দেখো। তপনদাদা তোমার এত বড় একটা স্বপ্ন আমরা সবাই মিলে সফল করবো।

তপন বলে,

-সে তো বুঝলাম। কিন্তু তুই আজ বিমলের সাথে কেন এলি? জানিস তো পাড়ায় গন্ডগোল চলছে। আমার দুটো বাড়ি পরেই নির্মলেন্দু জ্যাঠা থাকেন। তাকে সেদিন বাজারে রাস্তায় ধাক্কা মেরে ফেলে দিয়েছিল দুটো ছেলে। পাঞ্জাবি ছিঁড়ে দিয়ে টাকা পয়সা এমনকি যেটুকু বাজার করেছিলেন সেটুকুও নিয়ে হাওয়া।

বিমল জিজ্ঞেস করে,

-সত্যি কেন যে এগুলো হচ্ছে ঠিক বুঝতে পারছি না। আমি মনোরমাকে বারণ করলাম। কিন্তু জানিস তো ওর জেদ! যা বলবে “জো হুকুম মহারাণী” বলে মেনে নিতে হবে...

তিনজনেই হেসে ওঠে। এরপর তপন বলে,

-এবার তোরা ফিরে পর। আমার একটু কাজ আছে সেসব সেরে একেবারে ক্লাস নিয়ে বাড়ি ফিরবো।

বিমল বলে,

-হ্যাঁ। সাবধানে ফিরিস। এই স্কুলটা তো কু নজরে আছেই। চল মনোরমা...

ওরা হাঁটতে হাঁটতে কথা বলে, মনোরমা জিজ্ঞেস করে বিমলকে

-বিমলদাদা, তুমি যে এত বিপদে এগিয়ে যাও তোমার ভয় করে না?

উত্তর আসার আগেই খুব জোরে বোমা ফাটার আওয়াজ হলো। রাস্তার একপাশে পাঁচিলের পিছনে কানে হাত দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো মনোরমা। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দৌড়াদৌড়ি আর চিৎকার....হেঁচকা টানে মনোরমাকে নিয়ে দৌড়াতে শুরু করে বিমল। উৎকণ্ঠিত বিমল বলে,

-দৌড়ো মনোরমা। যতটা পারিস।

বেশ কিছুটা পথ এসে তারা থামে। বুকে হাত দিয়ে বসে পড়ে মনোরমা। বিমল রেগে বলে,

-এইজন্যই তোকে বলেছিলাম আমার সাথে আসিস না। পরিস্থিতি আয়ত্তের বাইরে চলে গেলে চোখে অন্ধকার দেখবি।

-আমি চোখের সামনে আমার হাতটাকেই দেখতে পাচ্ছি না। ও বিমলদাদা, চারদিক ঝাপসা, কেমন যেন জমাট অন্ধকার। তোমার ভয় করে না বুঝি!

বিমল বলে,

-এ পথে যেদিন এসেছি সেদিন থেকে চোখ বন্ধ করে হাঁটতে শিখেছি। প্রথম প্রথম খুব কান্না পেতো...বাড়ি ফেরার চেনা রাস্তাটার কথা খালি মনে পড়তো! মনে হতো মা বসে আছে আমার জন্য ভাত বেড়ে। ধীরে ধীরে বুঝেছি সুখ নামটাই অলীক। তুই এখন এসব ছাড়। মন দিয়ে পড়াশোনা কর। আন্দোলন তোর জন্য নয়....

মনোরমা উত্তরে বলে,

-কেন? আজ ভয় পেয়েছি ঠিকই, কিন্তু পরদিন এমন হবে না দেখে নিও।

বিমল হেসে ফেলে...

-বুঝেছি আমার ঝাঁসির রাণী। এখন তাড়াতাড়ি তোকে বাড়ি পৌঁছে দি চল। আওয়াজটা মনে হচ্ছে স্কুলের উল্টোদিক থেকে এলো। একবার ফিরবো তপনের খবর নিতে।

বিমলের দিকে তাকিয়ে থাকে মনোরমা। বলে,

-আমি কিন্তু সত্যি তোমার প্রতি আকৃষ্ট হচ্ছি বিমলদাদা। তোমার সততা, কর্মদক্ষতা আমায় মুগ্ধ করেছে! তুমি কি কিছুই বোঝো না?

বিমল হেসে ফেলে,

-চল, চল পাকামো না করে তাড়াতাড়ি হাঁট। 

বাড়ি ফিরে হাত মুখ ধুঁয়ে একবাটি মুড়ি নিয়ে বসে মনোরমা।

মা ওকে দেখেন।

-আজ দিন কেমন কাটলো মনো?

-ভালোই তো। বেশ চমৎকার।

-তুমি আগে সাজতে এত ভালোবাসতে...নতুন নতুন ফিতে কিনে বিনুনি করতে, কাজল লাগাতে। সেসব কোথায় গেলো? ঈশ্বরকে ডাকি দেশে আর কিছু অঘটন না ঘটে...তোমার কলেজ শেষে তোমার একটা হিল্লে হলে আমার শান্তি।

-মা! তোমার খালি একই কথা! আমার অনেক কাজ বাকি জীবনে।

-প্রায়ই বিমল তোমাকে বাড়ি পৌঁছে দেয়। আমার বয়স হচ্ছে আর তার সাথে অভিজ্ঞতাও বাড়ছে। তোমার চেহারা ভালো, কিছু ক্ষয়ক্ষতি হলে সে আমাদেরই হবে।

-মা, বিমলদাদার কলেজে শেষ বছর কিন্তু ছাত্র আন্দোলনের সাথে যুক্ত থাকায় রোজই কলেজে আসে। সে খুব ভালো ছাত্র হওয়ার দরুন ইতিহাসের পড়া বুঝতে আমার আলাপ ওর সাথে। আমরা কলেজের প্রথম বর্ষে থাকলেও ওরা সবরকম সহযোগীতা করে।

শাড়ীর আঁচলে হাত মুছে মা পান সাজাতে বসেন। মনোরমা উঠে আসে, পিছন থেকে মা ডেকে বলেন,

-তোমার ডান হাতের কনুইয়ের পিছনে ছড়ে গেছে, একটু ওষুধ লাগিয়ে নিও।

দোতলার ঘরের জানলায় দাঁড়িয়ে মনোরমা নিজের মনে বলে,

-মায়ের চোখ এড়ানো খুব মুশকিল। কিন্তু আর কতদিন এভাবে চলবে? বিমল দাদা ক্রমশঃ জড়িয়ে পড়ছে...।

*****************************************

পরদিন সকালে কলেজে মনোরমা ক্যান্টিনে পৌঁছলে তপন খবর দেয়,

-শোন...গতকাল রাতে বিমল আর শিশিরকে পুলিশ বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গেছে। ওই বোমাবাজির জন্য কলেজের কর্তৃপক্ষ থানায় কমপ্লেইন করেছিল। মনে হয় আমার পাড়ার ব্যাপারটাই।

মনোরমা কি করবে ভেবে পায় না! বলে,

-কলেজে ঢোকার মুখে দেখলাম ছাত্র ইউনিয়নের মিটিং চলছে। ওরা মনে হয় হরতাল করবে, কাউকে ক্লাস করতে দেবে না। এবার কি হবে তপন দাদা? তোমাদের আন্দোলনে অনেক সময় যাবে, ততদিনে থানায় ওদের জীবন তো নরক হয়ে উঠবে।

তপন বলে,

-আমিও সেটাই ভাবছি। কিন্তু আর তো কোন উপায় নেই। কলেজকে চাপ না দিলে ওরা কিচ্ছুটি করবে না। চল, একবার থানায় যাই।

মনোরমা জিজ্ঞাসা করে,

-কিন্তু বিমলদাদা আর শিশিরদাদাকে পুলিশ কেন ধরলো বলতো।

তপন বলে,

-আসলে বোমার আওয়াজের পর বিমল ফিরে আসে আমার কাছে। আমরা বাচ্চাগুলোর জন্য অপেক্ষা করি, তারপর ওরা এলে ফিরিয়ে দি বিপদের আশঙ্কায়। তারপর থানায় যাই। বিমল পরামর্শ দেয় পুলিশকে স্কুলের বিপদের কথা একবার জানিয়ে রাখতে।

মনোরমা উৎকণ্ঠিত হয়ে প্রশ্ন করে,

-তারপর! কিন্তু শিশিরদাদা! সে কিভাবে জড়িয়ে গেল?

তপন গম্ভীর হয়ে বলে,

-সেটাই আমারও খটকা লাগছে। কাল থানায় গেলে সামনের টেবিলেই যে অফিসার ছিলেন তিনি আমাদের কিছু সময় অপেক্ষা করতে বলেন। বেশ ভালোই কথাবার্তা ওনার। একটু আশ্বস্ত হচ্ছিলাম ওই অফিসারকে সবটা বুঝিয়ে কিন্তু তারপরেই বড়বাবুর ঘরে যেতে বলা হয়। গিয়ে দেখি উনি কারোর সাথে ফোনে ব্যস্ত। কথা শেষ হলে উনি আমাদের জাস্ট কড়কে দিলেন যে থানায় কেন এসেছি? কার নামে কমপ্লেইন ইত্যাদি আরও কত কি!

মনোরমা মাঝখানে জিজ্ঞাসা করে,

-শিশিরদাদাকে কি কোনোভাবে দেখেছিলেন বড়বাবু!

তপন উত্তর দেয়,

-না রে। তবে আজ সকালে যখন কলেজে ঢুকি তখন তো আমি কিছুই জানি না। হঠাৎ দেখি বসুবাবুর গাড়ি। তারপর সব কিছু জানতে পারি। জানিনা উনি কেন এসেছিলেন?

মনোরমা পাল্টা প্রশ্ন করে,

-বসুবাবু কে?

তপন বলে,

-আমাদের পাড়ার মাথা। যে প্রোমোটার আমার স্কুলবাড়ির পিছনে লেগেছে, তিনি ওনার পরিচিত।

মনোরমা বলে,

-ব্যস, তাহলে তো বোঝাই গেল তপনদাদা। শুধু বিমলদাদাকে ধরলে ওরাই ফেঁসে যাবে তাই দুজনকে ধরেছে মিথ্যে অপরাধে। এখন শিগগির চলো।

ওদিকে বিমল, শিশির একটা সেলে রয়েছে। ঠোঁটের কোণে রক্ত শিশিরের...সে বলে,

-দেখ বিমল, আমার চোখের সামনে ভেসে উঠছে একটা মিছিল....শয় শয় মানুষ...ওরা বুকের মধ্যে ধরে রেখেছে রক্তাক্ত স্বপ্ন। কিন্তু একটা গলির বাঁকে সবাই কেমন হারিয়ে গেল। শুনতে পেলি একটা আওয়াজ এলো মনে হলো ...অদৃষ্ট। কে? কে বলছো....অদৃষ্ট হতে যাবে কেন! সব কর্মফল।

বিমল শান্ত করে ওকে,

-পাগলামি করিস না। শান্ত হ।

-আর শান্তি। আচ্ছা বিমল, তুই শান্তি খুঁজে পেয়েছিস কোনোদিন? কেমন দেখতে সে?

-প্রায়ই দেখেছি রে শিশির। আকাশের চাঁদে, আবেগী নদীর তীরে, মায়াবী রূপকথায়। শান্তিকে আমি ভিখিরির মত চাই...তাই তো ছুটে যাই, জড়িয়ে ধরি চুরমার হয়ে যাওয়া জীবনকে, জুড়তে চাই একটা মালায় সব কিছু।

ধীর গলায় বলতে থাকে শিশির,


 -"বিপ্লব, তুমি জাগ্রত যেমন আমার বুকে-

আমার অস্থিমজ্জা, রক্তসজ্জা আজ লেলিহান শিখা

প্রবহমান প্রলয় ঝড় তেমনি আমার বিবেক জুড়ে।

বিপ্লব, এই বুঝি চলে গেলে ওই সুদূরে,

আলোকগোলায় বিলিয়মান হলে...

এই ধরাতলে রয়ে গেলাম আমি-

তোমার প্রতিচ্ছবি হয়ে।"


 বিমল যোগ দেয় শিশিরকে,

 

-"জানিস, ছোট থেকে শখ ছিল তেপান্তরের মাঠ দেখার

চারিদিক বেশ আঁধার হয়ে আসবে!

স্বপ্ন দেখতাম আশ্বাসের...

ধুলো উড়বে ঘোড়ার গতিতে,

পাতার আকুতি হবে ঝরে যাওয়ার আগে!

তবে, আজ ঘুম ভাঙলে নিজেকে পাই দ্বীপান্তরে

আকাঙ্খার আর মৌনতার হাত বাড়িয়ে

নির্জন কোনও অন্ধ গলির আনাচে কানাচে

জীবন সংগ্রামের বেনামি পথে।"


 ওদের সেলের বাইরের কনস্টেবল জিগ্গ্যেস করে,

-তোমরা কি অপরাধে এখানে?

-একটু বোমা ফাটিয়ে কেউ শক্তি দেখাতে গিয়েছিল আর তার বদলে আমাদের শক্তিমান বানানো হয়েছে এই আর কি....

বিমলের কথায় ও আর শিশির দুজনেই হেসে ওঠে। হাসির আওয়াজে কনস্টেবল বলে,

-কি ব্যাপার, এত জোরে জোরে হাসি কিসের? বড়বাবু কিন্তু খুব রেগে আছেন। বেশি হট্টগোল হলে কপালে দুঃখ আছে।

বিমল বলে,

-কাল সারারাত তোমার বড়বাবুর প্রশ্নবাণে এমনিতেই হাল খারাপ! আজ আর নতুন কি হবে?

কনস্টেবল উত্তর দেওয়ার আগেই জুতোর মচমচ শব্দে বড়বাবু আসেন।

-তোমরা একটু সাবধান হয়ে যাও বুঝলে। মিথ্যের সাথে আর কতক্ষণ গাঁটছড়া বেঁধে থাকবে? আজ পর্যন্ত আমার আওতায় থাকা কোনো দোষী ছাড় পায়নি। বোমা মারার প্ল্যানটা কার ছিল...এটা জানতে পারলে সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

বিমল বলে,

-কি সমাধান হবে? কদিন আগেই আমাদের পার্টির এক ছাত্রকে রাস্তায় এমন পিটিয়েছিলো ওরা যে হাসপাতালে চিকিৎসার আগেই সে মরে যায়। আমরা এসেছিলাম থানায় কিন্তু কোনও কেস নেওয়া হয়নি। এমনকি কালকেও বোমাবাজির খবর আমরাই আপনাকে দিতে এসেছিলাম কিন্তু শুনতেই চাননি! কেন বলতে পারেন? ওরা স্থানীয় নেতার লোক বলে!

বিমলের কথায় গর্জে ওঠে বড়বাবু।

-মাইন্ড ইউর ল্যাংগুয়েজ। খুব রাজনীতি শিখেছিস মনে হচ্ছে?

শিশির তাড়াতাড়ি পরিস্থিতি সামাল দেয়,

-শুনুন, কাউকে মারা আমাদের নীতির বিরুদ্ধে যায়। আপনি তো আমাদের কথা শুনতেই চাইছেন না।

বড়বাবুকে কনস্টেবল বলে,

-স্যার, কলেজের দুজন দেখা করতে এসেছে...আপনার টেবিলে বসিয়েছি।

বড়বাবু বলে,

-চলো।

তারপর ওদের দেখে বলেন...

-কি ব্যাপারে সাহায্য করতে পারি?

মনোরমা খুব ভয় পেয়েছিল। তপন বলে,

-আমাদের দুই ছাত্রকে ধরে নিয়ে এসেছেন..ওদের অপরাধটা কি একটু বলবেন?

-হাসালে ভায়া। হেসে ওঠেন বড়বাবু।

বোমাবাজি করেছে জানো নিশ্চয়। তাহলে অপরাধের কথা জিজ্ঞেস করছো কেন?

-আচ্ছা, আপনি কি জানেন না যে বোমটা আদৌ ওরা মারেনি নাকি জেনেও না বোঝার ভান করছেন! আমি তো ওই পাড়াতেই থাকি। আমি জানি ওরা করেনি।

উত্তেজিত তপনকে থামায় মনোরমা।

-আচ্ছা আচ্ছা তপনদাদা তুমি থামো।

মনোরমা বড়বাবুকে বলে,

-আমি নিরপেক্ষ। কলেজ থেকে বললেও এ খবর সত্যি নয়। বিমলদাদা আমার সাথে ছিল ওই সময়ে। আর শিশিরদাদা এ কাজ করতেই পারে না। আমার বিশ্বাস কেউ ব্যক্তিগত প্রতিশোধ নিতে চাইছে...আপনি দয়া করে একটু বোঝার চেষ্টা করুন।

বড়বাবু ভ্রূ কুঁচকে বলেন,

-বেশি নিরপেক্ষ থাকা মানে ভান করা, জানতো! আমার এতবছরের চাকরির অভিজ্ঞতা বলছে যে, কলেজ নয় বরং তুমি মিথ্যে বলছো। তোমার মুখ সাদা হয়ে গেছে, হাত কাঁপছে...এই মেয়ে, তোমার সঙ্গে এ ঘটনার কি সম্পর্ক? তুমি ওদের বাঁচাতে চাইছো কেন? এই লোফার ছেলেদুটোর মধ্যে কারোর প্রেমে পড়েছো নাকি!

-কিছুটা ঠিক বললেন। আসলে আমার স্বভাবটা পাল্টে গেছে আর আমি তারই প্রেমে পড়েছি। এই খারাপ ছেলেগুলোর মধ্যে চমৎকার মনুষ্যত্ব বোধের পরিচয় পাই। তাই হয়তো খানিকটা পাগল হয়েছি আমি।

মনোরমার কথায় বড়বাবু রেগে যান। চেঁচিয়ে ওঠেন,

-ছিঃ ছিঃ, ভদ্রবাড়ির মেয়ের মুখে কি কথা! যাও যাও এখন বাড়ি যাও।

যাদের অভিযোগে গ্রেফতার করেছি তাদের জন্য অপেক্ষা করতেই হবে আমাকে। এখন এখানে শোরগোল করলে সবাইকে ঢুকিয়ে দেবো।

ওরা নিরুপায় হয়ে বেরিয়ে আসে।

 মনোরমার বুকের মধ্যে ঝড় ওঠে, জল ছলছলিয়ে ওঠে চোখে। তবু নিজেকে সামলে নেয়। তার বিমল দাদা খুব বলতো,

-পড়াশোনা শেষে চাকরি পেলে বাড়ির ছাদে নিজের জন্য একটা ঘর বানাবো। অনেক বই রাখবো সেই ঘরে, বাইরের কোন আওয়াজ থাকবে না শুধু মাঝেমধ্যে পাখি ডাকবে। আমি অবসরে সময় কাটাবো ওই ঘরে।

মনোরমা হেসে বলেছিল,

-হাঁপিয়ে উঠবে তো সেই ঘরে। হঠাৎ দম বন্ধ লাগলে সতেজ বাতাস দেবে কে গো?

আজ কথাগুলো মনে করে বুকের মধ্যে ধড়াস করে উঠলো মনোরমার। সে নিজের মনে বলে,

-সারাদিন তার বিমলদাদা পাতার সাথে রোদের লুকোচুরি দেখলো না। তার উজ্জ্বল মুখখানি এতক্ষণে শুকিয়ে গেছে নিশ্চয়।

 মনোরমার এত ভাবনার মাঝে মা ঘরে ঢুকলো। মুখ নিচু করে বসেছিল মনোরমা।

-একটু চা খাবি? করে আনবো?

-না মা। থাক....তুমি একটু বসো আমার পাশে।

-দুর্বলতা ভালো মনো কিন্তু আত্মবিশ্বাস হারিয়ে যাওয়া ঠিক নয়।

-তুমি কি করে সব বুঝতে পারো মা!

-বোকা মেয়ে। তোর ভিতরটা পুড়ে গেছে সেটা আমি ভালোই বুঝি। কিন্তু এর শেষ ভেবেই ভয় লাগে। তুই চোরাগলিতে হারিয়ে গেলে আমি তোর বাবাকে কি জবাব দেবো? তোর তখন সাত বছর বয়স। তোকে আমার জিম্মায় রেখে তিনি চিরদিনের মত চলে গেলেন।

বাবার কথা মনে করে মা মেয়ে দুজনেই ঝিমিয়ে যায়। মা মেয়ের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে,

-অতিকষ্টে ঘুরে দাঁড়িয়েছি মনো। শহীদ হওয়া কি এতই সহজ। তোর এসবে মাথা গলানোর কি দরকার বল? এখন সমাজে সবাই সবার শত্রু। হরতাল, বিপ্লব এগুলো করলে লোকে কিছু সময় তাকাবে তারপর নিজের পথ দেখবে।

-কিন্তু মা, কত লোক তো এখনও হাহাকার করে! লড়াইয়ে হেরে যাওয়া মানুষগুলো নিজেদের খোঁজে অন্দরমহলে, কিন্তু ঠাঁই হয় ফুটপাথে। তখন বিমলদাদার মত মানুষেরা চায় বোমা মেরে উড়িয়ে দিতে সব মুখোশ। সে ভাবে সে এ জগতের কেউ নয়, আসলে সে সুভাষ বোস....সে ক্ষুদিরাম.... সে বিনয় বাদল দীনেশ.....সে আসলে মানুষের।

 মনোরমার মা মনে মনে ভাবেন,

-হে ঈশ্বর! মনোর জন্য যেন কোনোদিন কাঁদতে না হয়। ভয়ংকর কিছু অঘটনের আগে আলো ফুটুক। মেয়েকে বলেন,

-তুই বোধহয় ভুলে গেছিস!অনেক আগের কথা...আমাদের পাড়ায় লাইব্রেরিটার পাশে দীপেনের চায়ের দোকান ছিল। ওর ছেলেটা লেখাপড়ায় ভাল ছিল বেশ। তোর বাবা প্রায় যেত চা খেতে আর দীপেনের সাথে গল্প করে আসতো।

-মনে আছে মা। দীপেনকাকাকে শেষ দেখেছিলাম যখন, আমি তখন সেভেনে পড়ি। দেখা হলেই আমায় জিজ্ঞাসা করতেন আমার স্কুল কেমন চলছে। আমায় সেবার বললো পাড়ায় দাঙ্গা হতে পারে। কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে খবর এসেছিল ওর ছেলে মারা গেছে।

-ঠিক বললি। সত্যিই সেবার দাঙ্গার মত হয়েছিল এ পাড়ায়। কিন্তু কি অদ্ভুত জানিস...কারুর কোনও ক্ষতি হয়নি সেদিন। শুধু দীপেনের বাড়ির সব সুখ শান্তি ফুরিয়ে গিয়েছিল ওর ছেলেটার শেষ বাবা ডাক উচ্চারণের সাথে। তোর বাবা বলেছিল দাঙ্গার দোহাই দিয়ে কেউ বা কারা দীপেনের ছেলেটার মুখ বন্ধ করতে চেয়েছিল। দীপেন কিছুদিন মড়ার মত পরে থাকতো, বড্ড মায়া হতো রে। ছেলেটা বাবার চোখের সামনে রক্তাক্ত অবস্থায় লুটিয়ে পরেছিল। পুলিশকে জানিয়েছিল ছেলেটি কলেজে কিছু অসামাজিক কাজে যুক্ত হয়ে পড়েছিল আর তার ফল আজও নিশ্চয় ওর বাবাকে ভুগতে হচ্ছে। জানিনা দীপেন কোথায়! বেঁচে আছে কিনা!

সেদিন রাতে মনোরমার ঘুম আসে না। বিমলদাদা যা করছে তার ভবিষ্যৎ যে কি তা ভেবে শিহরিত হয়ে ওঠে মনোরমা। মনে আসে পুরোনো কিছু কথা। তার বিমলদাদা একদিন গল্পের ছলে বলেছিল নিজের মনের কথা,

-মনোরমা, আমি মাঝেমাঝে ভিড় বাঁচিয়ে গা ঢাকা দিতে চাই। মনে হয় একটু একা থাকি, নিজেকে চিনি...এখনো তো এটাই জানি না একফালি রোদ মুখে এসে পড়লে আমি খুশি হই কিনা! ভাবনাগুলোর মধ্যে হারিয়ে যাওয়ার সময়ে আমার বুকের ভিতরটা জ্বলে, বড় অভিমান হয় আমার মনের। কি যেন আমায় ক্রমাগত আঘাত করছে, আমি তলিয়ে যাচ্ছি...আমার নিজের অহংকারী চোখগুলো আমায় গিলে খায়। আমার চাওয়া পাওয়ার মধ্যে বিস্তর ফারাক রয়ে গেলো রে...

মনোরমার চোখে জল আসে। সে নিজের মনে বলে,

-আসলে বিমলদাদা শুধুই লড়তে জানে, আত্মরক্ষার হিসেব নিকেশ করতে শেখেনি তার ছেলেমানুষ মন।

একদিন পর মনোরমা কলেজ পৌঁছেই দেখে বিমলকে,

-বিমালদাদা তুমি? শিশিরদাদা কোথায়?

বিমল বলে,

-আবার বুঝি ভয় পেয়েছিলি? আমার বন্ধুগুলোর তৎপরতায় কলেজ কর্তৃপক্ষ আমাদের ছাড়িয়ে এনেছে।

মনোরমা জিজ্ঞাসা করে,

-এখন কোথায় যাচ্ছো?

বিমল বলে,

-তপনের বাড়ি। শান্তি কি সহজে আসবে রে? আমরা ছাড়া পেলাম কিন্তু তপন কাল রাতে বাড়ি ফেরার সময় কে যেন পিছন থেকে সজোরে মাথায় আঘাত করে, সেখানেই লুটিয়ে পড়ে সে। আজ কলেজে এসে খবর পেলাম। শিশির আর আমি যাচ্ছি। কিরে শিশির আয়...। মনোরমা আজ তুই কলেজ শেষে সোজা বাড়ি ফিরে যাস।

তপন একটু কাতরায় তারপর দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে বলে,

-কি শিশির! আজ রাজনৈতিক তরজা কিছু হবে না? প্রতিদিনের মত হাসি ঠাট্টা আলোচনা হলে তাড়াতাড়ি সেরে উঠতাম।

শিশির বলে,

-তুই সেরে ওঠ। কলেজে মুখোমুখি বসে সব হবে। কলেজের এক একটি দিন আমাদের কাছে গভীর আনন্দের। কিন্তু কে এমন কাজ করতে পারে বলে তোর ধারনা?

-জানি না। তবে আন্দাজ করতে পারি। আমাদের পাড়ার ঠেকে কিছুদিন হলো একটা নতুন ছেলে আসছিল কিন্তু কোথায় থাকে বলেনি। তার কথা আর আচরণে বেশ দ্বিচারিতা উপলব্ধি করেছি। মনে হচ্ছে তাকে আমার ওপর নজর রাখার জন্য পাঠানো হয়েছিল।

বিমল এতক্ষণ সব শুনছিলো। এবার সে প্রশ্ন করে,

-ওই প্রোমোটারের লোক নাকি রে! তোদের রাতের স্কুল এই দুদিন কেমন চললো? বাচ্চারা আসছে এত কিছুর পর!

তপন বলে,

-আমারও সেটাই মনে হচ্ছে! এই স্কুলবাড়ির জন্যই বোধহয় এত কিছু। গোটা দশেক ছেলে মেয়ে আসছে পড়তে। তবে সারাদিন খেটে ওরা খুব ক্লান্ত থাকে। কিন্তু ওই এক চিলতে ছাদ কতক্ষণ বাঁচাতে পারি দেখ! ওখানে তো একটা অফিস হবে শুনছি। অথচ কবেকার জমি...খালি পরে আছে বলে আমরা নাইট স্কুল করলাম। আমার কি মনে হয় জানিস বসুবাবুর কোনোভাবে হাত আছে এতে...আমি সেদিন ওনাকে আমাদের কলেজেও দেখেছিলাম।

বিমল বলে,

-আসলে জমির মালিক মারা যাওয়ায় বহুদিন খালি পড়েছিল। ওদের নজর ছিলই আগে থেকে তোরা মাঝখানে ঢুকে গেলি বলেই অশান্তি। একটা ঠিকঠাক পারমিশন চাইরে স্কুলের জন্য। চল একদিন থানায় যাই।

তপন আঁতকে ওঠে,

-আবার থানা! ঠিক কিছু একটা কেসে ফাঁসিয়ে দেবে।

তিনজনে হেসে ওঠে ওরা। শিশির বলে,

-ভয় পাস না তপন। এই সব মানুষগুলো কিছু ক্ষেত্রে অন্ধ। খিদে পেলে খায়, দেখে না সামনে কে! ঘোর অন্ধকার পৃথিবীতে কোনো কিছুর গভীরে না গিয়েই এরা তৃপ্ত। আছে শুধু অন্ধ, উন্মত্ত শ্রেণীভেদ। আমরা যারা পাগল তাদের ওরা মার খেতে দেখতেই পছন্দ করে। উঠে দাঁড়াতে গেলে শিরদাঁড়া ভেঙে দেওয়ার ভয় থাকবেই... তবু দাঁড়াতে তো হবেই। এক কাজ করি থানায় যাওয়ার আগে তোদের পাড়ার মাথা বসুবাবুর বাড়ি চল কাল। ওনার মনোভাবটা বোঝার চেষ্টা করি।

তপন বললো,

-এই মার খাওয়াটাই জীবনে সাহসের কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। নিজেকে খুব অন্যরকম লাগে, মনে হয় আমার আগে পরে বলে কিছু নেই। আছে শুধু দায়িত্ব। চারপাশে সরীসৃপ...আলো নেই, জোয়ার নেই, জীবন নেই! আছে মৃত মনের শরীর। আমি হাতড়ে বেড়াচ্ছি জন্মান্ধ সবকিছুতে জোৎস্না আনবো বলে।

ওরা তিনজন চুপ করে থাকে কিন্তু অনুভূতির দেওয়া নেওয়া চলে।

***************************************

পরদিন বেশ বর্ষা ছিল। বসুবাবুর বাড়িতে আসে ওরা তিনজন এবং সাথে মনোরমাও। বসুবাবু ওদের দেখেন একঝলক। তারপর বলেন,

-নাম মনে পড়ছে না। আসলে পাড়ায় তো কম লোক নেই।

তপন বলে,

-আমার নাম তপন। আমাদের নাইট স্কুল নিয়ে একটু অসুবিধায় পড়েছি।

আপনি আশাকরি সব জানেন। আমাদের যদি একটু সঠিক পথ দেখাতেন তাহলে এতগুলো ছেলে মেয়ের পড়াশোনা বন্ধ হওয়ার থেকে বাঁচে।

বসুবাবু মনোরমাকে দেখেন একঝলক। তারপর হেসে ওঠেন,

-লেখাপড়া! আমি তো ভাবলাম পুতুল খেলবে তোমরা! তা নাইট স্কুলে কি ইনিও পড়ান!

-আমি মনোরমা। ইতিহাসের ছাত্রী। আমি রাতে এসে না পড়ালেও এই স্কুলের সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত।

- তা কিভাবে জানতে পারি কি?

-এই স্কুলের বাচ্চারা সবাই খুব গরিব। এরা প্রত্যেকে দিনের বেলা কিছু না কিছু কাজ করে, নয়তো এদের সংসার চলবে না। আমি এদের সবার বাড়ি গিয়ে কথা বলে রাজি করাই এদের রাতের স্কুলে পাঠাবার জন্য। নয়তো রাতে সহজে কেউ নিজের বাচ্চাকে বাইরে ছাড়বে না। আমি ওদের আশ্বস্ত করি, তপনদাদার প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে জানাই। এটাও যে একটা স্কুল বাড়ি সেই সচেতনতা বাড়াই ওদের মধ্যে। আমায় দেখে খুশি হয় ওরা। যাতে আরও বেশি ছেলে মেয়ে স্বাক্ষর হয় সেই চেষ্টা চালাই।

-তোমায় দেখে খুশি তো হবেই। তা আমায় বাদ দিলে কেন? একটা স্কুলবাড়ি হচ্ছে, এত সুন্দর দিদিমণি! আমার অভিমান হয় না বুঝি!

বিমল রেগে যায়। বলে,

-আমরা কেন এসেছি জানেন?

বসুবাবু বলেন,

-আরে, জানি জানি। এরা তোমার বন্ধু। তোমার নাম শুনেছি, কলেজে তো ভালোই গুন্ডাগিরি করো। ওরা ভয় পাচ্ছে, তাই সবাই আমার কাছে এসেছো।

বিমল বলে,

-এসেছিলাম অন্য কিছু ভেবে। কিন্তু এখন জানিয়ে গেলাম বাইরে যে দালালগুলো আছে তাদের দিন শেষ।

বসুবাবু বোকা সাজেন...বলেন,

-বাইরে কারা আছে বলতো? উফ্ ভীষণ ভয় পেয়ে গেলাম। তবে আমার দলের ছেলেরা যখন তখন আমার হয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেটা জানতো! এ পাড়ায় আমায় পাত্তা না দিলে পা থেকে মাথা পর্যন্ত অসহনীয় ভয় নিয়ে ঘুরতে হবে।

বিমল রেগে গিয়ে বলে,

-একটা জমির জন্য পুরো পাড়াটাকে বিপদে ফেলছেন কেন? আপনার তো অনেক টাকা সেগুলো এই স্কুলটাকে বড় করার জন্য একটু কাজে লাগালে পারতেন। আর আমায় আর শিশিরকে জেলে ঢুকিয়ে ভয় দেখাতে পারবেন না। আমরা তপনের পাশে থাকবোই।

মনোরমা তাড়াতাড়ি বলে ওঠে,

-আপনাকে কেউ ভুল বুঝিয়েছে। বিমলদাদা আসলে কারোর পা চাটে না। ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র তবু সব কিছুর ওপরে ও সাচ্চা বিপ্লবী। এ সেই মিটিং মিছিলের বিপ্লব নয়, এ হলো তথাকথিত নিয়মের বিপক্ষে গিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানো। আজ আমরা আসি। ভালো থাকবেন।

বসুবাবু রেগে চিৎকার করে ওঠেন,

-চিনবে...আমাকেও খুব শিগগির চিনবে। আজ দেমাক নিয়ে চলে যাচ্ছো যাও, বুঝতে পারবে আমার মায়া দয়া কতটা কম...

ওরা বেরিয়ে আসে। সেদিন মনোরমা বলে,

-তোমরা আজ আমার বাড়ি চলো। মায়ের সাথে আলাপ করাবো।

দরজা খোলার পর মনোরমার মা ওদের দেখে একটু অবাক হয়। বলেন,

-বসো বাবা তোমরা। মনো আমাকে আগে বলবি তো ওরা আসবে...

-না মা, এত ভেবো না। ওরা আলাপ করতে এসেছে। এই শিশিরদাদা, তপনদাদা আর...

-বুঝেছি। ও বিমল তাই তো! তোমাদের কথা অনেক শুনেছি মনোর কাছে। বসো একটু চা করে আনি।

বিমল বলে,

-না মাসিমা। আপনি বসুন একটু কথা বলি।

মনোরমার মা প্রশ্ন করেন,

-এতগুলো তরতাজা প্রাণ...সহজ জীবন ছেড়ে বিপ্লবের পথে কেন বাবারা! জেদি স্বভাব তোমাদের কিন্তু মানুষের ভয়ঙ্কর প্রবৃত্তি সহ্য করার ক্ষমতা আছে তো? সমাজের ভালো করতে গিয়ে অনেক মানুষের অভিশাপ কুড়োবে তখন...

বিমল শান্ত গলায় বলে,

-মাসিমা, আমাদের খুব মনে হয় একটা শান্ত শিশু ঘুম থেকে উঠে এদিক ওদিক তাকালেই যেন পরিবারের সবার হাসি মুখটা দেখতে পায়। প্রবৃত্তি অবস্থার চাপে জেগে ওঠে। সেটাকে খুঁটিয়ে দেখে দিগন্তে মিশিয়ে দিতে হবে প্রতিকূলতা।

মনোর মা মুগ্ধ হয় বিমলের ব্যক্তিত্বে। বলেন,

-আসলে সব মা-বাবাই সন্তানের ভালো চান। তাই গল্প শুনিয়ে সেই ছোটটি বানিয়ে রাখতে চান তাদের সুরক্ষার কথা ভেবে।

সবাই হেসে ওঠে আনন্দে...ওরা গলা ছেড়ে গান ধরে সবাই,


“কারার ঐ লৌহ-কপাট

ভেঙ্গে ফেল্‌ কর্‌ রে লোপাট রক্ত-জমাট

শিকল-পূজার পাষাণ-বেদী!

ওরে ও তরুণ ঈশান!

বাজা তোর প্রলয়-বিষাণ! ধ্বংস-নিশান

উঠুক প্রাচীর প্রাচীর ভেদি’।।

গাজনের বাজনা বাজা!

কে মালিক? কে সে রাজা? কে দেয় সাজা

মুক্ত-স্বাধীন সত্য কে রে?

হা হা হা পায় যে হাসি, ভগবান প’রবে ফাঁসি? সর্বনাশী-

শিখায় এ হীন্‌ তথ্য কে রে?

ওরে ও পাগ্‌লা ভোলা, দেরে দে প্রলয়-দোলা গারদগুলা

জোরসে ধ’রে হ্যাঁচকা টানে।

মার্‌ হাঁক হায়দরী হাঁক্‌ কাঁধে নে দুন্দুভি ঢাক ডাক ওরে ডাক

মৃত্যুকে ডাক জীবন-পানে।।

নাচে ঐ কাল-বোশেখী, কাটাবি কাল ব’সে কি?

দে রে দেখি ভীম কারার ঐ ভিত্তি নাড়ি’।

লাথি মার, ভাঙ্‌রে তালা! যত সব বন্দী-শালায়-

আগুন জ্বালা, আগুন জ্বালা, ফেল্‌ উপাড়ি।।“


মনোরমার মায়ের বুক কাঁপে। মনে মনে বলেন,

-যে নৌকা ঘাট ছেড়ে ভেসে গেছে, ঝড়ে সে কি আর ফেরার পথ পাবে? মোনো আমায় দেখে হাসতো, আমায় দেখে কাঁদতো, ভয় পেলে জড়িয়ে ধরতো আর আমি ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতাম। আজও সেই মাতৃত্বে আচ্ছন্ন আমি, কিন্তু মোনো... সে তো ওই নৌকায়! ঘুরপাক খাচ্ছে। ভয় হয় কোনো তান্ডব না হয়...

চোখের পাতা ভারী হয়ে আসে মনোরমার মায়ের তবু উনি হাসিমুখে বসে থাকেন।


দিন দুয়েক ঠিক চললো সব। তারপর একদিন কলেজের ক্যান্টিনে ওরা যখন চা খাচ্ছে তখন তপন এসে খবর দেয়,

-শিগগির চল। বিশু খুন হয়েছে।

শিশির আঁতকে ওঠে,

-কি বলছিস? কি করে হলো? কখন?

তপন বলে,

-জানি না রে। কাল রাতেও ক্লাসে এসেছিল। সকালে খবর পেয়ে দৌড়ে গিয়ে দেখি ও কেমন পুঁটুলি হয়ে পরে আছে স্কুল ঘরের পাশে। পুলিশ এসে বডি নিয়ে গেছে। তোদের তো বলেছি বসুবাবুর হুমকির পর থেকে একজন করে রাতে স্কুল বাড়ি পাহারা দেওয়ার জন্য ওখানে থাকি। কাল বিশু নিজেই থাকতে চেয়েছিল।

কেঁদে ফেলে তপন...

-ওর বাবার মুখের দিকে তাকাতে পারছিলাম না রে।

বিমল তপনকে বুকে টেনে নেয়। বলে,

-কাঁদ তপন কাঁদ। বুকের মধ্যে কান্না জমিয়ে রাখিস না। কান্না ঝেড়ে ফেলে জ্বালাটাকে বাঁচিয়ে তোল নয়তো স্কুলটাকে বাঁচাতে পারবি না।

মনোরমা বসে পরে,

-চোখ বন্ধ করলেই বিশুর মুখটা ভাসছে। ছুরি দিয়ে স্কুলের পাশের আগাছা সাফ করতো। এই ছুরিটা ঢুকিয়ে দিতে পারলো না কেন ও। সরল, নিরীহ হওয়ার ফল ভোগ করলো বিশু। কিন্তু আর নয়, আমাদের সরব হওয়ার সময় এসেছে। মনে হচ্ছে আজ রাতে কিছু ঘটবে!

শিশির বললো,

-হ্যাঁ। আমারও তাই মনে হচ্ছে। এবারও বোধহয় তপনই টার্গেট ছিল আগের বারের মতো। আজ আমরা সবাই থাকবো স্কুল বাড়িতে। মনোরমা তুই বাড়ি ফিরে যাস কলেজ শেষে।

মনোরমা বলে,

-কেন শিশিরদাদা! আমায় তোমাদের থেকে আলাদা করো না। পায়ে পড়ি।

এই সময়ে আমি যদি পিছিয়ে আসি তাহলে এত বড় অপরাধবোধ নিয়ে বাঁচবো কি করে!

তপন বলে,

-বড় বিপদ আসতে পারে। মাসিমাকে কি বলবি?

-সে আমি বুঝে নেবো। তোমরা আমায় নিয়ে নিও বিমলদাদা।

রাতে স্কুল বাড়ির মধ্যে ওরা চারজন। শিশির বলে,

-মনে আছে তপন, কিভাবে এই ঘর দুখানি হয়েছিল। সত্যি কত মজার ঘটনা ছিল সব। একদিন তো তোদের পাড়ার এক মাতাল ঢুকে নিজের ঘর ভেবে শুয়ে পড়েছিল আর চিৎকার করছিল যে কোনো শালা ওকে বের করতে পারবে না।

তপন খুব জোরে হেসে ওঠে, বলে...

-খুব মনে আছে। কিন্তু সে ব্যাটা যাতে মাতাল তালে ঠিক ছিল।

বিমল খুব গম্ভীর ছিল সেই রাতে। আকাশ দেখছিল...মনোরমা পাশে এসে জিজ্ঞেস করে,

-কি এত ভাবছো বিমলদাদা? দেখবে সব ঠিক হয়ে যাবে।

বিমল উল্টে জিজ্ঞেস করে,

-মাসিমাকে কি বলে এলি!

-ও নিয়ে তুমি ভেবো না। মা খুব চিন্তা করে ঠিকই কিন্তু কারো সর্বনাশ হোক এ কোনোদিন চাইবে না। বাচ্চাগুলোর ভবিষ্যৎ ভেবে মা নিজেই বললো সকালে যেন ভালো খবর দি। ফুল ফুটবে, পাখি গান গাইবে নিজের নিয়মে এই স্কুলে।

কিছু বোঝার আগেই একটা আগুনের গোলা এসে পড়লো স্কুলবাড়িতে!

শিশির চিৎকার করে ওঠে,

-ওরে আগুন...আগুন! বেরো শিগগির... বাড়িটা কাপড়ের বলে দাউ দাউ করে নিমেষে শেষ হবে। পালাআআআ...

বিমল মনোরমার হাত ধরে টান দিলো,

-তুই দৌড়ে যা। পাড়ায় খবর দে।

চিৎকার করে ওঠে মনোরমা,

ধোঁয়ায় কিছু দেখতে পাচ্ছি না! তপনদাদা..........শিশিরদাদা..........তোমরা কোথায়.......

ধোঁয়ায় কাশি ওঠে মনোরমার।

বিমল আবার ঢোকে ওই জ্বলন্ত ঘরে। হাহাকার করে ওঠে,

-শিশির...............কি হলো তোর? শিশির.........

তপনকে বাইরে নিয়ে আসে। বিমল মনোরমাকে বলে,

-তপন অচৈতন্য। শিশির দাউদাউ করে জ্বলছে।

-কি বলছো বিমলদাদা?

-তোর ব্যাগটা কোথায়! জল ছিল ওতে।

-সে সব শেষ।

মুহূর্তে বিমল লুটিয়ে পড়ে কোথা থেকে উড়ে আসা এক বুলেটের আঘাতে।

পুলিশের গাড়ির আওয়াজ আসে।

হতবাক মনোরমা...বিভ্রান্ত।

-বিমলদাদা...........কথা বলছো না কেন? কষ্ট হচ্ছে তোমার? তুমি কি করে আমায় ফেলে এভাবে চলে যাবে! এ হয় না। ওঠো বলছি শিগগির।

বিমল ফিসফিসিয়ে বলে,

-আর সময় নেই রে। আমার সময় হয়ে এলো। আসলে তো আদি অনন্ত কাল থেকেই পুড়ছি...শিরা উপশিরা বিষে পুড়েছে কবেই, মিথ্যের বিষে!

আজ শুধু সেই আগুনে শরীরটা বিলীন হবে।

মনোরমা হাউহাউ করে কেঁদে ওঠে,

-নাআআআআ... বিমলদাদা চলো সব ছেড়ে আমরা ভিনদেশে যাই। স্বপ্নের ঘর বাঁধবো। আমাদের কেউ আলাদা করতে পারবে না।

বিমলের সাড়া মেলে না। পুলিশ এসে তপনকে হাসপাতাল পাঠায়। মনোরমাকে গ্রেফতার করে অসামাজিক কার্যকলাপের জন্য। জীপে তোলার সময় অফিসার বলেন,

-বসুবাবু ঠিক সময়ে জানিয়েছিলেন বলে এ পাড়াটা আজ রক্ষা পেল। ওনার নির্দেশ আছে আপনি যদি চান তাহলে থানার বদলে ওনার বাড়ি ড্রপ করতে পারি। তবে তপন ছোড়ার মুক্তি নেই।

পাগলের মত হেসে ওঠে মনোরমা,

-আগুন তো আমায় পুড়িয়ে ফেলেছে। আপনি গন্ধ পাচ্ছেন না? গায়ের কাপড় খুলে ছাই ছাড়া কিছু পাওয়া যাবে না। আপনারা কেউ দেখেননি আমি এই ধোঁয়ার পথে যাত্রা করেছি উলঙ্গ সভ্যতার উপত্যকা ছেড়ে...........

পুলিশের জীপ চলতে থাকে অন্ধকার ভেদ করে, মনোরমার কানে ভেসে আসে বিমলের সেই আবৃত্তি...

বিমল কলেজে পাঠ করেছিল একবার।


“আমি কখনো আকাশকে কাঁদতে দেখিনি

বৃষ্টি দেখেছি বটে...তবে সেগুলো এক এক পশলা পিছুটান

ঘুমন্ত উঠোন জেগে ওঠে...রঙ্গন ফুল ঝরে পড়ে...

অপেক্ষায় থাকি, কিন্তু না কখনো কাঁদতে দেখিনি, অনুভবও করিনি।

গভীর অভিমানে ফিরে গেছি নিজের ছেলেমানুষীতে-

আমি বুঝি তাহলে একাই কষ্ট পাই!

আমার বুকেই থাকে সমস্ত আগ্নেয়গিরি!

আকাশ শুধু হাসে, আমার কল্পনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়েই হাসে।

হাতছানি দেয়, ক্ষত চিহ্ন ছুঁয়ে চলে...তবু হাসে।

সত্যিই কখনো কাঁদতে দেখিনি তাকে!

শুধু মনে হয়, আমাকে বদলাবে বলে মাঝে মাঝে,

আঁকাবাঁকা মেঘেরা ডাকে সময়ের ব্যবধানে”


......ডুকরে কেঁদে ওঠে মনোরমা, “বিমলদাদা তোমার আমার গল্পের শেষটা পাল্টে দাও না গো...একবার ফিরে এসে পাল্টে দাও”...

********************************************

Saturday, June 5, 2021

স্বপ্নিল...নীলাঞ্জনা সরকার

 

                     

      


অবিক্রীত বেলুনগুলো হাওয়ায় উড়ছিল কিন্তু ইচ্ছামত ভেসে যেতে পারছিল না, দড়ি দিয়ে বাঁধা 
ছিল গতি। সমীর দেখছিল ওদের...লাল, নীল, হলুদ, সবুজ নানা রঙের - কেমন যেন স্বপ্নিল চারিদিক। 
- ভাই, ঐটার দাম কতো?
সম্বিত ফেরে সমীরের। সকাল থেকে বাজার মন্দা। ছোট বাচ্চা দেখে খুশি হয় সে।
- দশ টাকা।
- এতো! একটু কম করো।
সমীর দেখে মানুষদুটিকে। পরনে দামি পোশাক, হাতে দামি ব্র্যান্ডের ঘড়ি, অথচ...
- দশ টাকায় আজকাল কি হয় দিদি?
- বাজে কথা না বলে একটু কম করো।
সাত টাকা দিয়ে চলে যায় সেই মা তার শিশুকে নিয়ে। শিশু পিছন ফিরে তাকায় হাতে গোলাপী
 বেলুন নিয়ে। দেখে সমীরকে। কিন্তু মিল পায় না নিজেদের সাথে। ছোটবেলার কথা মনে করে চোখের
 কোণ চিকচিক করে ওঠে সমীরের, কয়েকবছর স্কুল গিয়েছিল সে। রদ্দির দোকান থেকে সস্তায়
 খাতা কিনে আনতো তার বাবা। তারপর সবাই মিলে মুড়ি খেতে খেতে পুরোনো খাতাগুলো থেকে 
না লেখা পাতা আলাদা করে নতুন খাতা বানাতো। হলদে হয়ে যাওয়া সেই নতুন খাতার পিছনের
 পাতায় সমীর একদিন এঁকেছিল একটা মস্ত বড় প্লেন। মা হেসেছিল, আসলে প্লেনের আওয়াজ পেলেই 
যে ছেলে আকাশ ছুঁতে চাইতো। 
একসময় মা অসুস্থ হলে, সময় শেখালো সমীরকে দায়িত্বের কথা। সেই থেকে সমীরের নিজের কোনও
 আহ্লাদ নেই, পরিবারের বাকি মানুষগুলোর অক্সিজেনের জন্য সে তার রূপকথার বই বন্ধ করে দিয়েছিল।
 সমীর জানতো তার একটাই স্বপ্ন- ছোট ভাইটাকে স্বপ্ন দেখতে শেখানো।

প্রেম ডট কম... নীলাঞ্জনা সরকার

  একটুখানি খোলা আকাশ দেখার সৌভাগ্য যে কবে হবে! নির্মল দীর্ঘশ্বাস ফেলে...সব সুখ বিলীন হয়ে গেছে মৃন্ময়ীর সাথে। মনে আনাগোনা করে মৃন্ময়ীর সাথে...