Monday, December 28, 2020

ভ্যাম্পায়ার..... নীলাঞ্জনা সরকার

 


-ধর্মাবতার, আমায় শাস্তি দিন। আমি আমার দোষ স্বীকার করছি।
-আহা করো কি! আমাকে আমার কাজটা করার সুযোগ তো দাও।
অনিলবাবু তার মক্কেলকে থামিয়ে নিজের কালো কোটটাকে একটু ভালো করে গায়ে জড়িয়ে কথা শুরু করলেন...
-আচ্ছা বলুন তো ধর্মাবতার, ভ্যাম্পায়ার সামনে এলে আপনি কি করবেন? 
-কি আবার করবো? পালাবো।
-কিন্তু কেউ যদি না পালিয়ে বীরের মত তার সাথে লড়াই করে তাহলে তাকে কি বলবেন?
-মানে! এই একটা সহজ খুনের মামলায় এসব কি বলছেন আপনি?
সরকারি পক্ষের উকিল হেসে ওঠেন, অনিল বাবুর মাথা খারাপ হওয়ার একটা ইঙ্গিত দেওয়ার চেষ্টাও করেন... কিন্তু ডাকসাইটে উকিল অনিল নস্কর তাতে দমে যাওয়ার পাত্র নন। তিনি বলে চলেন,
-ধর্মাবতার। আমরা জানি ভ্যাম্পায়ার আঁধারে আসে, বৃষ্টিতে আসে। কিন্তু আমার মক্কেলের স্বপ্নের দিনগুলি ম্লান হতে শুরু করেছিল এক অদৃশ্য রক্তশূন্যতা থেকে। ভ্যাম্পায়ার এক অন্য রূপে অবতীর্ণ হয়েছিল তার জীবনে। আচ্ছা বলুন তো, মোতি বিবির কি চিরকাল কোটরে থাকার কথা? তার কি কোনও অধিকার নেই আমার মক্কেলের হাত ধরে শহরের আলোর অধিকার কেড়ে নেওয়ার! আমি তো স্যালুট করি এই প্রেমিককে, ভ্যাম্পায়ার নিধন করে সে নীল আকাশ দিয়েছে তার ভালোবাসাকে।
-একটু খুলে বলুন।
- নিশ্চয়। একটু চোখ বন্ধ করে ভাবুন একটা নিষ্পাপ  মেয়ে অবস্থার ফেরে আলাদা হলো নিজের পরিবার থেকে। নিজের স্বপ্নগুলো বিসর্জন দিয়ে রঙিন হতে হলো তাকে। একদিন সে খোলা জানলার পাশে দাঁড়িয়ে শুনতে পেলো কে যেন তাকে নতুন নামে ডাকছে! ভালোবাসার আর এক নাম নিয়ে এলো তার জীবনে তার মন্টু, আমার মক্কেল। 
- আপনার মক্কেল নিজে মুখে স্বীকার করেছে তার কৃতকর্মের কথা তাই আইনকে তার রায় দিতেই হবে।
- ঠিক ধর্মাবতার। কিন্তু যখন চোখের সামনে নিজের মোতিকে লালসার শিকার হতে দেখবে তখন...সে কি এভাবেই চুপ করে থাকতে পারতো নাকি থাকা উচিত ছিল তার! আপনিই বলুন তখন কি শরীরের সমস্ত শিরা উপশিরাগুলো ফুটে উঠবে না! বিবেক চেঁচিয়ে বলবে না যে ওই ভ্যাম্পায়ারের নিধন হোক! রায় দেওয়ার আগে একটু ভেবে দেখবেন যে আমার মক্কেল একটা অন্যায় করে এমন অনেক মোতি বিবিকে শান্তি দিল।
জজ সাহেবের চোখের সামনে ফাঁসির দড়ির বদলে ভেসে ওঠে সুখের খোঁজে উড়ে যাওয়া একদল পরিযায়ী পাখি।।


প্রচ্ছদ......নীলাঞ্জনা সরকার

 


মিনি গৃহিণী হওয়ার সাথে সাথে লিখতে ভালোবাসে। সকাল থেকে রাত গড়িয়ে যায় তার সংসার সামলাতে, আর মা হওয়ার পর থেকে তো কথাই নেই...সন্তান যাতে সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠতে পারে সেদিকে সে একনিষ্ঠ। এত ব্যস্ততার মধ্যেও নিয়ম করে কল্পনা তার মনের দরজা খুলে রোজ ডায়েরির পাতায় বাস্তব হয়ে ওঠে। 

         আজ শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক পুরস্কার পাওয়ার পর সাংবাদিক সম্মেলনে স্মিত হেসে মিনি বলে..."আমি সংসারের জন্য কতটা উৎসর্গীকৃত এর উত্তর এত বছরে দেওয়া হয়নি তার বদলে সময় পেলেই খাতা কলমকে বন্ধু করেছি"... মিনির জন্য ফুলের তোড়া হাতে অপেক্ষায় আজ বাড়ির সকলেই।
          রাত বাড়লে সবাই শুয়ে পরে কিন্তু মিনির চোখে ঘুম আসেনা নিজের সাফল্যের পিছনের ইতিহাসটা মনে করে। অনেক খুঁজে পুরোনো এক পত্রিকা বের করে সে, তার লেখালিখি শুরু হওয়ার প্রথম দিকে প্রকাশিত ছিল সেটি। ধুলো ঝেড়ে আবার যেন নতুন করে দেখে তার প্রচ্ছদটি। খুব পছন্দ ছিল ধূসর কালো অ্যাবস্ট্রাক্ট ছবিটি তাই আজও সযত্নে বইটি সামলে রেখেছে মিনি। শিল্পী যেন তার সবটা দিয়ে এঁকেছিলেন! ছবিটির অর্থ অত বছর আগে খুব একটা বোঝেনি মিনি, তবে আজ বোঝে শিল্পীর অবহেলিত মনের কথা। ছবিটিতে এক অবয়ব তার সকল মনোবাঞ্ছা নিয়ে এক চিলতে রোদ বারান্দায় আকাশের সমস্তটা জুড়ে, সেখানে নেই কোনো পরিহাস, নেই কোনো ভুল বোঝাবুঝি.... আছে শুধু এক অনন্ত অপেক্ষা তার একান্ত নিজের প্রেমিক মনের জন্য। 
       পত্রিকা খুলে দেখে মিনি, বিষয় ছিল 'আত্মনির্ভরশীলতা'.....সকল লেখক লেখিকা নিজেদের মত করে বিষয়টি ফুটিয়ে তুলেছিলেন অবশ্যই, সাথে মিনিও। কিন্তু প্রচ্ছদ শিল্পী! সে কি করে সবার মনে অবগাহন করে এমন এক কাহিনী বানালেন রং তুলি দিয়ে.... অপূর্ব! আসলে একটা বই যতটা সাহিত্যিকের ঠিক ততটাই প্রচ্ছদ শিল্পীর, নাহলে কলমের ভাগিদার না হয়েও এমন ভাবে ভাবনার কল্পলোকে পাড়ি দিতে কজন পারে? মিনি নাম খুঁজে বের করে, পরিমল... কিন্তু পদবি ম্লান হয়ে গেছে পুরোনো গন্ধে! মিনি ঠিক করে ওনাকে খুঁজে বের করতেই হবে। ওই পত্রিকার সাথে যুক্ত মানুষগুলোর সাথে আজ আর তার যোগাযোগ নেই তবুও একটা শেষ চেষ্টা করে দেখবে সে, এই ভেবে সেদিন শুয়ে পড়ে মিনি।
            সকালে বাড়ির সামনের ছোট বারান্দায় বসে চা খেতে খেতে মেয়েকে পত্রিকাটির নাম বলে মিনি, আরও বলে একটু ইন্টারনেট ঘেঁটে দেখতে সেটি এখনও প্রকাশিত হয় কিনা। আজকের যুগের মেয়ে একেবারে সিদ্ধহস্ত, কিছু পরেই সব খবর নিয়ে হাজির। মিনি সম্পাদক মহাশয়কে ফোন লাগায়.... ও পাশে অপরিচিত কণ্ঠস্বর, কিন্তু মিনি যে ততদিনে সবার খুব পরিচিত এবং প্রিয় লেখিকা হয়ে উঠেছে। তাই তার নাম শুনেই সম্পাদক বাবু বিনয়ের সাথে যোগাযোগের কারণ জিজ্ঞেস করলেন। সব জেনে মিনি রওনা দেয় এক অজানার উদ্দেশ্যে কারণ নাম ঠিকানা জোগাড় হলেও সেই প্রচ্ছদ শিল্পী আজও বেঁচে আছেন কিনা সে খবর পাওয়া যায়নি।
            এক পুরোনো বাড়ির নিচে দাঁড়িয়ে মিনি, ডোরবেল বাজালে একটি বাচ্চা মেয়ে দরজা খোলে। নাম জিজ্ঞেস করে আশ্বস্ত হয় মিনি, শিল্পী মেয়েটির দাদু। ওপরে উঠে আসে লেখিকা। কিছু সময় পর এক বয়স্ক মহিলা আসেন মিনির সামনে। বলেন,
-এসো মা। কতদিন পর এ বাড়িতে ওনার জন্য কেউ এলো!            
অন্য এক ঘরে মিনিকে নিয়ে এলেন তিনি। ইজিচেয়ারে বসে থাকা একজন আশি-ঊর্ধ্ব মানুষ বেশ মোটা চশমার ফাঁক দিয়ে দেখেন মিনিকে। মিনি বলে,
- আমায় আপনি চিনবেন না হয়তো। সে অনেককাল আগের কথা।
- চিনবো না কেনো? মনে করিয়ে দাও একটু ছবিটা, তাহলেই পারবো।
- ছবিটা! কোন ছবির কথা বলছেন?
- সেই ছবি যা তোমার মনে আমায় ধরে রাখতে পেরেছে। 
মুগ্ধ হয় মিনি পরিমল বাবুর কথার তাৎপর্যে। 
- আসলে অনেক কাল আগে আমার লেখা এক পত্রিকার প্রচ্ছদ করেছিলেন আপনি। তারপরেও আমি অনেক প্রচ্ছদ শিল্পীর সান্নিধ্যে এসেছি, সকলেই অনবদ্য। অনেকের সাথে পরবর্তীকালে আলাপও হয়েছে কিন্তু আপনি যেন হঠাৎ হারিয়ে গেলেন.....
- না তো! হারাই নি তো! তাহলে কি তুমি ছুটে আসতে আমার কাছে। আমি  যত এঁকেছি তত কাছ থেকে লেখালিখিকে অনুভব করেছি। বই আর তার প্রচ্ছদ দুই যে অভিন্ন হৃদয়, একে অপরকে ছাড়া পরিচয়বিহীন।
- তাহলে হঠাৎ সব ছেড়ে দিলেন কেন? আপনার হাতে যে জাদু আছে তা আজকের প্রজন্মও মানবে। আপনি শুধু আবার কাজ শুরু করুন।
- তা যে আর কোনোদিন সম্ভব নয় মা। যে চোখ দিয়ে তোমাদের অনুভূতিগুলো স্পর্শ করে আঙুলের ছোঁয়ায় প্রাণ দিতাম সেটাই তো বিট্রে করেছে আমায়। অনেকদিন হলো ভালো দেখতে পাইনা। নার্ভ শুকিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। সামনেটা ঝাপসা হয়ে আসে বলে আমার কল্পনার চরিত্রগুলো এঁকেবেকে যায়... দিক ভ্রান্ত হয়।
মিনি কথা হারায়, বিমর্ষ হয়ে বলে..
- আপনার রঙ তুলির কল্পনারা যদি আমার পাশে থেকে আমায় অনুপ্রাণিত করত তাহলে হয়তো আরো জীবন্ত হয়ে উঠতো আমার চরিত্ররা। 
ফিরে যাওয়ার আগে আজকের স্বনামধন্য লেখিকা পা স্পর্শ করে এক প্রচ্ছদ শিল্পীর.......

Thursday, December 24, 2020

প্রত্যাবর্তন..... নীলাঞ্জনা সরকার

             

"সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় আর নেই "....খবরটা শোনার পর থেকে মন ভালো নেই রিমলির। ছোটোবেলার অনেক স্মৃতি ভেসে উঠলো মনে... দশ বছরের জন্মদিনে বাবা কিনে দিয়েছিল 'গ্যাংটকে গন্ডগোল'। 
বইটাকে উল্টে পাল্টে দেখে সেদিন রাতেই পড়ে শেষ করে ফেলেছিল সে। কি উত্তেজনা সেই উপহার নিয়ে, উফ্! এখন এমন সহজ সরল ভালোলাগাগুলো হারিয়ে গেছে রিমলির জীবন থেকে। রিমলির বিয়ে হয়েছে আজ প্রায় আট বছর, ওভারিয়ান জটিলতার জন্য পর পর দুটো মিসক্যারেজ। ডাক্তার বলে দিয়েছে এরপর গর্ভবতী হলে জীবন সংশয়। তারপর সবকিছু থেকে বিমুখ হয়ে গিয়েছে রিমলি, এমনকি আজকাল মা বাবা ফোন করলেও ধরে না। স্বামী অনেক বোঝায়, এও বলে..
- তোমার বাড়ির লোকের কি দোষ! মেয়েরা যে এভাবে মা বাবাকে ভুলে যেতে পারে, তা আমি ভাবতেও পারছি না রিমলি। তোমার কোথাও ভুল হচ্ছে।
- কিসের ভুল! আমায় নিয়ে মা বাবার খুব গর্ব ছিল, ছোট থেকে শিখিয়েছিল হার বলে কিছু নেই। অথচ দেখো, এখন কেমন সব হারানোর দেশের রাণী হয়ে বসেছি!
.....কিন্তু আজ এই রিমলির চোখেই জল। অন্তিম সজ্জায় প্রিয় মানুষটাকে টিভির পর্দায় দেখে মনটা আকুল হয়ে ওঠে তার। 
...আচ্ছা, বাবার কত বয়স হলো? আগের জন্মদিনে ফোন করেছিলাম কি? ঘামে ঘেঁটে যাওয়া মায়ের কপালের লাল সিঁদুরের টিপ... ঝাপসা হয়ে যাওয়া শৈশবের বারান্দাটা খুঁজে পেতে চায় রিমলি। বাড়িয়ে দেওয়া বার্ধক্যের হাতগুলোকে রিমলি যে অনেকদূরে সরিয়ে দিয়েছে গর্ভের অজানা আগন্তুকের জন্য। 
 কাঁপা হাতে ডায়াল করে সে.... অন্য প্রান্ত থেকে ভেসে আসে খুব চেনা এক কণ্ঠস্বর,
- হ্যালো, কে?
কথা হারায় রিমলি, শুধু চোখের জল বাঁধ মানে না।
- মা রে, তোর সাথে খুব ঝগড়া জমে আছে আমাদের। এই বুড়ো ছেলে মেয়েটার কথা একেবারেই ভুলে গেলি? নিজেকে নিঃসন্তান ভাবলি কি করে? ওরে, আমরা কি তোর সন্তানের চেয়ে কিছু কম! তোর জন্মের পর থেকে যে তোকে শুধু মা বলেই জেনেছি।
- আমায় ক্ষমা করে দাও। নাড়ির টানের প্রকৃত অর্থ বুঝিনি আমি।

অলক্ষ্যে বিধাতা হাসে....

"ভেবো না আমি হারিয়ে গেছি থাকবো না আর মনে,
বরং সযতনে বাঁধবো বাসা তোমারই আনমনে।"

এ কেমন বন্ধু!!....... নীলাঞ্জনা সরকার

 

                                                                          

ছোট থেকেই আমার ভূতের ভয়টা একটু বেশি। বন্ধু বান্ধব, আত্মীয় স্বজন এই নিয়ে কম মজা করেনি। কিন্তু আমি রেগে না গিয়ে আমার এই বিপর্যয় মাথা নত করে মেনে নিয়েছি কারণ কোথাও যদি একজন ভূতও আমার অহংকার দেখে মাথা চাড়া দিয়ে আমার ঘাড়ে চেপে বসে তাহলে আর রক্ষে থাকবে না। এভাবেই স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটির গন্ডি পেরিয়ে আমি এখন আমার প্রকাশনা সংস্থার বড়বাবু। তবে ভুত শব্দটার সাথে আমরা সবাই পরিচিত হলেও এ নিয়ে নানারকম তর্ক বিতর্ক চলে আসছে বহুদিন ধরে। বিশেষ করে কলকাতা শহরে এত বেশি আলোর রোশনাই যে ভূতেরা তাদের রাজ্যপাট চুকিয়ে অন্যত্র চলে গেছে বলেই মনে করেন আমার বেহালার বাড়ির প্রতিবেশীরা। আমার পরিচয়টাই দেওয়া হয়নি! আমি শশাঙ্ক মিত্র। কেন বিয়ে করিনি বললে আমায় পাগল ভাববেন। এর পেছনেও একটিই কারণ, ভূত। ধরুন যদি আমার বউ হরর সিনেমা দেখতে পছন্দ করে, তখন! আবার এমনও হতে পারত মেকআপ এর পর বউকে দেখে রাত বিরেতে শাকচুন্নি ভেবে আমার হার্ট ফেল হয়ে গেল। না বাবা, সুখের থেকে স্বস্তি ভালো। তাই আমি সাত পাকে বাঁধা পড়তে দিইনি নিজেকে। এই প্রকাশনার সূত্রে আলাপ অনিক চৌধুরীর সাথে। তিনি ইঞ্জিনিয়ার, কিন্তু লেখালেখি ওনার নেশা। তাই  অন্যের অধীনে চাকরির ঝামেলায় উনি একেবারেই যাননি। নিজের ডিগ্রি শিকেয় তুলে একটা বই এর দোকান দিয়েছেন কলেজস্ট্রীটে ...ভালোই চলে সেই দোকান সাথে তার লেখালেখিও। এই অনিক চৌধুরীর দু চারটে গল্পের বই আছে আমার প্রকাশনা অফিসের সুবাদে । নিজের দোকান হওয়ার জন্য বিক্রিও মন্দ হয়নি। একদিন অনিক বাবু মনে মনে ভাবলেন অনেক হলো গল্প লেখা এবার একটু কবিতা লিখলে কেমন হয়! আমি প্রথমে ভেবেছিলাম কবিতা! এ কি আর অনিক বাবু পারবেন? মেজাজ যা তিরিক্ষি ওনার বিন্দুমাত্র রসবোধ নেই। উনিও ব্যাচেলর। তবে আমার সাথে গুলিয়ে ফেলবেন না। আমি কিন্তু খুব হাসি খুশি মানুষ। তবে আমার সব ভাবনা ভুল প্রমাণ করে একদিন মোটা একখানা পাণ্ডুলিপি এনে হাজির করলেন। আমার তো চোখ কপালে উঠে যাওয়ার যোগাড়! অনিক বাবু মানুষটি খুব সরল ছিলেন তিনি আমার মনোভাব বুঝে বললেন - মশায়, এর পিছনে একটা কাহিনী আছে। শুনবেন নাকি? তবে মন শক্ত রাখবেন। আমি আমতা আমতা করে রাজী হলাম। অনিক বাবু বললেন তিনি নাকি তাঁদের দেখা পেয়েছেন। তবে যে সে নয়, এ হলো বন্ধু। আমায় কবিতা লেখার কথা বলে তিনি নাকি বসেছিলেন সেদিন রাতেই কাগজ কলম নিয়ে। দু তিন লাইন লেখেন আর ছিঁড়ে ফেলেন খাতার পাতা। তারপর অনিক বাবু যা বললেন তা বর্ণনা করার ক্ষমতা আমার নেই তাই ওনার জবানিতেই বাকি গল্পটা আপনাদের শোনাই। সেদিন রাতে....

অনিক বাবু (স্বগতোক্তি)- আসলে লিখবো বললেই তো আর হয় না, কবিতা লেখা কি চাট্টিখানি কথা? কবিতা হতে হবে জলতরঙ্গ যা মনের মধ্যে অনেকক্ষণ তার টুং টাং রেশ রেখে যাবে।

 -ঠিকই ভেবেছেন। একদম খাঁটি কথা।

চমকে উঠলেন অনিক বাবু! কে রে বাবা! বলে এদিক ওদিক তাকিয়েও কাউকে দেখতে পেলেন না। ভাবলেন মনের ভুল। একটু জল খেয়ে আবার মন দিলেন কবিতা লেখায়। এবার যেন একটু ছন্দ আসছে বলে মনে হচ্ছে....লিখতে লিখতে জোরে জোরে বলতে থাকলেন অনিক বাবু,

"বাঁশ বাগানে চাঁদের আলোয় চুপি চুপি খেলা
ওরে ভোলা, ওরে বিশু দেখে যারে তোরা।"

হঠাৎ খুব বিচ্ছিরি গলায় কে যেন পাশ থেকে বলে ওঠে -

"নিশুতি রাতে কে হেঁটে যায়, চুলগুলো যার খাঁড়া
চশমা চোখে দেতো হাসি, কে আবার!
প্যায়ারেলালের মামা।। "....

শেষ হতে না হতে খক খক কাশি। অনিক বাবু তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন কারণ কবিতায় যে মামার কথা বলা হলো তার সাথে নিজের চেহারার বেশ খানিকটা মিল আছে। কার এত বড় সাহস তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ করে, এমন কবিতা লেখে আর তাকেই শোনায়! কিন্তু ঝগড়া করবেন কার সাথে, কাউকেই তো দেখতে পাচ্ছেন না। এমন সময় আবার কাশির আওয়াজ, শব্দের দিকে এগিয়ে যান অনিক বাবু। তার ঘরের জানলা খোলা, সেখানে এসে দাঁড়ালে বাড়ির সামনের ছোট আমগাছটার  একটা  ডাল দেখা যায়, লম্বা মানুষ হলে একটু কষ্ট করে হাত বাড়িয়ে দু চারটে পাতাও তুলে আনতে পারবে এতটাই কাছে। সেই ডালে যেন কিছু একটা ছায়া মত দেখতে পেলেন অনিক বাবু। প্রথমটায় শিউরে উঠলেন তারপর ভাবলেন আজ তো অমাবস্যা তাই বেশ অন্ধকার, মনের ভুল হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। যেই পিছন ফিরলেন অমনি কেউ বলে উঠলো ..

- মনের ভুল টুল নয়। তা রোজই ভাবি একটু আলাপ করবো কিন্তু হয়ে ওঠে না। গল্প লিখতে দেখেছি তোমায় কিন্তু আজ যখন কবিতা লিখতে বসলে তখন কি যে খুশি হলাম তা বলে বোঝাতে পারবো না। 

অনিক বাবুর সারা শরীর ঘেমে নেয়ে একাকার। তাড়াতাড়ি জানলা বন্ধ করতে গেলেন কিন্তু সেই কণ্ঠস্বর আপত্তি জানালো।

- কেমন লোক রে বাবা! একা থাকে বলে একটু গল্প করতে চেয়েছি তাই বলে কি পালিয়ে যেতে হয়?

গোঁ গোঁ শব্দ করে মাটিতে পড়ে গেলেন আমাদের লেখক অনিক চৌধুরী। যখন তার চোখ খুললো তখন ঘর অন্ধকার। শুধু রান্না ঘরের আলোটা জ্বলছে আর তাতে দেখা গেল চেয়ারে বসে সেই ছায়ামূর্তি। অনিক বাবু উঠে বসতে গেলেই সে বলে উঠলো, 

- আহা করো কি ভায়া? জানো কতক্ষন অজ্ঞান ছিলে তুমি! পাক্কা একদিন। আমার তো ইচ্ছে হলেও জলের ছিটা দিতে পারলাম না। 

এই কথায় অনিক বাবুর একটু ভরসা হলো যে ওই ছায়া তার কোনো ক্ষতি করবে না। তিনি সাবধানে উঠে পাশের চেয়ারটিতে বসলেন। সাহস করে জিজ্ঞেস করলেন - আপনি কে? 

হো হো করে হেসে উঠলো সে, বললো - আমি কে তা এখনও বুঝলে না! ধরে নাও আমি তোমার অনেকদিনের প্রতিবেশী কিন্তু আজ আলাপ হলো।

অনিক বাবুর গলা শুকিয়ে কাঠ। সারা শরীর ঘেমে একসার, মেরুদণ্ড দিয়ে ঠান্ডা রক্তের স্রোত টের পাচ্ছেন কিন্তু কিচ্ছুটি করার নেই। ছায়ামূর্তি বললো,

- তুমি কবিতা লিখতে চাইছো দেখে সাহায্য করতে এলাম - আমার খুব কবিতা লেখার সখ ছিল জানো! কিন্তু হয়ে উঠলো না। 

অনিক বাবু বললেন, কেন?

- পটল তুললাম যে......

এ কথা শুনেই অনিক বাবুর দাঁতে দাঁতে ঠোকাঠুকি শুরু হয়ে গেলো। তার মধ্যেই ভয়কে চেপে রেখে বললেন, আমি বাথরুমে যাবো।

- তা যাও, কোনো অসুবিধা নেই। আমি অপেক্ষা করছি।

ছায়ামূর্তিকে ঘরে বসিয়ে অনিক বাবু বাথরুমে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিলেন। ভাগ্য ভাল আলোর সুইচটা ভিতরে তাতে আলো জ্বলে উঠলো। তিনি  নিশ্চিন্তে কল খুলে চোখে জলের ঝাপটা দিতে লাগলেন এই আশায় যে উনি বোধহয় স্বপ্ন দেখছেন আর এবার উনি জেগে উঠবেন! কিন্তু হঠাৎ সেই আলোটাও বিশ্বাসঘাতকতা করে চিড়বিড় করতে লাগলো। তিনি  দেখলেন কেউ যেন বাথরুমের কংক্রিটের দেওয়াল ভেদ করে বার বার আসা যাওয়া করছে।
অনিক বাবু ভাবলেন তার মস্তিষ্ক বিকৃতি দেখা গিয়েছে কিন্তু তারপর ওই আলো আঁধারিতে বেসিনের ওপরে বসানো আয়নায় দেখলেন তার কপালে বাঁ দিকে একটা সদ্য হওয়া কালশিটে। কি কান্ড! তার মানে স্বপ্ন নয়, পড়ে গিয়ে এই বিপত্তি। একটা হেস্তনেস্ত করবেন ভেবে তাড়াতাড়ি বাইরে এসে বললেন, 
- কি ব্যাপার বলুন তো? আর কতক্ষন আমার ঘরে থাকবেন? আমার মোটেই পছন্দ হচ্ছে না। আর বাথরুমে ঢুকেছিলেন কেন? 

ছায়ামূর্তি সাথে সাথে বললো - তুমি বেরোতে এত সময় নিচ্ছিলে তাই। আর আমারও পছন্দ হতো না জানো ওরা যখন আমার কি কি যেন সব নাম দিত তখন। তবু সব মানিয়ে নিয়েই চলেছিলাম অতগুলো বছর।

অনিক বাবুর ভয় আস্তে আস্তে কেটে যাচ্ছে, উনি জিজ্ঞেস করলেন - আপনি কাদের কথা বলছেন বলুন তো স্পষ্ট করে।

ছায়ামূর্তি অনিক বাবুর চারিদিকে দু তিনটে চক্কর দিলো খুব খুশি হয়ে। তাতে কেমন যেন সবুজ ধোঁয়া মত তৈরি হলো ঘরের মধ্যে। গা গুলিয়ে উঠলো অনিক বাবুর, দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বলে মনে হতে লাগলো। তিনি তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, কি হলো বললেন না! 

ছায়ামূর্তি আরও গদগদ হয়ে উঠলো। সে বললো- 
- মশাই, তুমিই প্রথম যে আমার গল্প শুনতে চাইলে। এবার বসো ভায়া চুপটি করে।
গল্প শুরু করে ছায়ামূর্তি - আমি ছিলাম নব বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। যত সব বাউন্ডুলে বেপরোয়া ছেলেগুলোর স্কুল ছিল ওটা। যেদিন প্রথম ওই স্কুলের দায়িত্ব নিয়ে আমার অফিস ঘরে ঢুকলাম সেদিনই আমার মাথায় বাজ ভেঙে পড়লো। আমার ঘরের টেবিলে, ফুলদানিতে কচুরিপানা ফুল। জুতোয় মসমস আওয়াজ করে পুরো স্কুল চষে ফেললাম কিন্তু কালপ্রিটকে ধরতে পারলাম না। আমার জুতোর আওয়াজে সবাই হুল্লোড় থামিয়ে গুড বয় হয়ে গেল ঠিকই কিন্তু কারো মুখ দিয়ে বেরোলো না সেই লক্ষ্মীছাড়ার নাম। তখন আমি নতুন তাই কাউকে ভালো করে চিনতাম না। ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম পালের গোদা সব অনিষ্টের মূল ওই বিল্টু। প্রতি ক্লাসে দু বছর করে পড়ে প্রায় সবার সিনিওর সে। তারপর একদিন.........

অনিক বাবু প্রথম দিকে বিরক্ত হলেও এখন বেশ মন দিয়ে শুনছেন। 

ছায়ামূর্তি বলে চলেছে তার স্কুলের বেশ কিছু গল্প। 
হঠাৎ সে বলে উঠলো- শোনো বাপু,  একটা কথা। আমার গল্পটাকে কিন্তু তোমার কলমে আনা চলবে না। এটি আমার সিক্রেট।

চমকে গেলেন অনিক বাবু, এ তো দেখি মনের কথা পড়তে পারে। বললেন - কই না তো। আমি সেসব কিছুই ভাবছি না। আপনি বলুন....

ছায়ামূর্তি বললো - আরে আমার নামটাই তো বলিনি। শোনো, আমার নাম ছিল পরিমল চাটুজ্জে। আমি কখন রাগ করতাম, কেন রাগ করতাম তা স্কুলের পাজিগুলোকে কখনো বুঝতে দিইনি। তারপর সেই অশরীরী টেবিল স্পর্শ না করেই টকা টক তাল দিয়ে ছন্দ করে বলতে লাগলো - 
 
আমার ছিল - 
গুরুগম্ভীর, থমথমে, রাশভারী..
হট্টগোলে মিটিমিটি হাসি মাখা মুখ
তাই দেখে ছেলের দলে তৈরি হলো
হতাশা মাখা একটা ভয় ভয় স্রোত।
ওরা - 
যা যা ভালোবাসে, সবেতেই ছি ছি
গেল গেল - সবেতেই না
মুখ শুকিয়ে আমসি হলেও
ঠিক করেছি ,
বাহাদুরি ফলাতে দেবো না - না - না।
ওদের
সন্ধি বিচ্ছেদ, কান্নাকাটি জলভাত হলো
কি বিপদ! মাঝে মাঝে মনে হত
ডাক ছেড়ে কাঁদি.................

মাঝপথে অনিক বাবু বলে ওঠেন, ধুর মশাই এটা কি! গল্প বলতে গিয়ে কবিতা শুরু করে দিলেন কেন?   

ছায়ামূর্তির ছন্দ কেটে যায়। সে বেশ অভিমান করে বলে - কেন তোমার ভালো লাগলো না বুঝি?

অনিক বাবু বলেন - একেবারেই নয়। এটা আবার কবিতা নাকি?

ছায়ামূর্তি বেশ রেগে গিয়ে জোর গলায় বলে -তা নয়তো কি হলো? তুমি কটা কবিতা লিখেছো শুনি! 

হঠাৎ করে অনিক বাবুর ঘরের টেবিলের বই খাতা গুলো ভাসতে লাগলো আর দেওয়াল ঘড়িটা পড়ে চৌচির হয়ে গেল। অনিক বাবু বুঝতে পারলেন যে তিনি ছায়ামূর্তির কবিতা লেখায় সন্দেহ করে ঠিক কাজ করেন নি। 
তাড়াতাড়ি পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি বললেন, তারপর কি হল বলুন? যাই হোক না কেন মনে হচ্ছে স্কুল বেশ ভালো চলছিল পরের দিকে।

একটু ঠাণ্ডা হলো ছায়ামূর্তি। বললো - হ্যাঁ, বাগে এসেছিল ছেলেগুলো শুধু বিল্টু বাদে। কিন্তু নতুন করে ঝামেলার সূত্রপাত ঘটালো এই কবিতা...আমার একমাত্র ভালোবাসার জিনিস। 

অনিক বাবু তাকিয়ে দেখলেন ছায়ামূর্তির চোখ দুটো কটমট করে উঠলো যেন, নাকি কেমন একটা কান্না কান্না ভাব। ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না এদিকে খিদেও পেয়েছে। সেই কাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি। কি আর করা যাবে? এখন কিছু বলতে যাওয়া মানেই সমূহ বিপদ।
ছায়ামূর্তি আবার বলতে শুরু করলো, আমার মাঝে মাঝে শোকে চোখে জল চলে আসে জানো। মনে হয় কিছুই  এখনো লিখে উঠতে পারলাম না। কবিতা আমায় কোনোদিন ক্ষমা করবে না। ছেলেগুলো না পড়ে ছুটোছুটি করতো তবুও বকাঝকার সময় আমি ঠোঁটের কোনে হাসি রাখতাম আর শেষকালে এই ছেলেগুলোর জন্য আমি কবিতার বই বের না করেই পটল তুললাম।

আর ধৈর্য্য রাখতে না পেরে অনিক বাবু বললেন - কি হয়েছিল একটু তাড়াতাড়ি বলবেন কি? অনেকক্ষন ধরে একই কথা বলে চলেছেন। 

এবার ছায়ামূর্তি বললো,
- আর কি যা হয়েছিল তা শুনলে তোমার আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হয়ে যাবে। বিল্টুকে যখন কোনোভাবে শায়েস্তা করতে পারছি না তখন একটা প্ল্যান করি। আমি তো খুব ভালো কবিতা লিখতে পারতাম  তো (অনিক বাবু মনে মনে হাসেন) তাই বিল্টুকে প্রস্তাব দিলাম কবিতা লেখার প্রতিযোগিতার। যে জিতবে তার কথা মানতে হবে এই ছিল শর্ত। আমি তো মশাই ঠিক জানতাম যে আমিই জিতবো। কিন্তু সব মিছে হয়ে গেল যখন বিল্টু জিতলো আর বিল্টুর কথা অনুযায়ী আমার কবিতা লেখা বন্ধ হয়ে গেল। তারপর একদিন চাকরি করতে করতেই কঠিন অসুখে মরে গেলাম। কিন্তু আফসোস রয়ে গেল আমার।
অনিক বাবুর নিজের কথা মনে হলো, মায়া লাগলো ছায়ামূর্তির ওপর। আস্তে করে জিজ্ঞেস করলেন - কেন কি লিখেছিল সে!

-সে যা লিখেছিল তা শুনে তুমি কি করবে হে ? তার চেয়ে আমার একটা কথা রাখো তাহলে আমি শান্তি পাই। 

অনিক বাবু আগ্রহের সাথে ছায়ামূর্তির ইচ্ছের কথা জানতে চান।

ছায়ামূর্তি বলে - আমি তো আর লিখতে পারবো না তাই আমি বলি আর তুমি লেখো। মরেই যখন গেছি তখন আর বিল্টুর শর্ত মানব না।

অনিক বাবুর বেশ মজা লাগে। মন্দ হবে না! বই এর বেশ নাম হবে 'অশরীরীর কবিতা'...বেশ নতুনত্ব! আর তাছাড়া এই ছায়ামূর্তিকে রাগিয়ে কোনো লাভ নেই তার চেয়ে তার বানানো ছড়া লেখা ভালো। শুভস্য শীঘ্রম ... বসে পড়লেন খাতা কলম নিয়ে। ছায়ামূর্তি বলে চললো আর অনিক বাবু লিখতে থাকলেন....

অঙ্কভীতি, মঞ্চভীতি থেকে দূরে থাক
এক লাফে গাছে চড়া, ফুটবলে গোল করা
বকাঝকা শিকেয় তুলে রাখ।।
ভিতরেতে নেই কিছু, মগজেতে গোবর
আছে শুধু- 
লাফালাফি, হুটোপুটির ছোটো ছেলের দল।।

অনিক বাবু ছায়ামূর্তিকে বলেন, আচ্ছা আপনার বিল্টুর ওপর খুব রাগ আছে ঠিকই কিন্তু তার জন্য সব ছেলেগুলোকে এমন করে গালি দেওয়া কি ঠিক হচ্ছে? 

- তুমি জানোনা ওরা কি ধাতুতে তৈরি। ভাবলে আমার এখনও বুক ধুকপুক করে, হাঁটু কাঁপে। তবে হ্যাঁ, ওরা আমার অনেক গোপন নাম দিয়েছিল। ওই স্কুলে আমার কয়েকটা গুপ্তচর ছিল, তারা আমায় খবর দিত। হো হো করে হেসে উঠলো ছায়ামূর্তি। শোনো নামগুলো বলি তোমায়.. হিটলার স্যার, একবার আমি স্পোর্টস ডে তে পড়ে গিয়েছিলাম তখন ডাকত বেঁকা স্যার। আর সেই বার, যেবার আমি ভালো আবৃত্তি করেছিলাম স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সেবার কে যেন অডিয়েন্স থেকে ফিসফিস করে বলেছিল জিরো থেকে হিরো স্যার.... আমার গুপ্তচর শুনতে পেয়ে আমায় বলেছিল। ভুতের হাসি যে এত সুন্দর হয় তা জানতেন না আমাদের অনিক বাবু....

অনিক বাবু গল্প শেষ করার পর আজও আমি বোকা হয়ে বসে থাকি অফিসে, টু শব্দটি করি না। খালি ঠাকুর ডাকি, দেখো ঈশ্বর আমার যেন কোনোদিন কবি হওয়ার সাধ না জন্মায়। 
এরপর বেশ অনেকদিন কেটে গেছে রাতের বেলা যদি অনিক বাবুর ঘরের জানলা দিয়ে তাকাও তাহলে দেখতে পাবে ঘরের এক কোণে অন্ধকার আর এক কোণে টেবিলের  ছোট্ট আলোয় অনিক বাবু লিখছেন। ছায়া আর মানুষের জুটিতে পাতার পর পাতা নীল অথবা কালো অক্ষরে ভরে উঠেছে যা কখনো অর্থপূর্ণ কখনোবা হিজিবিজি। তবু দুটি ভিন্ন জগতের বাসিন্দা আজ বন্ধু। তবে অনিক বাবুর একটা হিল্লে হলেও আমি এখনো একা। যদি এ জগতের বাসিন্দা হন তাহলে আমন্ত্রণ আমার বন্ধু হওয়ার জন্য, তবে যদি..... তাহলে দূর থেকে নমস্কার।।











 

Wednesday, December 23, 2020

এ এক অন্য রাতের কাহিনী.....নীলাঞ্জনা সরকার

                 

               

                                     

আমাদের রোজের জীবনে অভিজ্ঞতা হতেই থাকে কিন্তু কিছু হয়তো মনে রয়ে যায়, প্রভাব হয় সুদূপ্রসারী। তবু আমরা না থেমে এগোতে থাকি সবরকমের স্পর্শকাতরতা নিয়ে। এমনি কিছু ঘটনা আজও মনে করিয়ে দেয় আমার ছেলেমানুষীর দিনগুলিকে। নিজের মনের ভিতরে চলতে থাকা চরিত্রগুলো কিভাবে কখনো কখনো বাস্তবে প্রভাব বিস্তার করে আমার এই গল্পে তারই কিছুটা প্রভাব পাওয়া যাবে।।
আজ আমি মুম্বাই প্রবাসী। কিন্তু বিয়ের আগে ছিলাম কলকাতায়। কলেজ জীবনের একটি অভিজ্ঞতা আমি আজও ভুলতে পারিনি। আমার প্রিয় বান্ধবী ছিল মিলি। সে থাকতো গোবরডাঙ্গা আর আমি দমদম, পড়তাম দমদমের একটি লেডিস কলেজে। আমরা দুজন এতটাই বন্ধু ছিলাম যে একে অপরের সবকিছু বোধহয় না বলতেই বুঝে নিতাম। মিলি প্রায় আবদার করতো একদিন ওর বাড়ি গিয়ে রাত কাটাবার জন্য। অবশেষে মা বাবার সম্মতিতে সেই দিনটি এলো। ঠিক হলো কলেজ ফেরত আমি ওর বাড়ি চলে যাবো। এমনিতে আমার বাড়ি স্টেশনের কাছেই বলে আমি রোজ মিলিকে ট্রেনে তুলে দিয়ে বাড়ি ফিরতাম কিন্তু সেদিন আমরা দমদম থেকে ট্রেনে উঠেছিলাম দুজনেই আর ট্রেনে জানলার ঠিক পাশের সিটটাই পেয়েছিল মিলি, তার মুখোমুখি অন্য সিটে বসেছিলাম আমি। বহুবার ট্রেনের বাইরে থেকে খেয়াল করে দেখেছি কলেজ থেকে ফেরার সময় লেডিস কম্পার্টমেন্টে উঠেই মিলি আগে খুঁজতো তার প্রিয় জায়গাটি, না পেলে অন্য সিটে বসতো ঠিকই কিন্তু যদি পেতো তাহলে সে খুব আনন্দিত হতো। যাইহোক সেদিন চুলটাকে একটু উঁচু করে ক্লিপ দিয়ে আটকে চোখ বন্ধ করে হাওয়া খেতে খেতে আরামে বাড়ির দিকে এগিয়ে চলে মিলি সাথে আমিও। দমদম থেকে উঠে সেই গোবরডাঙ্গা পর্যন্ত এক লম্বা পথ। তখন আমরা কলেজে দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী , এই এক বছরের রোজ ট্রেন সফরে বেশ কিছু বন্ধু হয়েছিল মিলির.... সমবয়সী এবং অসমবয়সী উভয়ই। সামনেই পুজো তাই অনেকেই পুজোর বাজার সেরে ফিরছিল বলে ট্রেনে বেশ ভিড়। বর্ষাকাল চলে গেলেও সেবার পুজো অবধি বৃষ্টি থাকবে বলেই মনে হচ্ছিল। সেদিনও আকাশে বেশ মেঘ তাই সন্ধ্যে নামার আগেই চারিদিকে অন্ধকার, এর মধ্যে ট্রেনের কামরায় লাইট জ্বলে উঠলো। মিলি ভালোই ছিল, বাইরের আলো আঁধারিতে আকাশে মেঘের খেলা দেখতে দেখতে শিরশিরে হাওয়া উপভোগ করছিল সে কিন্তু কামরা আলোময় হয়ে যাওয়ায় সেই আনন্দ মাটি হলো তার। রোজের হকারগুলোও ইমিটেশন গয়না বেচতে ব্যস্ত ছিল। মাঝে মাঝে নিজের হাতখরচ দিয়ে স্টাইলিশ কানের দুল কিনতো আর আমায় গিফ্ট করতো মিলি কিন্তু সেদিন কিছু ইচ্ছে করছিল না আমাদের। মধ্যমগ্রাম স্টেশন থেকে যেই ট্রেন চলা শুরু করেছিল অমনি ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি। ততক্ষণে সন্ধ্যে হয়ে গিয়েছিল আর বৃষ্টির জন্য  জানলা বন্ধ করেছিল মিলি। এমন সময় দরজার কাছে বেশ হইচই...সবাই উঁকি মারছে দেখে পরিচিত একজনকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, কি হয়েছে?
মহিলাটি বলেন - দুটি ছেলে উঠে পড়েছে মহিলা কামরায়।
ভিড় থেকে একটা আওয়াজ এসেছিল - আহা, ছেড়ে দাও। কচি ছেলে! বোধহয় বৃষ্টিতে ভুল করেছে।
যাইহোক সত্যিই তাদের আর কিছু বলা হয় না। তারা নিজেরাই বলেছিল যে পরের স্টেশনে নেমে যাবে। বাইরে তুমুল বৃষ্টি। এমন সময় একটু পরেই ট্রেন গেল থেমে। কামরায় রব উঠলো - এই রে, যা বৃষ্টি! ট্রেন বোধকরি আর চলবে না। 
কেউ বললেন - ধুর ধুর, লাইনগুলোর কোনো মেইনটেনেন্স নেই। যা নোংরা! এইসব পরিস্থিতির কোনো উন্নতি হওয়া খুব মুশকিল।
তার উত্তরে এক অতি আধুনিকা বলে উঠেছিলেন - কেন এমন বললেন? আপনাদের মত মানুষদের জন্যই  উন্নতি হবে না, বুঝলেন! হঠাৎ ট্রেন থেমে গেলে তার সাথে মেইনটেনেন্স এর কি সম্পর্ক?
আগের মহিলা খুব রেগে গিয়েছিলেন সেদিন। পাশের সহযাত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন - দেখেছেন, আমাকে কেমন করে বললো! আমি কিন্তু এর শেষ দেখে ছাড়বো। 
তাকে শান্ত করেছিল আর একজন। আরে দিদি, আপনি থামুন। একজনকে তো চুপ করতে হবে বলুন....
অন্যদিকে একটি খুব ছোট বাচ্চার কান্নার শব্দ আর তাকে থামাতে তার মায়ের মন ভুলানো কথা। মিলি বসে বসে ক্লান্ত হয়ে আমায় ইশারা করে উঠে দাঁড়িয়ে এদিক ওদিক সেই বাচ্চা আর তার মাকে খুঁজতে লেগেছিল, যদি দেখতে পায় তাহলে নিজের বসার জায়গাটি তাদের দেবে। কিন্তু এত ভিড়ে তাদের খুঁজে পাওয়ার কোনো সম্ভাবনা না দেখে একদম সামনের সহযাত্রীকে বসার সিটটা দিয়ে সে বেরিয়ে আসে দরজার দিকে আর তার পিছন পিছন আমিও।
          দরজার এক কোণে ছেলেদুটি মুখোমুখি দাঁড়িয়ে ছিল। আমরা দুজনেই একটু আশ্চর্য হই তাদের দেখে! দুজনেরই বেশ অল্প বয়স অনেকটা আমাদের মতই। একজনের কোমরের দিকে চোখ যায় মিলির, ছেলেটির শার্টটা একটু ছোট হওয়া়য় কোমরে বেঁধে রাখা একটা বাঁশি দেখতে পায় সে। বেশ কৌতূহল হয় আমাদের। চারপাশে বেশ আওয়াজ বলে মিলি ছেলেদুটিকে একটু জোর গলায় ডেকে বলেছিল - এই যে, শুনছো? 
ছেলেদুটি তাকালে সে আরও বলে, একটু ভিতরে ঢুকে এসে দাঁড়াও। বৃষ্টিতে ভিজে কি অবস্থা তোমাদের! 
ছেলেদুটি কি নিষ্পাপ হাসে, বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়েই বুঝেছিলাম মায়া হচ্ছে মিলির। সে জিজ্ঞেস করেছিল ওরা বাঁশি বাজায় কিনা! ওরা মাথা নাড়লে ওদের বাজাতেও বলেছিল কিন্তু ওরা ইতস্তত করছে দেখে পাশের এক মহিলাকে আমি বলি -কাকিমা, বাঁশি শুনবে নাকি! কখন ট্রেন চালু হবে কে জানে? বাইরের বৃষ্টিও নেচে উঠবে বাঁশির আওয়াজে। সেই কাকিমা খুব হাসতে শুরু করেছিল আমার কথা শুনে। আশপাশে অনেকেই। মিলিও হাসতে শুরু করে। এর মাঝেই আর একজন বলে উঠেছিল -  হয়ে যাক তাহলে। রাত তো হয়েই গেছে আজ বরং ট্রেনেই পার্টি হোক। 
 এরপর ছেলেদুটি একটু ভরসা পায় ... ওদের কামরার মাঝখানে আসার জন্য ভিড় নিজে থেকেই সরে গিয়ে জায়গা করে দেয়। এরমধ্যে সেই অতি আধুনিকা বলে ওঠে - তোমাদের নাম কি ভাই? 
আমি ছোটন আর ও বিশু.... বাঁশি বের করে হেসে বলে ছেলেদুটির একজন। বিশু ততক্ষণে জল চাইলো একজনের কাছে। সে একটা স্টিলের বোতল দিলে আলগোছে গলায় দু তিন ঢোক জল ঢাললো   বিশু। বোধহয় খুব তেষ্টা পেয়েছিল। মিলি ঘড়ি দেখে আটটা বেজে গেছে, আজ মনে হয় না ট্রেন চালু হবে বলে। বাইরে সেই থেকে অঝোর ধারায় বৃষ্টি। ছোটনের বাঁশি শুরু হলে কামরার কোলাহল ধীরে ধীরে কমে আসে। আটকে পরা হকারগুলো ততক্ষণে দুদিকের দরজার পাশে বসে পড়ে ঝিমোচ্ছিল। কি সুন্দর বাঁশি বাজায় ছোটন, ওকে দেখলে বোঝা যায়না। ট্রেনের এক যাত্রী এর মধ্যে বিশুকে জিজ্ঞেস করলো যে সে কি করে? বিশু বললো সে কিছু পারে না, সে শুধু ছোটনের বন্ধু। এই কথাটা খুব মনে বিঁধলো মিলির। "শুধু বন্ধু".... কি মিষ্টি দুটো শব্দ, আমার দিকে তাকিয়ে সে বলেছিল, দেখ এই বন্ধুত্বের জন্য ভিজে সপসপে হয়ে দুজনে এত রাতে ট্রেনের কামরায় বন্দী মানুষগুলোর মন ভোলাচ্ছে। মুগ্ধ হয়েছিল সেদিন সবাই... ছোটনের বাঁশিতে একের পর এক সুরের লহর উঠছে, কখনো কীর্তনের সুর কখনোবা ভাটিয়ালি আবার মাঝে একবার এলো টাইটানিক সিনেমার সেই বিখ্যাত গান। হাততালিতে ভরে যাচ্ছে কামরা। মিলি আর আমি মনে মনে খুব খুশি, একটু সময় তো কাটছে। দুজনেরই বাড়িতে খুব চিন্তা করছে নিশ্চয়ই কিন্তু কিছু করার নেই।
     সকলে যখন বিভোর তখন বাইরে কি ভীষণ বৃষ্টির সাথে ঝড়! ট্রেন একজায়গায় দাঁড়িয়ে থাকলেও দুলে দুলে উঠছিল, মনে হচ্ছিল এই বুঝি উল্টে যাবে। হঠাৎ হাসির আওয়াজ..... এবং কে যেন খুব গুরুগম্ভীর গলায় বলে উঠেছিল, কি মাসিমা! হাতের চুড়িগুলো কি সোনার? চমকে সেদিকে দেখি আমরা। বিকালের হকারগুলোর মধ্যে দুজনকে দেখে চোখ কপালে উঠেছিল সেদিন, একজন পেয়ারা বিক্রি করছিল আর একজন ইমিটেশন গয়না। তাদের হাতে পিস্তল! আরও চমক লাগে যখন বিশু কোমর থেকে ছুরি বের করে! 
হে, ভগবান! ট্রেনে ডাকাত পড়লো যে। 
যে মাসিমার হাতের চুড়ির ওপর ডাকাতগুলোর সবার আগে নজর গেছিলো সে তো হাউহাউ করে কাঁদতে শুরু করেছিল প্রথমেই। আর তাতে খুব বিরক্ত হলো ছোটন। সে বাঁশি থামিয়ে সোজা গিয়ে সপাটে ওই লম্বা বাঁশি দিয়ে তার পিঠে মারে। মিলি অবাক, আমায় বলে - এমনও হয় বুঝি, এত মিষ্টি বাঁশিওয়ালার এই রূপ না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না যে এই জগতের কানায় কানায় কত কদর্যতা। কামরার সেদিনকার নিস্তব্ধতার তুলনা শুধু রাতের কবরখানার সাথেই চলে। কারোর মুখে কোনো কথা ছিল না, ভয়ে সিটিয়ে গিয়েছিল সবাই। ওই মাসিমা সব গয়না খুলে দিয়েছে ততক্ষণে! ছোটন আর সেই পেয়ারাওয়ালা সোনার গয়না খুলে নিতে ব্যস্ত ছিল আর কেউ প্রাণের ভয়ে কিচ্ছুটি বলছিল না। মিলি আমাকে ফিসফিস করে বলে এরা কি করে সোনা চিনছে বলতো ? আমি তাকে ততোধিক আস্তে বলেছিলাম মনে হচ্ছে বহুদিন এ লাইনে আছে। আমরা যেদিকে দাঁড়িয়ে ছিলাম সেই পর্যন্ত তখনও এসে পৌঁছায়নি ডাকাতের দল। আমার চোখ যতবার ছোটনের দিকে গিয়েছিল ততবার মনে হয়েছিল সব মিথ্যে। কিন্তু সব ভাবনা নিমেষে তছনছ হয়ে গিয়েছিল বারে বারে ডাকাতগুলোর চিৎকারে। আমি মিলিকে বলেছিলাম কারোর কাছে কি ফোন আছে তাহলে হেল্প চাওয়া যেত। ভাবতে না ভাবতেই একটা ফোনের রিংটোন বাজতে লাগলো। যদিও ভিড়ের মধ্যে বোঝা গেল না কার ফোন তবু ছোটন চেঁচিয়ে বাকিদের বলেছিল - সব শালাদের কাছ থেকে ফোন কেড়ে নাও সবার আগে। 
বিশু জিভ কেটে হাসলো তখন, তাইতো! মস্ত ভুল হয়ে গেছে। এরপর চারজন বিভিন্ন দিক থেকে পিস্তল আর ছুরি দেখিয়ে টাকা গয়নার সাথে ফোনও জমা করতে থাকে। এদিকে মিলি আন্দাজ করে যে ওদের নামগুলো নিশ্চয়ই আসল নয়, সে মনে সাহস এনে বলে এভাবে চুপ করে থাকলে চলবে না। কামরায় এতগুলো লোক আর ডাকাত মাত্র চারটে তাই কিছু একটা করতেই হবে.... গুটি গুটি পায়ে সামনে এগোবার চেষ্টা করে মিলি। বন্ধুর এমন রূপ আগে দেখিনি ওকে থামাতে যাই কিন্তু ও এগিয়ে যায় আর আমি ভয়ে ওর পিছনে থেকে যাই। তখন মনে হয়েছিল সময় যেন থমকে গেছে আর একটু আগের এত হইচই করা মানুষগুলোকে যেন কোনো অশুভ শক্তি এসে সেই ছোটবেলার স্ট্যাচু খেলায় মত্ত করেছে। 
        হঠাৎ বাইরে জোরে বিদ্যুৎ চমকালো, আর বোধহয় বিশুর মনের মধ্যেও। ছোটনকে ডেকে সে বলেছিল, কি রে আর কতক্ষণ এই সর্বনাশা বৃষ্টি চলবে? এরপর আমরা ফেঁসে যাবো তো। লাইন পুরো জলে ভেসে গেছে নিশ্চয়ই! ছোটনের মুখ দেখে আন্দাজ হয়েছিল তার মনেও যে সে চিন্তা নেই তা নয়। সে তাদের আরও দুজন সঙ্গীকে বললো শোনো যা হয়েছে চলো তাই নিয়ে কেটে পড়ি। 
ছোটন.... মিলি ডাক দিল মোক্ষম সময়ে। কখন যে সে তাদের খুব কাছাকাছি এসে গিয়েছিল তা বুঝতে পারেনি ডাকাতের দল। ছোটন মিলির দিকে ঘুরতেই চট করে ওর হাতের বাঁশিটা নিয়ে নেয় সে। ছোটন বলে ওঠে - নাআআআ। ভালো হবে না বলে দিচ্ছি। শিগগির ফেরত দাও। ওটা আমার খুব প্রিয় জিনিস।
কেন? বাঁশি তোমার কোন কাজে লাগবে ছোটন! তোমার পছন্দের অন্য এক ধারালো জিনিস তো তোমার হাতেই।
ছোটন সাথে সাথে উত্তর দেয়, তুমি কি বুঝবে কোনটা আমার পছন্দের আর কোনটা আমি পেটের জ্বালায় করি?
তবুও.... মিলির ঘৃণা ভরা চোখের দিকে সোজা তাকাতে পারেনি ছোটন। বরং আরো রেগে গিয়ে তেড়ে এসেছিল ওর দিকে। লম্বা চুলের মুঠি ধরে হিড়হিড় করে ভিড়ের মধ্যে থেকে বের করে নিয়ে গিয়েছিল ট্রেনের দরজার সামনে। কলেজের ব্যাগ পড়ে যায় মাটিতে, গায়ের ওড়না লুটোপুটি খায় মিলির, তবু হাত থেকে বাঁশি ছাড়েনা সে। শক্ত করে ধরে থাকে ওই ডাকাতিয়া বাঁশিকে। বাঁশির মালিক ছাড়াতে চাইলেও পারে না। কামরায় মিলিকে নিয়ে গুঞ্জন শুরু হয় আর আমি মনে মনে ভাবি এ যাত্রা যেন ঠাকুর রক্ষা করেন সবাইকে। ডাকাতগুলো মিলিকে হুমকি দেয় ট্রেন থেকে ফেলে দেওয়ার, কিন্তু তার মনে একটাই প্রশ্ন ছিল যে, যার সামান্য স্পর্শে এত মায়াবী সুরের সৃষ্টি হয় তার ভিতরটা এত শূন্য কেন? ততক্ষণে মিলির সাথে গলা মেলায় আরও কিছু যাত্রী। একজন বলে ওঠেন, ছোটন তুই জানিসনা তোর মধ্যে কি গুন আছে! এ কাজ ছেড়ে দে।
কিন্তু ছোটন তাকে উল্টে জিজ্ঞেস করে - কেন বলুন তো? আপনি আমায় কাজ দেবেন! 
পাশে বিশু খ্যাকখ্যাক করে হেসে ওঠে আর ফিল্মি স্টাইলে বলে ওঠে - বেশি বকবক না করে সাথে যা মাল আছে দিয়ে দাও মাসী।
কিন্তু তার কথায় ব্যাঘাত পড়ে সেই ছোট বাচ্চাটার কান্নায়, বোধহয় সে ঘুমাচ্ছিল আর উঠে কাঁদতে শুরু করেছিল বলে মনে হয় আজ। এদিকে তখনও মিলিকে ঘাড় ধরে দাঁড় করিয়ে রেখেছিল পেয়ারাওয়ালাটা, বুঝতে পারছিলাম ব্যথায় শেষ হয়ে যাচ্ছিল সে। কি শক্ত হাতের বজ্র আঁটুনিতে আটকা পড়েছে আমার বন্ধু অথচ আমি কিচ্ছুটি করতে পারছিলাম না।
এদিকে হঠাৎ ছোটন কেমন যেন চুপ মেরে যায়। ওর ভাবনার মধ্যে ঘুরে এসে সেদিন বুঝেছিলাম ও যেন  সেই দিনগুলো আর ফিরে পেতে চায় না যেদিন ছিল দোরে দোরে ঘোরা, খালি হাতে রোজ রাতে বাড়ি ফেরা। আর এখন বোধহয় প্রতি রাতের পর ঘরে টাকা দিয়েও বন্ধুদের সাথে ফুর্তি করতে পারে ও। কিন্তু মিলি যে খুব কঠিন সত্য তুলে ধরেছে তার সামনে। সত্যিই তো তার জীবনের প্রয়োজনগুলোর কাছে তার বাঁশি, তার সুর সব ম্লান হয়ে গেছে। মনে হলো ঝাপসা হয়ে এসেছিল নিজের ভবিষ্যতটা ছোটনের সামনে। সে নিজেও জানত না এতগুলো জিজ্ঞাসু চোখের সামনে তার বীরত্ব কোথায় হারিয়ে গেল সেই রাতে! বিশু, তার প্রিয় বন্ধু এসে তাকে নাড়া দিলেও আর কিচ্ছুটি হলো না সেদিন, কারণ মিলি যে ছোটনের মনের গভীরে ঢুকে গিয়েছিল। সে বসে পড়ে হতাশ হয়ে, অবাক হয়ে মিলিকে ছেড়ে দিয়ে বাকিরাও তার কাছে চলে আসে কিন্তু ছোটন থলি উপুড় করে দেয়। সব জিনিসের সাথে একটা কয়েনও টক করে মাটিতে পড়ে আর লাট্টুর মত ঘুরতে থাকে। মনে আছে ওদের চোখ জ্বলজ্বল করে উঠেছিল সেদিন! মিলি বলেছিল - কি হলো! মনে পড়ছে তো স্কুলের সবুজ মাঠ.. কালো বোর্ড। ঠিক সেই সময়ে সামনে পড়ে থাকা একটা ফোন বেজে ওঠে। কিন্তু ধরার কেউ থাকে না, বাজতেই থাকে ফোনটা আর রিংটোনটা ঠিক যেন হুইসেলের মতো.. পুঁ উ উ উ। 
আমার ঘাড়ের কাছটাও কেমন যেন শক্ত হয়ে উঠছিল ক্রমশ। কোনরকমে ঘাড় সোজা করতে করতে শুনতে পেয়েছিলাম -
এই বাবাই আওয়াজ করো না। তোমাকে বাঁশি কিনে দেওয়াটাই ভুল হয়েছে আমার। 
চমকে তাকিয়ে দেখি ট্রেন চলছে বাইরে বৃষ্টির আওয়াজের সাথেই। পাশের সিটে বসা মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলে সে বলে - প্রায় দেড় ঘণ্টা ট্রেন দাঁড়িয়ে থেকে আবার চলতে শুরু করেছে। সামনে তাকিয়ে দেখি মিলি মিটিমিটি হাসছে। খুব লজ্জা পেয়ে গিয়েছিলাম সেদিন। সে বন্ধ জানলা খুলে  দিতেই আমি বাইরের অন্ধকারে তাকিয়ে স্বপ্নের বাঁশিটাকে খুঁজে পেতে চেয়েছিলাম  যে দুঃস্বপ্নেও সুর খুঁজে দিয়েছিল। মনে মনে আজও হাসি আর ভাবি - ভাগ্যিস সেদিন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম তাই বন্ধুর অমন বীরাঙ্গনা ভাবমূর্তি দেখতে পেয়েছিলাম যা আমায় আজও অনুপ্রাণিত করে।  তবু সেই রাতের বৃষ্টি সত্যিই এক ডাকাতিয়া মুহূর্ত এনে দিয়েছিল আমার স্বপ্নে যার রূপকার ছিল সেই বাঁশিওয়ালা।।
  

Tuesday, December 15, 2020

ক্ষত ......নীলাঞ্জনা সরকার


                        

         শক্তিরূপেন সংস্থিতা কথাটা হারিয়ে গেলো.......

আমি বোধহয় রূপের একটা নোংরা ডেলা-
তোমার চিঠিতে লেখা, অলেখার মাঝে
নিজেকে প্রত্যাখিত দেখে রোজ ভেঙ্গে পড়া।
কুৎসিত কালো আমি, সেতো ভ্রমরও কালো!
কাগজে পেন্সিলের কালো দাগে
তোমায় যখন ফুটিয়ে তুলেছিলাম
কালো আবছায়ার মতো,
তখন তো চুম্বন দিয়েছিলে আমার কপালে।
বলোনি তো কি অদ্ভুত.. কি বিশ্রী!
আমার গুনের খুব বড়াই করেছিলে-
বলোনি তো তোমার রূপ দেখে গা জ্বলে!
শিউরে উঠেছিলে কি!
আমার কালো হাতের কুঁচকানো চামড়ার স্পর্শে?
জানো, আমি খুব কেঁদেছিলাম সেদিন
খোঁজ রাখোনি বোধহয়-
যখন আমি জ্বলছিলাম খুব তোমায় চাইছিলাম
তোমার শরীরের শীতল স্পর্শ –
জানি তা আমার অধরা-
তবু কেরোসিনের গন্ধটা ভুলতে চাই যে
তোমার গায়ের আতরের গন্ধে,
আজ সেও আমার অজানা।
চিঠিতে তুমি ভুলেছো আমায়
কিন্তু আমার কাজল হরিণ চোখ, নুপুরের ধ্বনি
আগুন খেয়েছে বটে সব, তবে বেঁচে আছি আমি।
তোমার প্রিয়তমাকে বলেছ কি?
ভালোবাসতে তুমি আমায়, পোড়া দাগের আগে-
বুঝি, বলোনি বোধহয়-
আমি যে ছিলাম কালো তার সাথে আজ দাগী।
তোমার চিঠিতে পরিষ্কার–
আমার অনেক কিছু পাওনা ছিল তোমার কাছে
যা শুধু আমার –
সেই কালো, সেই বাজে, সেই অপরিষ্কার!
কি করবে বলো ! তবু আজ বেঁচে আছি আমি।।

     


প্রেম ডট কম... নীলাঞ্জনা সরকার

  একটুখানি খোলা আকাশ দেখার সৌভাগ্য যে কবে হবে! নির্মল দীর্ঘশ্বাস ফেলে...সব সুখ বিলীন হয়ে গেছে মৃন্ময়ীর সাথে। মনে আনাগোনা করে মৃন্ময়ীর সাথে...