Saturday, October 31, 2020

ইচ্ছে পাখি...... নীলাঞ্জনা সরকার

 

                                  

পড়ন্ত আলোয় ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল দীপশিখা। নিচে মিছিলের আওয়াজ,তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল,অপেক্ষারত সে- কবে সততার গানের সাথে পা মিলিয়ে চলবে জাতীয় পতাকা বুকে আঁকড়ে ধরে! ঝড় উঠলো বোধহয়,তবু মিছিল এগিয়ে চলেছে। একসময় সামনের গলির বাঁকে তা মিলিয়ে যায়, কিন্তু ক্ষীণ আওয়াজ ভেসে আসে এখনো কানে! এই তো সেদিনের কথা ঘরের সামনে দাদা লুটিয়ে পড়েছিল রক্তাক্ত হয়ে- দরজা খুলতেই তার চোখের সামনে দাদা চিরদিনের মতো চলে গিয়েছিল। কে গুলি করেছিল তা কেউ কোনোদিন আর খুঁজে দেখেনি, বলা যায় চেষ্টাই করেনি। শুধু সেইদিন থেকে সবকিছু অদৃষ্ট বলে মেনে নিয়েছে বাড়ির লোকজন। সন্ধ্যে হলো, শাঁখের আওয়াজ আসছে। ছাদের দরজা বন্ধ করে নীচে নেমে আসে দীপশিখা, মা তুলসী তলায় প্রদীপ জ্বালায় রোজ এই সময়। পুজো হয়ে গেলে নিভিয়ে দেয়। কিন্তু প্রদীপের আগুনের মতো মনের আগুন নেভে না বরং উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। দীপশিখা এখন কলেজে বাংলায় অনার্স নিয়ে পড়ছে। দেশের চারিদিকের যা অবস্থা পারলে বাড়ির লোক তার পড়াশোনা বন্ধ করে তাকে বাড়িতে বসিয়ে দেয়। দেশ স্বাধীন হলে কি হবে মানুষের চিন্তাধারা এখনো যে পরাধীন। প্রতিদিনের আন্দোলন আর রাজনৈতিক অরাজকতা তার জ্বলন্ত প্রমাণ। 
      ছাদে এতক্ষন কি করছিলিস দীপা? মায়ের গলায় উৎকণ্ঠা- তোর দাদা তো আর ফিরে আসবে না, তোকে যতদিন না শ্বশুরবাড়ী পাঠাচ্ছি ততদিন একটু শান্তি দে- এক নিঃশ্বাসে বলে যায় দীপশিখার মা। স্থির দৃষ্টিতে মাকে দেখে দীপশিখা, তার একটুও রাগ হয় না। সত্যি তো মায়ের মনের ওপর দিয়ে যা গেছে তা অবর্ণনীয়। সে নিজে, বাবা সবাই নিজের কিছু না কিছু নিয়ে ব্যস্ত কিন্তু মা সারাদিন সংসারের কাজ করে যখনই সময় পায় ওই দাদার ছবির সামনে বসে লুকিয়ে চোখের জল ফেলে। বাবা প্রায় বলে- "দীপা মা, তুই যখন মা হবি বুঝবি!" দীপা অনেক সাহসী হয়তো ছোট থেকে মাকে দেখে। দাদা সক্রিয় রাজনীতি করতো তখন মাকে দেখেছে দীপশিখা। সেসময় মায়ের সহযোগিতা ভোলার নয়। কত মিটিং হয়েছে বাড়িতে মা হাসিমুখে রান্নাঘর থেকে আওয়াজ দিত,বাবু ও বাবু- আর কতক্ষন সবাই খালিপেটে থাকবি আয় রে মুড়ি আর বেগুনি নিয়ে যা। দাদার বন্ধুরাও খুব শ্রদ্ধা করতো মাকে। সেই বাবুর রক্তে ভেসে যাওয়া নিথর দেহটা বুকে আঁকড়ে মা কেমন যেন হয়ে গেল, সেই আগের মাকে আর ফিরে পায় না দীপশিখা। মাঝে মাঝে খুব অবাক হয় সে, বাবুর অসমাপ্ত কাজে যোগদান করার জন্য সে যে নিজেকে তিলে তিলে গড়ে তুলেছে তা কি কারুর চোখে পড়ে না!
কলেজে দীপশিখা খুব চুপচাপ, চোখ -কান খোলা রাখে কিন্তু খুব একটা এগিয়ে যায় না সব ব্যাপারে। হয়তো বাড়ির পরিবেশটা মনে করে। তবে তার বাড়ির কথা কলেজের সবাই জানে বলে মাঝে মাঝেই তাকে ডেকে পাঠায় সেখানকার ছাত্র রাজনৈতিক দলের নেতা, তাকে অনুরোধ করে বার বার সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহনের জন্য। দীপশিখা ক্লান্ত না বলতে বলতে, মা-বাবার মুখটা ভেসে ওঠে তার চোখের সামনে। আজও ক্লাসরুমে বসে সে, ক্লাস নিচ্ছেন অজিতবাবু কিন্তু মনটা তার বাইরে পড়ে আছে। সামনেই কলেজের ভোট, জোরকদমে প্রস্তুতি চলছে- তার ছুটে যেতে ইচ্ছে করছে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার জন্য মনটা ছটপট করছে।
 
  বীরত্ব সেখানে-
  যেখানে রক্ত কুন্ঠিত নয় ভেসে যেতে,
  পরাজয় নিমিত্ত,পরাজিত যেখানে পিপাসার্ত।
  অন্ধকারেই আলোর প্রকাশ-
  দুর্বলতা আসলে বিষ-
  আত্মসমর্পণ নিজের কাছে সবচেয়ে বিস্ময়,
  নীলকণ্ঠ হওয়া সবচেয়ে দামি।।

দাদার এই কথাগুলো কানে বাজে দীপশিখার। দাদার কাছে যখন তার কাজের ফিরিস্তি চাইতো তার আদরের বোন তখন এইরকম কত কাব্য করতো তার দাদা। দীপশিখার চোখ ছলছল করে ওঠে। মনটা চিৎকার করে বলতে চায়- কে গো এমন করলে! না মেরে জিততে পারলে না? এত কাপুরুষ এত দুর্বল তোমরা! আজ একটা সিদ্ধান্ত নেয় সে। শুধু মা বাবার কথা ভাবলে হবেনা। অসময় তার দাদা চলে গেলেও সে বেঁচে আছে .....দাদার স্বপ্নের নীলকন্ঠ হবে সে। দাদার স্মৃতি বুকে আঁকড়ে নয় তার আত্মমর্যাদার সন্মান দিতে এগিয়ে যাবে সে.....সত্যিকারের দীপশিখা হয়ে জ্বলে উঠবে। বাড়ি ফেরার পথে বিকালে আলী চাচার সঙ্গে দেখা, তার চা এর দোকান। খদ্দের নেই দেখে দীপশিখা আসে তার কাছে, বড় ভালোবাসে এই চাচা তাকে। দীপশিখা বুড়ো হতে দেখলো চাচাকে। চা খাবি মা- বোস একটু আমার কাছে। আজকাল পড়া নিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছিস বুঝি! আমার ছেলেটা শুকনো ভালোবাসার খপ্পরে পরলো বোধকরি! মাঝে মাঝে বাড়ি ফেরেনা। সেদিন পুলিশ এসেছিল রে, পাড়াতে দাঙ্গা হতে পারে মা, সাবধানে থাকিস। কথাগুলো শুনে দীপশিখার বুকের মধ্যে উথালপাথাল হতে লাগলো - শেষ যেদিন দাদাকে দেখলাম সেদিনও দাঙ্গা হয়েছিল! দাঙ্গা অর্থে যা হয় সেদিন তো সেসব কিছুই হয়নি, শুধু তার বাড়ির সব সুখ শান্তি চলে গেছিলো দাঙ্গার দোহাই দিয়ে - যাতে আর কেউ রক্তবন্যার ভয়ে তদন্তের নাম না মুখে আনে। আবার কার পালা! দীপশিখা বাড়ি ঢোকে। ঢুকেই দেখে দাদার দুই বন্ধু তার জন্য অপেক্ষা করছে। 
দীপা, আমরা বনগার কিছু গ্রামে লেখাপড়া শেখানোর জন্য ছোট ছোট দল বানাচ্ছি - ছুটির দিনে মাত্র দু ঘন্টা ক্লাস নিতে হবে। তোকে আমাদের চাই। তুই না করিস না, আমরা অনেক আশা নিয়ে এসেছি। সহজে কেউ রাজি হতে চায় না রে, কোনো অর্থপ্রাপ্তির সুযোগ নেই তো তাই। কিন্তু কত মানুষ শুধু পড়তে লিখতে জানেনা বলে অবাঞ্ছিত বঞ্চনার স্বীকার হচ্ছে।
দীপশিখা মনে মনে চঞ্চল হয়ে ওঠে, এমন সুযোগ সে কিছুতেই হাতছাড়া করবে না। সে বলে ওঠে, নিশ্চয় মলয়দা। আমি যাব - মানুষের জন্য কিছু করতে পারব এটা কি কম কথা নাকি! 
-খুব খুশি হলাম রে, সুজন বলে ওঠে..বিপ্লব মারা যাওয়ার পর এবাড়িতে খুব একটা আসি না। মাসিমাকে কি করে মুখ দেখাবো সেই লজ্জায়, আমাদের বন্ধুকে তো আমরা বাঁচিয়ে রাখতে পারিনি। এ কম যন্ত্রণার নয়। ওর মুখটা তবে এখনও বুকের মধ্যে জ্বলজ্বল হয়ে আছে।

বিপ্লব, তুমি জাগ্রত যেমন আমার বুকে-
আমার অস্থিমজ্জা, রক্তসজ্জা আজ লেলিহান শিখা প্রবহমান প্রলয় ঝড় তেমনি আমার বিবেক জুড়ে।
বিপ্লব, চলে গেলে ওই সুদূরে- 
আলোকগোলায় বিলিয়মান হলে,
এই ধরাতলে রয়ে গেলাম আমি -
তোমার প্রতিচ্ছবি হয়ে।

বাসের জানলার ধারের সিটে বসেছিল দীপশিখা। আজ প্রথম যাচ্ছে সে দাদার অনেক অসমাপ্ত কাজের সূত্র ধরতে। বাবা শেষপর্যন্ত মাকে রাজি করিয়েছিল। এই কদিনে অনেক কিছু ঘটে গেছে।
দীপশিখা যা ভেবেছিল তাই হয়েছে আলী চাচার ছেলের লাশটা তাদের দোকানের সামনে কারা যেন এসে ফেলে দিয়ে গিয়েছিল! চাচার আর্তনাদে তার বুক ফাটলেও সমাজের বুক ফাটেনি। অনেক সান্ত্বনা বাক্য শুনে শুনে আলী চাচা চুপ হয়ে গেছিল। আশপাশের পাথরগুলো তবু বোঝেনি, ওরে এগুলো দাঙ্গা নয় - এগুলো মানবতার শরসজ্জা। টপ করে জলের ফোঁটা পড়ে চোখ থেকে - চমকে যায় দীপশিখা! একি জল কেন? দীপশিখা ভাবে, আচ্ছা মানুষ কিসে খুশি হয়- আপনার জন সুখী হলে নাকি দুঃখে থাকলে? আসলে তো চারপাশটা নগ্ন, ভালোথাকার লড়াইতে ব্যস্ত। 
সুজনদা ডাক দেয়- ওরে সবাই নাম রে, কোমর বেঁধে শুরু করি। বাসের সবাই হেসে ওঠে, কি আনন্দ কি নিরাপত্তার হাসি। মুগ্ধ হয় দীপশিখা, বাস থেকে নামে - এগিয়ে চলে নবজীবনের পথে। চারপাশে নোংরা জামা পরে কত পরিষ্কার মনের মানুষ, নিষ্পাপ শিশুর দল। কে একজন বলে ওঠে- বাতাসি ও বাতাসি তুই কই? বলেছিলাম দীপা দিদি আসবে। দীপার ডান হাতের আঙ্গুল স্পর্শ করে একটা নরম হাত - আর দীপার মনের ইচ্ছে পাখি পাখা মেলে দেয় ওই মেঠো পথের আলোরবৃত্তের উদ্দেশ্যে।

    ............... নীলাঞ্জনা সরকার...........

                

                          

উপলব্ধি.... নীলাঞ্জনা সরকার


                 


ভালোবাসা সত্যি আদায় করা যায় না

পুড়ে মরা অনেক সহজ- ক্ষতগুলো ফুলের স্পর্শ।

দেখো, সেদিন জোনাকি ছিল রাতের আকাশে,

শুকতারা দেখছিলাম-কৃষ্ণচূড়ায় লাল ছিল আকাশ,

আর আগুন পাখি এসেছিল,

মন পাগল করা হাওয়ার সাথে খেলতে-

তবু হুল ফুটিয়েছিলো কারা যেন!

আসলে শত নিবেদনের মাঝেও-

ভালোবাসা আদায় করা যায় না ।।

                            *************


ভালোবাসি ভালোবাসি বলতে ক্লান্ত হয় যদি-

তোমার প্রিয়, তোমার মধুরাত!

স্নানে ভেজা নগ্ন পিঠ, ঠোঁটের লাল লিপস্টিক-

ভুলবে না ওই ভোর-

জানলা খোলা শীতলতায় আলিঙ্গনের গভীরতা,

তোমার মায়াবী প্রতিবিম্ব ছাড়া!

বাঁচবে না তোমার প্রিয়র

অলীক মনের স্বপ্নদেখা ।।

                   ************


বিনিদ্র রজনী শেষ!

তোমার কোলে মাথা রেখে গরল আমার ঠোঁটেই -

পাছে বিষচুম্বন দি তোমায়! জ্ঞান হারাও তুমি!

তখন আমার শত শত না বলা কথা,

তোমার আনা খোঁপার লাল গোলাপ

সব মিছে হয়ে যাবে যে?

তার চেয়ে তোমাতে আমি মিশে যাই-

অমৃতের উপলব্ধি অন্যতম হয়ে থাক।।


...........নীলাঞ্জনা সরকার.........



মানসী কিনবে গো..... নীলাঞ্জনা সরকার

 

লাল তরল, সবাই বলে রক্তস্রাব - তুমি বলো নারীত্ব।
নারী কিসের, ছোট মেয়ে তোমার!
যখন একলা ঘরে বসে লুকাই,
যখন বারবার নিজেকে পিছনে ফিরে দেখি..
তুমি এসে বলো চুপিসারে, সাবধানে থাকিস মা!
সাবধানতা কিসের... সবাই তো আপনার চারিপাশে।
যখন দূরে রক্তমাংসের দালাল, ক্ষুধার্ত চোখের চাহনি
তখন তোমার আঁচল আমার বাসা -
তোমার আদর আমার সকল আশা।
রাতে শুনে তোমার আর্তনাদ নিজেকে করি অপমান,
তখন আত্মশুদ্ধির স্নানে ব্যস্ত তুমি!
আড়ালে, নিভৃতে, ভয়ভীতিতে জর্জরিত আমি
তুমি এসে বলো চুপিসারে পালিয়ে যা মা।
পালাবো কেন... তোমার ছত্রছায়ায় যে আমি!
যখন ধূপের গন্ধে ম ম বাতাস, 
যখন বাইজি পাড়ার ব্যালকনিতে আমি,
তখন মদের গন্ধে মাতাল আকাশ।
তুমি তখন শান্ত, স্নিগ্ধ, রজনীগন্ধায় আবৃত।
চুপিসারে বললে এসে বাঁচবি না মা।
অনড় আমি বাঁচবো বলে, তোমার কাছে থাকবো বলে
যখন পান রাঙা ঠোঁটে বিষ চুম্বন, রক্তে দলিত আমি!
তখন শব কান্নায় ভিজে কামনার শিকার আমি।
তোমার দহনে আমার যোনি ছিড়ছে জানি।
দগ্ধ, জ্বলন্ত, রক্তস্নাত আমি।
তোমার আবেগে আবেশে জন্ম নিলেও-
সমাজের মানসী আমি, কে কিনলে গো আমায়!

              ....... নীলাঞ্জনা সরকার.......

Friday, October 30, 2020

চৈতির মিনিআম্মা.... নীলাঞ্জনা সরকার --------

 

একটা প্রাসাদ সমান বাড়ি চৈতির সামনে। তার মায়ের মামার বাড়ি, প্রতি বিশ্বকর্মা পূজোয় চৈতি আসে মা বাবার সাথে। শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ে একটা গলির মধ্যে ঢুকলে কিছুটা গেলেই সেই বাড়ি। বনেদি বাড়ি পাঁচতলা উঁচু। তার ছাদে পূজোর আয়োজন হয়। আর অনেক লোক আসে তাই খাওয়াদাওয়া সবকিছু নিয়ে এলাহী ব্যাপার। চৈতি বছর দশেকের একটা মিষ্টি মেয়ে। এবছর চৈতির সাথে একজন নতুন মানুষের আলাপ হয়, চৈতির মা পরিচয় করিয়ে দেয় একজন খুব বেঁটে কিন্তু মিষ্টি দিদার সাথে আর বলে - চৈতি, এই তোমার মিনিআম্মা। চৈতির সাথে কিছুক্ষণের মধ্যেই খুব ভাব হয়ে যায় মিনিআম্মার যে আসলে চৈতির মায়ের মাসি। চৈতি ভাবে এত ছোট্ট মানুষ তাই বোধহয় নামের আগে মিনি, খুব হাসি পায় চৈতির। সেটা বুঝতে পেরে মিনিআম্মা আলাপ করিয়ে দেয় দাদুর সাথে। ওমা, কি কান্ড! চৈতি দেখে দাদু কি বিশাল লম্বা। চৈতির চোখের পলক পড়ছে না দেখে মিনিআম্মা হেসেই বাঁচে না। এরমধ্যেই চৈতি বুঝতে পারে ওদের কোন সন্তানাদি নেই।  দাদু কাজ করতো আর্মিতে, সময়ের আগেই অবসর নিয়ে এখানে মা এর মামারবাড়ির পাশেই একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে আছে দুজনে মিলে, আসলে কাছের মানুষদের সঙ্গ পাওয়ার ইচ্ছে। মিনিআম্মা মানুষটি খুব হাসিখুশি সবার সাথে গল্প করতে খুব ভালোবাসে। একফাঁকে সব বাচ্চাদের নিয়ে নিজের বাড়িতে গিয়ে সব্বাইকে চকোলেট আর রসগোল্লা খাইয়ে তবে শান্তি পেল সে। সারাদিন অনেক আনন্দ করে চৈতি রাতে বাড়ি ফিরে আসে ওই নতুন মানুষটির স্মৃতি নিয়ে। বন্ধুদের সাথেও গল্প করে চৈতি তার মিনিআম্মার মজার মজার কাহিনী নিয়ে । এভাবে আরও চার বছর পূজোয় চৈতির অনেক ভালো সময় কাটে  মিনিআম্মা আর দাদুর সাথে। হঠাৎ একদিন সে শোনে দাদু আর নেই। সকালে হাঁটতে গিয়ে স্ট্রোকে সব শেষ। চৈতি তার মা বাবার সাথে যায় মিনিআম্মার বাড়ি, কত লোক তার মাঝে তার মিনিআম্মা পাথর হয়ে বসে। চৈতি এই সময়টা বোঝার জন্য অনেকটাই ছোট তবু সে এটুকু বুঝলো তার মিনিআম্মা একা হয়ে গেল। দাদুর শ্রাদ্ধের দিন অবধি তারা রোজ যাতায়াত করলো। এরপর বেশ কিছুদিন কেটে গেল  চৈতি এখন তাঁর আগের জীবনযাত্রায় ব্যস্ত। এর মধ্যেই একদিন সন্ধ্যাবেলা চৈতি শোনে তার বাবা মা আলোচনা করছে মিনিআম্মাকে সাহায্য করার জন্য। মা অনেক শিখিয়েছে কারোর কথা আড়ি পেতে শুনতে নেই , অন্যায় জেনেও চৈতি আজ নিজেকে আটকাতে পারলো না, সে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে পড়লো। অনেক কথা শুনে চৈতি যা বুঝলো তা হলো- দাদুর জমানো কোনো টাকাপয়সা নেই। মিনিআম্মার গয়না বেচে দাদুর কাজ হয়েছে এখন সবাই মিলে প্রতি মাসে সাহায্য করলে মিনিআম্মা দুটি ডাল ভাত খাবে। চৈতির খুব কষ্ট হলো - সে যদি আরও বড় হতো, চাকরি করতো তাহলে তার সবটা মিনিআম্মাকে দিতে পারতো সে। চৈতির খুব মন খারাপ হয়ে যায় মিনিআম্মার কথা ভেবে, তার তো আর কেউ নেই। দাদুর ওপর খুব রাগ হলো তার। একদিন মাকে জিজ্ঞেস করলো সে,আচ্ছা মা তোমরা যে বলতে দাদু আর্মিতে ছিল! মা বললো- হ্যাঁ রে। দাদু অনেক বছর ছিল আর্মিতে কিন্তু ওদের কোনো সন্তান ছিল না তো তাই নিজেদের জন্য সামান্য কিছু রেখে জীবনের উপার্জিত বাকি সবই ওরা দিয়ে দিয়েছে অনাথ আশ্রমে। চৈতির চোখে জল এসে গেল, সে ছুটে ছাদে চলে গেল ... নিজের মনে বললো দাদু, তুমি কেন এমন করলে? মিনিআম্মার কি হবে এখন! তোমরা নিজেদের কথা একটুও ভাবলে না ....চৈতির ছোট্ট মনে কত প্রশ্নের ঝড় ওঠে, সে ভেবে পায়না  কিভাবে তার মিনিআম্মার দুঃখ দূর করবে? চৈতি এখন এম.বি.এ পড়ছে, দিল্লীতে থাকে। অনেক ব্যস্ততায় মিনিআম্মার কথা তার আগের মতো মনে পড়ে না। তবে মা বাবার সাথে ফোনে কথা হলে মাঝে মাঝে খবর নেয় সে। একদিন মা খুব কাঁদলো চৈতির কাছে বললো- ছোটমাসীকে দেখতে গিয়েছিলাম, মাসী ১০০০ টাকা ধার চাইল ঘরে একটুও চাল নেই বলে। চৈতি, আমার মামারা কেমন মানুষ রে! একটা বোন রয়েছে ওদের পাশে একটু দেখতে পারে না? ওরা কত বড়লোক কিন্তু ওদের মনটা মরে গেছে। চৈতির মনটা ভেঙ্গে গেল অনেক দিন পর পুরোনো কথা মনে করে। সে ভাবে তাড়াতাড়ি পড়াশোনা শেষ করে একটা ভালো চাকরি পেলে বাবা মা কে সাহায্য করতে পারবে সে, এখন অনেক কিছু মা বাবার ইচ্ছে হলেও তারা করতে পারে না, আসলে চৈতির লেখাপড়ার খরচও তো অনেক। বছর খানেক পর দুর্গা পূজোর ছুটিতে চৈতি যখন বাড়ি আসে, তখন একদিন মাকে বলে- চলো, মিনিআম্মাকে দেখে আসি। কিন্তু মা এড়িয়ে যায়। চৈতি একটু অবাক হয়ে যায়! যাইহোক মাকে আসল কথা না বলে সেদিন দুপুরে একটু মিথ্যে বলেই সে বেরিয়ে পড়ে। মাকে বলে, বন্ধুদের সাথে বেরোচ্ছি কিন্তু আসলে সে যায় তার মিনিআম্মাকে দেখতে। গিয়ে অবাক সে! যে বাড়িতে মিনিআম্মা ভাড়া থাকতো বাড়িভাড়া দিতে না পারায় সেখান থেকে সে বিতাড়িত হয়েছিল তারপর নাকি সে থাকতো ভাইদের বাড়ির নিচের একটা ছোট ঘরে। সেই মামাদাদুদের বাড়ি চৈতি আর ঢুকলো না,ভাবলো থাক মা কে না বলে এসেছি কি দরকার? সে বেরিয়ে আসে বড় রাস্তায়।  চারিদিকেে পূজো পূজো রব।  বিকেল হয়ে যাওয়ায় রাস্তায় আলো জ্বলে উঠেছে। মা দুর্গা আসার আগে থেকেই শহরটা এত সুন্দর সেজে ওঠে যে তার মধ্যে নিজেকে মনে হয় এক রূপকথার রাজ্যের রাজকুমারী। তবু মনটা বিশেষ ভালো না থাকায় একটু আনমনে হাঁটতে থাকে সে। বাড়ি ফেরার বাসটা এলেও ছেড়ে দেয় সে, আসলে চৈতি মত পরিবর্তন করে। ভাবে, দেখাই যখন হলো না তখন একটু ঘুরে নি। খানিকটা এসে সেন মহাশয় মিষ্টির দোকান, এই দোকানের মিষ্টি তার খুব প্রিয়। দোকানে ঢুকতে যাবে, ঠিক তখন দেখে দোকানের পাশের কোণে ডানদিকে কে যেন বসে আছে, তার খুব চেনা। বুকটা কেমন মুচড়ে ওঠে চৈতির- ধীর পায়ে এগিয়ে যায় সে। সামনে গিয়ে দাঁড়ায় চৈতি, আর একটা হাত উঠে আসে তার দিকে -একটা চেনা স্বর কানে আসে "দুটো ভিক্ষা দেবে" ........ চৈতির শরীরটা গুলিয়ে ওঠে সে বসে পড়ে ওখানেই। তারপর দুদিন কেটে গেছে চৈতির, হাসপাতালে তার মিনিআম্মাকে নিয়ে। চৈতির মা বাবাও আছেন। মা ক্ষমা চেয়েছিল চৈতির কাছে, তাঁর মাসিকে তার মামারা বের করে দিয়েছে বাড়ি থেকে সে কথা লজ্জায় চৈতির থেকে লুকিয়েছিল বলে। চৈতির সাথে যেদিন মিনিআম্মার দেখা হলো সেদিন তার গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছিল, কদিন খাওয়া জোটেনি কে জানে! চৈতির মুখ দেখেও চিনতে পারেনি ওকে! চৈতি ভাবে সেদিন তার সাথে মিনিআম্মার দেখা না হলে কি হতো! আসলে মা বোধহয় এমন করেই আসেন..কখনো কন্যা রূপে, আবার কখনোবা দেবী রূপে। আজ চৈতি যেন সেই দেবী রূপেই আবির্ভূত হলো মিনিআম্মার জীবনে। সেই মিনিআম্মা যে চকোলেটের বাক্স নিয়ে ঝগড়া করত, টুকরো টুকরো হাসিতে ভরিয়ে রাখত চৈতিকে আজ তার নিঃস্ব অবস্থা সেই মহাকালকেই মনে করায় যার অস্তিত্ব আমাদের জীবনে সর্বব্যাপী কিন্তু আমরা তাকে দেখেও না দেখার ভান করি। এই বিপর্যয়ের ফলাফল মনে প্রভাব ফেলে কিন্তু সময়ের সাথে আমরা তাকে পিছনে ফেলে অনেক এগিয়ে যাই, যেখান থেকে অতি প্রিয়জনের সামান্য ইচ্ছেটুকুও বেমানান আমাদের বিলাসবহুল জীবনে। চৈতি ভাবে, মা দুর্গা সবার মনে ভালোবাসার রেশটুকু ছড়িয়ে দিতে পারেনা কেন? পূজো শেষ হওয়ার সাথে সাথে কেন মাটির ঠাকুরের সাথে সব সত্যি, সব সত্ত্বার বিসর্জন হয়! মা দুর্গা এই সমাজ থেকে অনেক বড় তবু সে কেন শুধুই পূজোর মূর্তি হতে বাধ্য হয়! চৈতি স্থির করে, সে আর থেমে থাকবে না। অন্ধকারের মা দুর্গাদের  যথার্থ সম্মান দেবে সে। চোখের জল মোছে সে। অবশেষে বিজয়া দশমীর দিন এসে গেল। আজ চৈতি দিল্লী ফিরে যাবে, মন চাইছে না কিন্তু উপায় নেই। চৈতির মা বাবা কথা দিয়েছে মিনিআম্মা সুস্থ হওয়া অবধি ওরা ওকে হাসপাতাল থেকে এনে তাঁদের কাছে রাখবে। আর চৈতি এর মধ্যেই অনেক এন জি ও এর সাথে যোগাযোগ করেছে, তার মধ্যে একটা হলো "কুসুমকলি" এখানে অনাথ বাচ্চারা থাকে। সেখানে মিনিআম্মার মতো মানুষেরা চাইলে বাচ্চাদের দেখাশোনায় সাহায্য করতে পারে। চৈতি এখানেই তার মিনিআম্মার ভবিষ্যৎ ঠিক করেছে - তাঁর মিনিআম্মা শেষ জীবনটা সসম্মানে বাঁচবে, নিজের রোজগারে নিজে খাবে আর চৈতি তো আছেই তাঁর নিয়মিত খোঁজ নেওয়ার জন্য। খুব নিশ্চিন্ত মনে চৈতি ট্রেনে উঠে পড়ে সুদূর দিল্লীর উদ্দেশ্যে সেই প্রথম দিনের মিনিআম্মার প্রাণোচ্ছ্বল হাসিটা মনে করে - মিনিআম্মা তুমি আবার হাসবে, নতুন ভাবে বাঁচবে, দাদু তুমিও দেখো ওপর থেকে আমার মিনিআম্মা মহামায়ার মত কত সন্তানের জননী হবে। মা হওয়ার কোনো বয়স হয় না। চৈতি নিশ্চিন্তে শুয়ে চোখ বন্ধ করে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে মা দুর্গার বিসর্জনের মুহূর্তটি কিন্তু এক নিমেষেই মনে হয় আর এক মা দুর্গার আবির্ভাব তাকে শিউলির সুগন্ধ দিয়ে যাবে আগামী দিনেও....ট্রেন চলতে থাকে জীবনের গতির সাথে তালে তালে মিলিয়ে.... কু ঝিক্ ঝিক্।।


       .......... নীলাঞ্জনা সরকার........

প্রেম ডট কম... নীলাঞ্জনা সরকার

  একটুখানি খোলা আকাশ দেখার সৌভাগ্য যে কবে হবে! নির্মল দীর্ঘশ্বাস ফেলে...সব সুখ বিলীন হয়ে গেছে মৃন্ময়ীর সাথে। মনে আনাগোনা করে মৃন্ময়ীর সাথে...