Friday, April 16, 2021

নদীর পাড়ের বাড়ি.... নীলাঞ্জনা সরকার

 





আজ আমি মৃত নয়, শুধু নির্লিপ্ত...
ভাসমান মেছো গন্ধ নিয়ে
আছড়ে, সাঁতরে জল কাটি আমি 
গুটিকয়েক জলকণা গায়ে মেখে।
অনেকবার ভাবি ভেজা নক্ষত্র হয়ে আর
তোমাকে চিঠি লিখবো না..
বরং, আকাশের কাছে গান শুনবো,
ঝর্নার মত কলকলিয়ে হাসবো,
রোদের মত জড়িয়ে রাখবো নিজেকে।
তবু, লেপ্টে যাওয়া আবেগেও তো অপেক্ষা থাকে!
পলাশ মাখার সময়ে নীরবতাও থাকে...
যখন বুক কাঁপে, ঘুম ভাঙ্গে.... ঝড়ে বাতি নেভে
তখন তোমায় নিয়ে ভাবতে ভালোই লাগে, তবে -
যে অনুভূতিগুলো ছুঁড়ে ফেলেছি ছলাৎ শব্দে
সেগুলো আর রিনিঝিনিতে ফেরে না
থাকে কালো মেঘের পৃথিবীতে।
তাই কষ্ট পাই না যদি আজ জোৎস্না রাতে বৃষ্টি হয়!
আমি বোধহয় দিব্যি ভালো আছি এখন।
তাই, নতুন করে আর কি লিখি বলতো?
কোন খবরে খুশি হবে তুমি!
ক্ষতি হয়েছিল তখন....
যখন হাতের মুঠোয় বালিকে ধরতে চেয়েছিলাম!
মনে আছে? সেদিনের সেই সুগন্ধি খামের কথা!
নদীর পাড়ে ঘর বাঁধবে বলেছিলে,
তাজা ফুলের গন্ধে ভরিয়ে দেবে আমার চুল।
দস্যিপনায় কলকলিয়ে হাসলে ছুঁয়ে দিতে ঠোঁট।
আমিও তো সব ভুলে বসন্ত আঁকতাম।
উজাড় করা বুকের মাঝে থাকতো শুধু স্বপ্নের যাওয়া আসা
লাল, নীল, সবুজ সুতোর বুননে বেড়ে উঠেছিল
আমার ভালোবাসার বাড়ির ফুল আঁকা জানলার পর্দা।
ভেবেছিলাম পাওয়া এখনও শেষ হয়নি।
তবু তো গহীন সন্ধ্যা নেমেছিল...
পাতার আকুতি হয়েছিল ঝরে যাওয়ার আগে।
আকাঙ্খার পুড়ে যাওয়ার গন্ধ পেলেই
আমি সেই নদীর কাছে যাই, বলি...
লক্ষ্মীটি, ভাসিয়ে নাও আমায়।
তোমার বুকের মধ্যের নুড়িগুলোর গল্পতো রোজই লেখো
আজ না হয় কথা বলো আমার সাথে নিভৃতে।
তবে নোনা জলে কবিতাও ভাঙ্গে
আমার যে অন্তর আছে, আমি কাঁদি কষ্টে 
কিন্তু কিছু ভাঙলে বাকিরা শুধু শূন্যতা দেখে।।

ভালোবাসার বাক্স....নীলাঞ্জনা সরকার

 


ছোট কাঠের বাক্সটা বেশ পুরোনো কিন্তু সুন্দর নকশা কাটা। মনোতোষ দুদিন হলো উটি বেড়াতে 
এসেছে। রাত গভীর হতে শুয়ে পড়লো সে। অন্ধকার ঘরে কেমন মিষ্টি একটা গন্ধ, রুপার প্রিয় রবীন্দ্রসংগীত ভেসে আসছে- "আমার মল্লিকা বনে"...সেই আকর্ষণীয় হাসি! আজকাল মনোতোষের 
মন কেমন করে না, হারিয়ে যায় না সে। তবে কি যেন একটা কুরে খায় ওকে! কতদিন নিজের পছন্দের আফটার শেভটাও ছুঁয়ে দেখেনি। রুপাকে ব্যস্ত করতে চায় না বলে ঘরে চুপচাপ নিজের মত বসে থাকে। 
           রুপার সাথে মনোতোষের সম্বন্ধ করে বিয়ে হয়েছিল। ফুলশয্যার রাতে শুনেছিল নতুন বউয়ের মুখে, সে নাকি জীবনে খুব বেশি পুরুষের সংস্পর্শে আসেনি। বাড়ির অনুশাসনে বাঁধা ছিল সবকিছু। গার্লস স্কুল, কলেজে পড়া এবং হোটেল -রেস্টুরেন্ট যাতায়াত অভিভাবকের সাথেই। টিউশন থেকে ফিরতে একটু রাত হলে কৈফিয়ত দিতে হতো রুপাকে বাড়িতে। কিছুক্ষণ নির্বিকার ছিল মনোতোষ সব শুনে। সেদিন বউকে সোহাগ করেনি....বরং বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছিল। তবে সেটাই বোধহয় মস্ত ভুল ছিল। মনোতোষ প্রায়ই ভাবে, যদি সে একটু তলিয়ে দেখতো তাহলে সহজেই পরিষ্কার হতো মিথ্যেগুলো কারণ দুদিন পরেই ভালোবাসার প্রথম রাতে রুপা খুব অবাক করেছিল মনোতোষকে তার নিপুণ আঙুলের খেলায়। তবু নিজেকে শান্ত করেছিল মনোতোষ  নিজের ভুল ভেবে। এক বছর পর মনোতোষের মা চলে গেলেন তাকে ছেড়ে। বাবা আগেই অমৃতের পথে যাত্ৰা করেছিলেন, মনোতোষ 
তখন ক্লাস এইটের ছাত্র। মা রুপার হাতে দিয়ে গেলেন তার প্রিয় কাঠের বাক্স। মাকে দিয়েছিলেন মনোতোষের ঠাকুমা। ওটি আসলে দাদুর দেওয়া প্রথম উপহার ছিল মনোতোষের ঠাকুমাকে। রুপা সবসময় আগলে রাখতো বাক্সটা। মনোতোষ ধীরে ধীরে ক্ষমা করে দিয়েছিল স্ত্রীকে। কিন্তু ওই বাক্সটাই একদিন সত্য উপড়ে আনলো। কত রঙিন চিঠি ছিল ওতে.... ছিল কত ভালোবাসার লাইন! খুব লড়াই করেছিল মনোতোষ নিজের সাথে, সত্যের সাথে। কিন্ত সময়ের সাথে ক্লান্ত হয়ে মানিয়ে নিয়েছিল সে। আর তেমন কিছু বলতো না রুপাকে তবে সাথ ছাড়েনি সে স্ত্রীর। সেই ভেবেই ওদের সাথে উটি আসা। 
ওরা লীলাখেলায় মত্ত হতো আর মনোতোষ চোখের জলকে ভাসিয়ে দিত।
            তবে, আজ যখন দেখলো রুপাকে ব্যবহার করতে চাইছে তার প্রেমিক..তখন আর চুপ থাকতে পারলো না মনোতোষ। একটু নিজেকে নতুন ভাবে পেতে ইচ্ছে হলো মনোতোষের। আর কতদিন এভাবে....নাহ! একটু তো নিজের খুশির কথা ভাববো। বিছানা থেকে উঠে পড়ে সে, এগিয়ে যায়। মনোতোষ জানে তার শরীরটা আর আগের মত নেই...শুকিয়ে গেছে, শক্তি নেই। চাইলেও অনেক কিছু করে উঠতে পারে না সে। তবু একটা শেষ চেষ্টা। লোকটা পালিয়ে গেল। ভালোই হয়েছে। রুপার কাছে ফিরে আসে মনোতোষ। দেখে রুপার দেহটা....চোখ দুটো বিস্ফোরিত! যেন কিছু দেখে ভয় পেয়েছে! হার্টফেল করেছে রুপা। খানিকটা বিমর্ষ হয় মনোতোষ, যেদিন প্রেমিকের সাথে মনোতোষের গলা টিপে ধরেছিল রুপা...ঠিক এভাবেই দমবন্ধ হয়ে চোখ ঠিকরে বাইরে বেরিয়ে এসেছিল তার। পোস্টমর্টেম হলো, আদালতের তারিখ পড়লো বেশ কিছু কিন্তু রুপা ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের দোহাই দিয়ে বেঁচে গিয়েছিল। আদালতে প্রমাণ হয়েছিল সে সেল্ফ ডিফেন্সের জন্য স্বামীকে বাধা দিয়েছিল আর তাতেই মনোতোষের অ্যাক্সিডেন্টাল ডেথ।
          রুপার প্রেমিক সেও হয়তো ছিল কারও মনের মানুষ। আচ্ছা, ওরা কি কেউ প্রেমের প্রকৃত অর্থ বুঝতো! ওই কাঠের বাক্সটা আর কোনও কাজে আসবে না। রুপা উটি এসেছিল সাথে ঐ বাক্স ভর্তি গয়না নিয়ে.... বোধহয় ভেবেছিল আর ফিরবে না। মনোতোষ স্পর্শ করতে চায় ওই বাক্স, কিন্তু পারে না। বাক্স তো নিমিত্ত মাত্র মনোতোষ তো সুখটাকেই ছুঁতে পারলো না। বাক্সটা বরাবরই ছিল ভালোবাসার কিন্তু হাত বদলে সেই সম্পর্কের অর্থ বদল হলো। হোটেলে দোতলার ঘরটির বারান্দায় আসে মনোতোষ....বেশ ঠান্ডা মনে হয়! নীচে সবাই শরীরে অনেক কিছু চাপিয়েছে। কিন্তু তার আর এসবের প্রয়োজন হয় না। হিমশীতল মর্গে দুদিন থাকার পর থেকে এই ঠান্ডায় কিচ্ছু মনে হয় না তার।

Monday, April 5, 2021

আলাপন.... নীলাঞ্জনা সরকার

 



ভোরের আলো চোখে এসে পড়ে

যাপন করি নিজেরই আলাপন। 

নিজেকে কখনও অপদার্থ ভাবিনি 
উদাসীন ভাবিনি! উদ্বাস্তু করিনি! 
তুমি ভেবেছো নাকি আমি আত্মমগ্ন?
আমি শিথিল মিথ্যাচারে...
আমি তাণ্ডব করি তোমার সাফল্যে!
মনে হয়েছে বুঝি...
আমি তোমার মস্তিষ্ক স্নায়ুকে সম্মোহিত করি!

তবে শোনো, আমি কেবলই স্বপ্নবাসিনী 
চিরাচরিত উপেক্ষিত অন্তঃপুরে। 
তোমারই পরিচয়ের পরিব্রাজক রূপে...
মোহ মায়া ব্যতিরেকে উৎসব করি খালি,
অগোছালো চুলে।।

টিকটিকি ও মার্জার গিন্নি..... নীলাঞ্জনা সরকার

 



সুবিমল খবরের কাগজ হাতে চা খাচ্ছিল রবিবার সকালে। ক্রাইম সংক্রান্ত খবরে বেশি চোখ যায় তার। স্বপ্ন দেখে... সব কাজ ফেলে কালো টুপি আর চশমা পরে অপরাধীর পিছনে দৌড়াচ্ছে সে! টিকটিকি হওয়ার খুব সখ ছিল তার। ডাক পরে সুবিমলের।
- ওগো, শুনছো। দেখো, আজও দুধের প্যাকেট কে নিয়ে গেলো! ডোরবেল বেজেছে আর আমি রান্নাঘর থেকে এসে দরজা খুলেছি, এর মধ্যেই দুধ হাওয়া....
- দেখছি...
- শোনো সব দুধওয়ালার কাণ্ড। একটা আস্ত জোচ্চোর। রোজ আমায় মিথ্যা বলে...."বৌদিমনি আমি তো দু প্যাকেটই দিয়েছি।"
বউয়ের রাগ দেখে সুবিমল ঠিক করে এই কেসটা দিয়েই সে তার গোয়েন্দা জীবনের শুরু করবে। দুধওয়ালা থেকে শুরু করে আশেপাশের কয়েকবাড়ি ফোন করে তদন্ত শুরু করে দেয় সুবিমল। একটা হেস্তনেস্ত করতেই হবে নয়তো সম্মান থাকবে না। দুটো ক্রাইম সিনেমাও দেখে ফেলে সে। রাতে ডিনারের পর একতলার বারান্দায় এসে চুপটি করে অন্ধকারে অপেক্ষা করে অপরাধীর। সুবিমল ভাবে দুধের প্যাকেট নিমিত্ত মাত্র, নিশ্চয়ই বড় উদ্দেশ্য আছে চোরের! আমাদের মনঃসংযোগ যেই দুধের প্যাকেটের ওপর কেন্দ্রীভূত হবে অমনি চোর তার আসল কাজ সারবে। কিন্তু সে থাকতে কিছুতেই তা হতে দেবে না, রাত বাড়ে চোখ কচলে জেগে থাকার চেষ্টা করে সে। এমন সময় সদর দরজার পাশে কিসের যেন ছায়া দেখতে পায়। শিরদাঁড়া টানটান করে, বুকের ধুকপুক কন্ট্রোলে রেখে সোজা তাকিয়ে থাকে সুবিমল... কিন্তু কিছুক্ষণ পর সেই ছায়া মিলিয়ে যায়। তার মানে অপরাধী নিশ্চয়ই বুঝেছে তার উপস্থিতির কথা তাই চুপটি করে অপেক্ষায়। কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল জানে না সুবিমল, ঘুম ভাঙ্গে দুধওয়ালার আওয়াজে। ব্যস, এইবার কেল্লাফতে হবে কিন্তু সব মাটি হয়ে গেল যখন ওদের পাড়ার মিনি দৌড়ে এসে একটা দুধের প্যাকেট নিয়ে হাওয়া হয়ে গেল। ফুস করে যেন হাওয়া বেরিয়ে গেল সুবিমলের... সাথে বউয়ের হাউমাউ। সারারাত বারান্দায়, ক্লান্ত হয়ে উস্কোখুস্কো চুলে হাত বোলাতে বোলাতে ঘরে ঢুকে স্বগতোক্তি করে "পাড়ার মিনিটা দুধ খেতে বড্ড ভালোবাসে।" বউ ঘুরে তাকায় অগ্নি চোখে, সুবিমল ক্যাবলা হাসে মার্জার গিন্নির কথা ভেবে।

-------------------------

প্রেম ডট কম... নীলাঞ্জনা সরকার

  একটুখানি খোলা আকাশ দেখার সৌভাগ্য যে কবে হবে! নির্মল দীর্ঘশ্বাস ফেলে...সব সুখ বিলীন হয়ে গেছে মৃন্ময়ীর সাথে। মনে আনাগোনা করে মৃন্ময়ীর সাথে...