Friday, March 26, 2021

সুখময়.... নীলাঞ্জনা সরকার

 


বৃষ্টি দেখছিল রাইমা। চার বছর হলো তার বিয়ে হয়েছে। শ্বশুরবাড়ির দোতলার এই ঘরটি তার খুব প্রিয়, এখানেই সে নিজেকে খুঁজে পায় বাকি সব আড়ম্বরতাকে পিছনে ফেলে। রাইমার স্বামী সরকারি চাকরি করত, কিন্তু এখন চাকরি ছেড়ে নিজের পছন্দকে প্রাধান্য দিয়েছে সে। সমুদ্র, রাইমার স্বামী এখন লেখালিখি করে। চিলেকোঠার ঘরটি এখন সমুদ্রর সাফল্যে ভরে গেছে। রাইমাকে মাঝে মাঝে সেই ঘরে নিয়ে যায় সমুদ্র। বোঝাবার চেষ্টা করে অনেক কিছু কিন্তু রাইমার কৌতূহল তার কাজের ক্ষেত্র ছাড়িয়ে যায় অনেক দূর, তখন দুজনেই হেসে উঠে অবশেষে থেমে যায়....ভালবাসার মুহূর্তগুলোয় অন্তরায় হয় ব্যস্ততা। সমুদ্র প্রায়ই বলে,

- দাঁড়াও, আর দেরি নেই.. খুব শীঘ্রই আমি আমার আত্মজীবনী শেষ করব তাতে তোমার অনেক না জানা প্রশ্নের উত্তর পাবে। 
রাইমা তার চোখের দৃষ্টি সমুদ্রর থেকে সরিয়ে নিয়ে ধীর পায়ে একটা একটা করে সিঁড়ি গোনে আর নামে.... মনে মনে ভাবে এই সব প্রশ্ন তার আর সমুদ্রর জীবনের অনেকখানি সময় কেড়ে নিয়েছে। রাইমা খুব ভালো আবৃত্তি করতে পারে আর তার হাতের আঁকাও অসাধারণ। তাই অবসরে প্রায়ই রং তুলি নিয়ে বসে পড়ে, এমনি একদিন অবসরে সে আঁকলো মেঘে ভরা আকাশ, সূর্যোদয় আর দুটি ভালোবাসার মানুষকে..... অনেকবার করে ছবিটা দেখেও রাইমার মন ভরলো না! কি যেন এক অসম্পূর্ণতা গ্রাস করে আছে এই জলরঙের ছবিটিতে। মাঝে মাঝে ছলাৎ করে ওঠে রাইমার বুকের ভিতরটা, ভালোবাসার মানুষের মুখে নিজের নামটা কি মিষ্টি লাগে! কিন্তু সমুদ্র যে বড় ব্যস্ত এখন, কতদিন তার মুখে 'রাইমা ' ডাকটা শোনেনি সে। 
          সামনেই বইমেলা। রাইমার বুকের ভিতর অনেকটা জুড়ে ছিল বইয়ের গন্ধ। সে খুব কবিতা ভালোবাসত তাই সেই টানে ছুটে যেত বইমেলায় বার বার। পাঁচবছর আগে সেখানেই সমুদ্রর সাথে আলাপ। কিভাবে যেন মনের মিল হয়ে গেছিল তা আজ ভাবলে খুব অবাক হয় রাইমা। তারপর একবছর প্রেম করে সাত পাকে বাঁধা পড়ে তারা। কিন্তু আজ এই কবিতা থেকেই একটু একটু করে দূরে সরে গেছে রাইমা। বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যেই অন্তঃসত্ত্বা হয় সে। সবে দুমাস তখন, বারান্দায় বসে প্রিয় কবির কবিতা আবৃত্তি করছিল একা একা আর হঠাৎ আনমনে চেয়ার থেকে উঠতে গিয়ে পায়ে শাড়ি জড়িয়ে পড়ে যায় রাইমা। মা হওয়ার স্বপ্ন অধরা থেকে গেছে আজও, মনে খুঁত ধরেছে....রাগ, অভিমান সব ওই কবিতার ওপর। সমুদ্র ইতিমধ্যে কলমকে যত কাছে টেনেছে, রাইমা কবিতাকে ঠিক ততটাই দূরে। অথচ তাদের জীবনের প্রতি শুভ অনুষ্ঠানে সমুদ্র উপহার দিয়েছে কবিতার বই কিন্তু রাইমা সেই উপহার সাজিয়ে রেখেছে বুক শেলফে। ধুলো ঝাড়ে সে বইয়ের কিন্তু পরত পড়তে থাকে মনের ওপর। 
            সামনের বইমেলায় সমুদ্রর আত্মজীবনী প্রকাশ পাবে, রাইমা ভাবে সেখানে তার কথা কি লিখবে সমুদ্র! তাদের ভালোবাসার দিনগুলো, অনুরাগের মুহূর্তগুলো সব কি অক্ষরে প্রকাশ করা যায় নাকি করা উচিত! আর তাদের যে স্বপ্ন কোলে আসার আগেই হারিয়ে গেল, তাকে কিভাবে লিখবে সমুদ্র? আচ্ছা, সে কি খুব ব্যস্ত! রাইমার একাকিত্ব তাকে বোধকরি সেভাবে ভাবায় না! রাইমা যখন এইসব ভাবছিল, তখন সমুদ্র ফিরল বাইরে থেকে একটা মস্ত বড় ফুলের তোড়া নিয়ে। 
- এই নাও ধর। আজ প্রকাশকের অফিস থেকে ফেরার পথে তোমার জন্য নিয়ে এলাম।
- কেন গো? আজ হঠাৎ....
- আজ আমি খুব খুশি রাইমা। আমার লেখা শেষ। সব ফাইনাল হয়ে গেল আজ।
- আচ্ছা, তাই আমার জন্য আনলে?
- কেন! আমার খুশিতে কি তুমি খুশি নয়?
- নিশ্চয়। আচ্ছা, বলতো তোমার বইতে আমায় নিয়ে কি লিখলে?
- সে সব পরে হবে। চলো আজ একটু ঘুরে আসি। আজকের দিনটা মনে আছে তোমার?
- আমার মনে আছে সব। তোমার মনে আছে!......চোখে জল এসে যায় রাইমার। এত ব্যস্ততায় সমুদ্র ভোলেনি তাহলে! আজকের দিনেই তো সমুদ্র তার মনের কথা বলেছিল। রাইমা খুব খুশি হয়। কতদিন সমুদ্র শুধু তার হয়নি....
         অবশেষে এল সেই দিন। রাইমা সুন্দর করে সেজেছে তার সমুদ্রর জন্য। দুজনে আবার একসাথে যাবে বইমেলা। আজ তার আত্মজীবনী প্রকাশ পাবে। রাইমা একটু ইতস্তত করছিল কিন্তু সমুদ্রর আবদারে তা ধোপে টেকেনি। সমুদ্র বার বার বোঝায় রাইমাকে, যে তাদের এই পরিস্থিতির জন্য কবিতা কখনও দায়ী নয়। কবিতা তো একটা মনমুগ্ধকর সময় যা মনকে সেই বরফাবৃত পাহাড়ের চূড়ায় নিয়ে যায়, যেখানে কল্পনা শুধু শুদ্ধ আর শুভ্র... সব কালিমা ছাড়া। রাইমা বার বার মানতে চায় সমুদ্রর কথা, কিন্তু প্রতি মাসের ব্যর্থতা....সে যে বড় নিদারুণ। 
                 তবুও প্রিয় মানুষের জন্য অনেকদিন পর বইমেলায় রাইমা। হাততালিতে ভরে গেছে প্রকাশকের স্টল। কিছু সাংবাদিক এসেছেন। রাইমা খুব খুশি আজ। সমুদ্র এসে তার হাতে তুলে দেয় নিজের লেখা সেই আত্মজীবনী, যার প্রতি পাতায় অনেক আশা নিরাশার কাহিনী লুকিয়ে আছে। রাইমা সেই বইয়ের গন্ধ মাখে, চোখ দিয়ে স্পর্শ করে তার কয়েকটি পাতা। সমুদ্র রাইমার হাতে তুলে দেয় রঙিন কাগজে বন্দী আর এক উপহার। 
- রাইমা, আমি তোমার জন্য তোমার প্রিয় কবিতার সেই বইটা এনেছি...যা তুমি অভিমানে টুকরো করে ফেলেছিলে। আবার ফিরে এসো তুমি আমার সেই আগের মানসী হয়ে।
- কিন্তু যে সময় হারিয়ে গেল তাতে কি আবার স্বাভাবিক হওয়া যায়?
- নিশ্চয়ই যায়। কোনও কিছু হারিয়ে যায় না। সময়ের ব্যবধানে ঠিক ফিরে আসে। আর জানত,স্বপ্ন উত্তরোত্তর রঙিন হবে যখন সবুজ মাঠে নতুন সূর্যের গন্ধ গায়ে মেখে ঘূর্ণি হাওয়ার সাথে বন্ধুত্ব করে খুশির মেঘে আকাশের কালো মুখখানায় সোনার জরি বুনে দিতে পারবে।
- কিন্তু আকাশের অভিমান সহজে ভাঙতে পারলেও সম্পর্কের টানাপোড়েনে তা বোধহয় সবসময় সম্ভব হয় না। আমি বুঝি, ঝোড়ো হাওয়ার সাথে দেখা হওয়াটাও খুব জরুরী, তাণ্ডবের পরেই নিজের তীব্র স্পর্শকাতরতা বোঝানো যায়।কিন্তু ঝরা পাতার দেশে মনকেমনেরা মাঝে মাঝেই মেঘপিয়নের হাত ধরে বৃত্তাকারে ফিরে ফিরে আসে আর মনে হয় এমন একটা সকাল যদি আসতো চোখ খুলতাম আর শুধু সব চাওয়াগুলো হাতের মুঠোয় পেতাম। 
- রাইমা, তোমার ভালোবাসা আসলে হেমলক বিষের থেকেও অনেক গভীর প্রভাব বিস্তার করে আমার হৃদয়ে। যদি পরজন্ম পাই তাহলেও মন খুঁজবে এই হৃদয়টাই। তাই অভিমানগুলোকে ছুটি দিতে চাই। জানালা খুলে ভাসিয়ে দিতে চাই ভ্রাম্যমান স্বার্থপরতাকে  যাতে সুখময় অনুভূতিগুলো আঁছড়ে এসে পড়ে বুকের উপর। 
রাইমা ভাবুক হয়ে যায়। বই দুটি আঁকড়ে ধরে সে বুকের মধ্যে। সমুদ্র তাকে হাত ধরে নিয়ে যায় সকলের মাঝে....
- এই আমার রাইমা...আমার প্রেরণা। ওর ধৈর্য্য আজ আমায় এই উচ্চতায় পৌঁছতে সাহায্য করেছে। 
রাইমার চোখে চোখ রাখে সমুদ্র, গভীর গলায় আবেদন করে একটা কবিতা আবৃত্তি করার জন্য।
কাঁপা গলায় রাইমা শুরু করে তার প্রিয় কবির ভাবনা....

"আমি আশায় আশায় থাকি।
আমার তৃষিত আকুল আঁখি॥
ঘুমে-জাগরণে-মেশা প্রাণে স্বপনের নেশা—
দূর দিগন্তে চেয়ে কাহারে ডাকি॥
বনে বনে করে কানাকানি অশ্রুত বাণী,
কী গাহে পাখি।"

 .....গুঞ্জিত হয় তার ফিরে পাওয়া সুখ।।      



Friday, March 5, 2021

রাতের বৃষ্টি....নীলাঞ্জনা সরকার




তোমায় নিয়ে ভাবতে ভালোই লাগে, তবে..
যে অনুভূতিগুলো ছুঁড়ে ফেলেছি স্বপ্নিল ঢিলের মতো ছলাৎ শব্দে
সেগুলো আর রিনিঝিনিতে ফেরে না,
থাকে কালো মেঘের পৃথিবীতে।
তাই কষ্ট পেও না, কখনও জ্যোৎস্না রাতে বৃষ্টি হলে!
তখন বরং মধ্যরাতে মাঝ আকাশের হাতছানিতে 
উষ্ণতার নীল মেখো আলাপনের নিমিত্তে।।


Thursday, March 4, 2021

বসন্ত এমনই..... নীলাঞ্জনা সরকার

 




বসন্ত এলে, সেই চিঠিগুলোয় ফিরি 
যেগুলো অকৃত্রিম ভালোবাসার ছোঁয়া দিয়ে যায়।
পুরোনো কাগজে অক্ষরের গন্ধে আজও...
চোখ বন্ধ করে স্পর্শের নাম বলে দেওয়া যায়।
খুব ভালোবাসলে বোধহয় এমনই হয়...
দূরত্বের সাথে গালের আবির আরও গভীর হয়।
এখনও মেঘের আঁড়ালে নীল ছিড়ে যে ঝর্ণা নামে
তাতে ভেসে যেতে চায় আমার মনে তোমার বসবাস।
তবুও আঁকড়ে রাখি, সেই আগুনের গল্প
পরিচিত ডাকের অপেক্ষায় থাকে ভালোবাসার বাড়ি।
বসন্ত যে এমনই, মনে হয় মেরামত করি...
কল্পনার আঁকিবুকিতে বেপরোয়া পিছুটানে অন্ধ হই,
কান্নার অসমাপ্ত কারণে বুক ভিজিয়ে-
স্বপ্নিল আতরের গন্ধে উপেক্ষিত হৃদয়
এই বুঝি অনুভূতিগুলো গুছিয়ে বলে ওঠে...
"তুমি তো আমারই ছিলে।"



প্রেম ডট কম... নীলাঞ্জনা সরকার

  একটুখানি খোলা আকাশ দেখার সৌভাগ্য যে কবে হবে! নির্মল দীর্ঘশ্বাস ফেলে...সব সুখ বিলীন হয়ে গেছে মৃন্ময়ীর সাথে। মনে আনাগোনা করে মৃন্ময়ীর সাথে...