মিনি গৃহিণী হওয়ার সাথে সাথে লিখতে ভালোবাসে। সকাল থেকে রাত গড়িয়ে যায় তার সংসার সামলাতে, আর মা হওয়ার পর থেকে তো কথাই নেই...সন্তান যাতে সত্যিকারের মানুষ হয়ে উঠতে পারে সেদিকে সে একনিষ্ঠ। এত ব্যস্ততার মধ্যেও নিয়ম করে কল্পনা তার মনের দরজা খুলে রোজ ডায়েরির পাতায় বাস্তব হয়ে ওঠে।
আজ শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক পুরস্কার পাওয়ার পর সাংবাদিক সম্মেলনে স্মিত হেসে মিনি বলে..."আমি সংসারের জন্য কতটা উৎসর্গীকৃত এর উত্তর এত বছরে দেওয়া হয়নি তার বদলে সময় পেলেই খাতা কলমকে বন্ধু করেছি"... মিনির জন্য ফুলের তোড়া হাতে অপেক্ষায় আজ বাড়ির সকলেই।
রাত বাড়লে সবাই শুয়ে পরে কিন্তু মিনির চোখে ঘুম আসেনা নিজের সাফল্যের পিছনের ইতিহাসটা মনে করে। অনেক খুঁজে পুরোনো এক পত্রিকা বের করে সে, তার লেখালিখি শুরু হওয়ার প্রথম দিকে প্রকাশিত ছিল সেটি। ধুলো ঝেড়ে আবার যেন নতুন করে দেখে তার প্রচ্ছদটি। খুব পছন্দ ছিল ধূসর কালো অ্যাবস্ট্রাক্ট ছবিটি তাই আজও সযত্নে বইটি সামলে রেখেছে মিনি। শিল্পী যেন তার সবটা দিয়ে এঁকেছিলেন! ছবিটির অর্থ অত বছর আগে খুব একটা বোঝেনি মিনি, তবে আজ বোঝে শিল্পীর অবহেলিত মনের কথা। ছবিটিতে এক অবয়ব তার সকল মনোবাঞ্ছা নিয়ে এক চিলতে রোদ বারান্দায় আকাশের সমস্তটা জুড়ে, সেখানে নেই কোনো পরিহাস, নেই কোনো ভুল বোঝাবুঝি.... আছে শুধু এক অনন্ত অপেক্ষা তার একান্ত নিজের প্রেমিক মনের জন্য।
পত্রিকা খুলে দেখে মিনি, বিষয় ছিল 'আত্মনির্ভরশীলতা'.....সকল লেখক লেখিকা নিজেদের মত করে বিষয়টি ফুটিয়ে তুলেছিলেন অবশ্যই, সাথে মিনিও। কিন্তু প্রচ্ছদ শিল্পী! সে কি করে সবার মনে অবগাহন করে এমন এক কাহিনী বানালেন রং তুলি দিয়ে.... অপূর্ব! আসলে একটা বই যতটা সাহিত্যিকের ঠিক ততটাই প্রচ্ছদ শিল্পীর, নাহলে কলমের ভাগিদার না হয়েও এমন ভাবে ভাবনার কল্পলোকে পাড়ি দিতে কজন পারে? মিনি নাম খুঁজে বের করে, পরিমল... কিন্তু পদবি ম্লান হয়ে গেছে পুরোনো গন্ধে! মিনি ঠিক করে ওনাকে খুঁজে বের করতেই হবে। ওই পত্রিকার সাথে যুক্ত মানুষগুলোর সাথে আজ আর তার যোগাযোগ নেই তবুও একটা শেষ চেষ্টা করে দেখবে সে, এই ভেবে সেদিন শুয়ে পড়ে মিনি।
সকালে বাড়ির সামনের ছোট বারান্দায় বসে চা খেতে খেতে মেয়েকে পত্রিকাটির নাম বলে মিনি, আরও বলে একটু ইন্টারনেট ঘেঁটে দেখতে সেটি এখনও প্রকাশিত হয় কিনা। আজকের যুগের মেয়ে একেবারে সিদ্ধহস্ত, কিছু পরেই সব খবর নিয়ে হাজির। মিনি সম্পাদক মহাশয়কে ফোন লাগায়.... ও পাশে অপরিচিত কণ্ঠস্বর, কিন্তু মিনি যে ততদিনে সবার খুব পরিচিত এবং প্রিয় লেখিকা হয়ে উঠেছে। তাই তার নাম শুনেই সম্পাদক বাবু বিনয়ের সাথে যোগাযোগের কারণ জিজ্ঞেস করলেন। সব জেনে মিনি রওনা দেয় এক অজানার উদ্দেশ্যে কারণ নাম ঠিকানা জোগাড় হলেও সেই প্রচ্ছদ শিল্পী আজও বেঁচে আছেন কিনা সে খবর পাওয়া যায়নি।
এক পুরোনো বাড়ির নিচে দাঁড়িয়ে মিনি, ডোরবেল বাজালে একটি বাচ্চা মেয়ে দরজা খোলে। নাম জিজ্ঞেস করে আশ্বস্ত হয় মিনি, শিল্পী মেয়েটির দাদু। ওপরে উঠে আসে লেখিকা। কিছু সময় পর এক বয়স্ক মহিলা আসেন মিনির সামনে। বলেন,
-এসো মা। কতদিন পর এ বাড়িতে ওনার জন্য কেউ এলো!
অন্য এক ঘরে মিনিকে নিয়ে এলেন তিনি। ইজিচেয়ারে বসে থাকা একজন আশি-ঊর্ধ্ব মানুষ বেশ মোটা চশমার ফাঁক দিয়ে দেখেন মিনিকে। মিনি বলে,
- আমায় আপনি চিনবেন না হয়তো। সে অনেককাল আগের কথা।
- চিনবো না কেনো? মনে করিয়ে দাও একটু ছবিটা, তাহলেই পারবো।
- ছবিটা! কোন ছবির কথা বলছেন?
- সেই ছবি যা তোমার মনে আমায় ধরে রাখতে পেরেছে।
মুগ্ধ হয় মিনি পরিমল বাবুর কথার তাৎপর্যে।
- আসলে অনেক কাল আগে আমার লেখা এক পত্রিকার প্রচ্ছদ করেছিলেন আপনি। তারপরেও আমি অনেক প্রচ্ছদ শিল্পীর সান্নিধ্যে এসেছি, সকলেই অনবদ্য। অনেকের সাথে পরবর্তীকালে আলাপও হয়েছে কিন্তু আপনি যেন হঠাৎ হারিয়ে গেলেন.....
- না তো! হারাই নি তো! তাহলে কি তুমি ছুটে আসতে আমার কাছে। আমি যত এঁকেছি তত কাছ থেকে লেখালিখিকে অনুভব করেছি। বই আর তার প্রচ্ছদ দুই যে অভিন্ন হৃদয়, একে অপরকে ছাড়া পরিচয়বিহীন।
- তাহলে হঠাৎ সব ছেড়ে দিলেন কেন? আপনার হাতে যে জাদু আছে তা আজকের প্রজন্মও মানবে। আপনি শুধু আবার কাজ শুরু করুন।
- তা যে আর কোনোদিন সম্ভব নয় মা। যে চোখ দিয়ে তোমাদের অনুভূতিগুলো স্পর্শ করে আঙুলের ছোঁয়ায় প্রাণ দিতাম সেটাই তো বিট্রে করেছে আমায়। অনেকদিন হলো ভালো দেখতে পাইনা। নার্ভ শুকিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। সামনেটা ঝাপসা হয়ে আসে বলে আমার কল্পনার চরিত্রগুলো এঁকেবেকে যায়... দিক ভ্রান্ত হয়।
মিনি কথা হারায়, বিমর্ষ হয়ে বলে..
- আপনার রঙ তুলির কল্পনারা যদি আমার পাশে থেকে আমায় অনুপ্রাণিত করত তাহলে হয়তো আরো জীবন্ত হয়ে উঠতো আমার চরিত্ররা।
ফিরে যাওয়ার আগে আজকের স্বনামধন্য লেখিকা পা স্পর্শ করে এক প্রচ্ছদ শিল্পীর.......

Bhison bhalo laglo
ReplyDeleteKhub khub sundor laghlo..
ReplyDeleteআত্মার বিনিময় না হলে শিল্প হয় না
ReplyDeleteআলাদাই একটা taste পাই তোমার লেখা পড়ে!
ReplyDeleteKhub sundor
ReplyDelete