Saturday, October 31, 2020

ইচ্ছে পাখি...... নীলাঞ্জনা সরকার

 

                                  

পড়ন্ত আলোয় ছাদে দাঁড়িয়ে ছিল দীপশিখা। নিচে মিছিলের আওয়াজ,তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়েছিল,অপেক্ষারত সে- কবে সততার গানের সাথে পা মিলিয়ে চলবে জাতীয় পতাকা বুকে আঁকড়ে ধরে! ঝড় উঠলো বোধহয়,তবু মিছিল এগিয়ে চলেছে। একসময় সামনের গলির বাঁকে তা মিলিয়ে যায়, কিন্তু ক্ষীণ আওয়াজ ভেসে আসে এখনো কানে! এই তো সেদিনের কথা ঘরের সামনে দাদা লুটিয়ে পড়েছিল রক্তাক্ত হয়ে- দরজা খুলতেই তার চোখের সামনে দাদা চিরদিনের মতো চলে গিয়েছিল। কে গুলি করেছিল তা কেউ কোনোদিন আর খুঁজে দেখেনি, বলা যায় চেষ্টাই করেনি। শুধু সেইদিন থেকে সবকিছু অদৃষ্ট বলে মেনে নিয়েছে বাড়ির লোকজন। সন্ধ্যে হলো, শাঁখের আওয়াজ আসছে। ছাদের দরজা বন্ধ করে নীচে নেমে আসে দীপশিখা, মা তুলসী তলায় প্রদীপ জ্বালায় রোজ এই সময়। পুজো হয়ে গেলে নিভিয়ে দেয়। কিন্তু প্রদীপের আগুনের মতো মনের আগুন নেভে না বরং উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। দীপশিখা এখন কলেজে বাংলায় অনার্স নিয়ে পড়ছে। দেশের চারিদিকের যা অবস্থা পারলে বাড়ির লোক তার পড়াশোনা বন্ধ করে তাকে বাড়িতে বসিয়ে দেয়। দেশ স্বাধীন হলে কি হবে মানুষের চিন্তাধারা এখনো যে পরাধীন। প্রতিদিনের আন্দোলন আর রাজনৈতিক অরাজকতা তার জ্বলন্ত প্রমাণ। 
      ছাদে এতক্ষন কি করছিলিস দীপা? মায়ের গলায় উৎকণ্ঠা- তোর দাদা তো আর ফিরে আসবে না, তোকে যতদিন না শ্বশুরবাড়ী পাঠাচ্ছি ততদিন একটু শান্তি দে- এক নিঃশ্বাসে বলে যায় দীপশিখার মা। স্থির দৃষ্টিতে মাকে দেখে দীপশিখা, তার একটুও রাগ হয় না। সত্যি তো মায়ের মনের ওপর দিয়ে যা গেছে তা অবর্ণনীয়। সে নিজে, বাবা সবাই নিজের কিছু না কিছু নিয়ে ব্যস্ত কিন্তু মা সারাদিন সংসারের কাজ করে যখনই সময় পায় ওই দাদার ছবির সামনে বসে লুকিয়ে চোখের জল ফেলে। বাবা প্রায় বলে- "দীপা মা, তুই যখন মা হবি বুঝবি!" দীপা অনেক সাহসী হয়তো ছোট থেকে মাকে দেখে। দাদা সক্রিয় রাজনীতি করতো তখন মাকে দেখেছে দীপশিখা। সেসময় মায়ের সহযোগিতা ভোলার নয়। কত মিটিং হয়েছে বাড়িতে মা হাসিমুখে রান্নাঘর থেকে আওয়াজ দিত,বাবু ও বাবু- আর কতক্ষন সবাই খালিপেটে থাকবি আয় রে মুড়ি আর বেগুনি নিয়ে যা। দাদার বন্ধুরাও খুব শ্রদ্ধা করতো মাকে। সেই বাবুর রক্তে ভেসে যাওয়া নিথর দেহটা বুকে আঁকড়ে মা কেমন যেন হয়ে গেল, সেই আগের মাকে আর ফিরে পায় না দীপশিখা। মাঝে মাঝে খুব অবাক হয় সে, বাবুর অসমাপ্ত কাজে যোগদান করার জন্য সে যে নিজেকে তিলে তিলে গড়ে তুলেছে তা কি কারুর চোখে পড়ে না!
কলেজে দীপশিখা খুব চুপচাপ, চোখ -কান খোলা রাখে কিন্তু খুব একটা এগিয়ে যায় না সব ব্যাপারে। হয়তো বাড়ির পরিবেশটা মনে করে। তবে তার বাড়ির কথা কলেজের সবাই জানে বলে মাঝে মাঝেই তাকে ডেকে পাঠায় সেখানকার ছাত্র রাজনৈতিক দলের নেতা, তাকে অনুরোধ করে বার বার সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহনের জন্য। দীপশিখা ক্লান্ত না বলতে বলতে, মা-বাবার মুখটা ভেসে ওঠে তার চোখের সামনে। আজও ক্লাসরুমে বসে সে, ক্লাস নিচ্ছেন অজিতবাবু কিন্তু মনটা তার বাইরে পড়ে আছে। সামনেই কলেজের ভোট, জোরকদমে প্রস্তুতি চলছে- তার ছুটে যেতে ইচ্ছে করছে, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার জন্য মনটা ছটপট করছে।
 
  বীরত্ব সেখানে-
  যেখানে রক্ত কুন্ঠিত নয় ভেসে যেতে,
  পরাজয় নিমিত্ত,পরাজিত যেখানে পিপাসার্ত।
  অন্ধকারেই আলোর প্রকাশ-
  দুর্বলতা আসলে বিষ-
  আত্মসমর্পণ নিজের কাছে সবচেয়ে বিস্ময়,
  নীলকণ্ঠ হওয়া সবচেয়ে দামি।।

দাদার এই কথাগুলো কানে বাজে দীপশিখার। দাদার কাছে যখন তার কাজের ফিরিস্তি চাইতো তার আদরের বোন তখন এইরকম কত কাব্য করতো তার দাদা। দীপশিখার চোখ ছলছল করে ওঠে। মনটা চিৎকার করে বলতে চায়- কে গো এমন করলে! না মেরে জিততে পারলে না? এত কাপুরুষ এত দুর্বল তোমরা! আজ একটা সিদ্ধান্ত নেয় সে। শুধু মা বাবার কথা ভাবলে হবেনা। অসময় তার দাদা চলে গেলেও সে বেঁচে আছে .....দাদার স্বপ্নের নীলকন্ঠ হবে সে। দাদার স্মৃতি বুকে আঁকড়ে নয় তার আত্মমর্যাদার সন্মান দিতে এগিয়ে যাবে সে.....সত্যিকারের দীপশিখা হয়ে জ্বলে উঠবে। বাড়ি ফেরার পথে বিকালে আলী চাচার সঙ্গে দেখা, তার চা এর দোকান। খদ্দের নেই দেখে দীপশিখা আসে তার কাছে, বড় ভালোবাসে এই চাচা তাকে। দীপশিখা বুড়ো হতে দেখলো চাচাকে। চা খাবি মা- বোস একটু আমার কাছে। আজকাল পড়া নিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে পড়েছিস বুঝি! আমার ছেলেটা শুকনো ভালোবাসার খপ্পরে পরলো বোধকরি! মাঝে মাঝে বাড়ি ফেরেনা। সেদিন পুলিশ এসেছিল রে, পাড়াতে দাঙ্গা হতে পারে মা, সাবধানে থাকিস। কথাগুলো শুনে দীপশিখার বুকের মধ্যে উথালপাথাল হতে লাগলো - শেষ যেদিন দাদাকে দেখলাম সেদিনও দাঙ্গা হয়েছিল! দাঙ্গা অর্থে যা হয় সেদিন তো সেসব কিছুই হয়নি, শুধু তার বাড়ির সব সুখ শান্তি চলে গেছিলো দাঙ্গার দোহাই দিয়ে - যাতে আর কেউ রক্তবন্যার ভয়ে তদন্তের নাম না মুখে আনে। আবার কার পালা! দীপশিখা বাড়ি ঢোকে। ঢুকেই দেখে দাদার দুই বন্ধু তার জন্য অপেক্ষা করছে। 
দীপা, আমরা বনগার কিছু গ্রামে লেখাপড়া শেখানোর জন্য ছোট ছোট দল বানাচ্ছি - ছুটির দিনে মাত্র দু ঘন্টা ক্লাস নিতে হবে। তোকে আমাদের চাই। তুই না করিস না, আমরা অনেক আশা নিয়ে এসেছি। সহজে কেউ রাজি হতে চায় না রে, কোনো অর্থপ্রাপ্তির সুযোগ নেই তো তাই। কিন্তু কত মানুষ শুধু পড়তে লিখতে জানেনা বলে অবাঞ্ছিত বঞ্চনার স্বীকার হচ্ছে।
দীপশিখা মনে মনে চঞ্চল হয়ে ওঠে, এমন সুযোগ সে কিছুতেই হাতছাড়া করবে না। সে বলে ওঠে, নিশ্চয় মলয়দা। আমি যাব - মানুষের জন্য কিছু করতে পারব এটা কি কম কথা নাকি! 
-খুব খুশি হলাম রে, সুজন বলে ওঠে..বিপ্লব মারা যাওয়ার পর এবাড়িতে খুব একটা আসি না। মাসিমাকে কি করে মুখ দেখাবো সেই লজ্জায়, আমাদের বন্ধুকে তো আমরা বাঁচিয়ে রাখতে পারিনি। এ কম যন্ত্রণার নয়। ওর মুখটা তবে এখনও বুকের মধ্যে জ্বলজ্বল হয়ে আছে।

বিপ্লব, তুমি জাগ্রত যেমন আমার বুকে-
আমার অস্থিমজ্জা, রক্তসজ্জা আজ লেলিহান শিখা প্রবহমান প্রলয় ঝড় তেমনি আমার বিবেক জুড়ে।
বিপ্লব, চলে গেলে ওই সুদূরে- 
আলোকগোলায় বিলিয়মান হলে,
এই ধরাতলে রয়ে গেলাম আমি -
তোমার প্রতিচ্ছবি হয়ে।

বাসের জানলার ধারের সিটে বসেছিল দীপশিখা। আজ প্রথম যাচ্ছে সে দাদার অনেক অসমাপ্ত কাজের সূত্র ধরতে। বাবা শেষপর্যন্ত মাকে রাজি করিয়েছিল। এই কদিনে অনেক কিছু ঘটে গেছে।
দীপশিখা যা ভেবেছিল তাই হয়েছে আলী চাচার ছেলের লাশটা তাদের দোকানের সামনে কারা যেন এসে ফেলে দিয়ে গিয়েছিল! চাচার আর্তনাদে তার বুক ফাটলেও সমাজের বুক ফাটেনি। অনেক সান্ত্বনা বাক্য শুনে শুনে আলী চাচা চুপ হয়ে গেছিল। আশপাশের পাথরগুলো তবু বোঝেনি, ওরে এগুলো দাঙ্গা নয় - এগুলো মানবতার শরসজ্জা। টপ করে জলের ফোঁটা পড়ে চোখ থেকে - চমকে যায় দীপশিখা! একি জল কেন? দীপশিখা ভাবে, আচ্ছা মানুষ কিসে খুশি হয়- আপনার জন সুখী হলে নাকি দুঃখে থাকলে? আসলে তো চারপাশটা নগ্ন, ভালোথাকার লড়াইতে ব্যস্ত। 
সুজনদা ডাক দেয়- ওরে সবাই নাম রে, কোমর বেঁধে শুরু করি। বাসের সবাই হেসে ওঠে, কি আনন্দ কি নিরাপত্তার হাসি। মুগ্ধ হয় দীপশিখা, বাস থেকে নামে - এগিয়ে চলে নবজীবনের পথে। চারপাশে নোংরা জামা পরে কত পরিষ্কার মনের মানুষ, নিষ্পাপ শিশুর দল। কে একজন বলে ওঠে- বাতাসি ও বাতাসি তুই কই? বলেছিলাম দীপা দিদি আসবে। দীপার ডান হাতের আঙ্গুল স্পর্শ করে একটা নরম হাত - আর দীপার মনের ইচ্ছে পাখি পাখা মেলে দেয় ওই মেঠো পথের আলোরবৃত্তের উদ্দেশ্যে।

    ............... নীলাঞ্জনা সরকার...........

                

                          

No comments:

Post a Comment

প্রেম ডট কম... নীলাঞ্জনা সরকার

  একটুখানি খোলা আকাশ দেখার সৌভাগ্য যে কবে হবে! নির্মল দীর্ঘশ্বাস ফেলে...সব সুখ বিলীন হয়ে গেছে মৃন্ময়ীর সাথে। মনে আনাগোনা করে মৃন্ময়ীর সাথে...