কবি মল্লিকা সেনগুপ্তের লেখা 'শুভম তোমাকে' পাঠ করলাম।
লিংক দেওয়া হলো👇
কিছু গল্প শুরু হলে যদিওবা শেষ হয় ভয়ের রেশটুকু থেকে যায়। কিন্তু আমার মনে শুধু ভয় নয়, অবর্ণনীয় অনুভূতি থেকে গেছে এক মাকে নিয়ে।
আমি তখন কলেজের ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র। আমার প্রিয় বন্ধু সূর্য এসে একদিন আমায় বলল,
-আমি কয়েকদিনের জন্য দাদুর বাড়ি যাবো। তুইও চল।
-এখন তো কলেজ পুরোদমে চলছে! পুজোর এক সপ্তাহ পরেই তখন চল।
- কাল দিদা ফোন করে খুব কাঁদছিল। বাবা আমাকে যেতে বলেছে।
সূর্যর দাদুর বাড়ি অশোকনগরে। বুঝলাম ও আমাকে সাথে চাইছে। পরদিন পৌঁছে গেলাম।
সূর্যর দিদা আমাদের দেখেই মনিকে ডাকলো। মনির মা দিদাকে সংসারের কাজে সাহায্য করে। ফ্রক পরা মেয়েটি এলে দিদা বললো,
-ওর সারা গায়ে কটকটে যন্ত্রনা। মনে হচ্ছে গোটা শরীরে কেউ দাঁত বসিয়ে দিয়েছে। কিরে! কষ্ট হচ্ছে না তো?
মনি একটু টলে যায়। ওকে দেখে মনে হচ্ছিল কষ্টটা ছিল ভয় লজ্জা সবকিছু মিশিয়ে!
সূর্য জিজ্ঞেস করে,
-ওর মা কোথায়?
দিদা চিৎকার করে কেঁদে ওঠে,
- সর্বনাশী! ওইতো যত নষ্টের গোড়া। ওকে একটা ঘরে বন্ধ করে রেখেছি।
- কেন?
- 'মা' শব্দটা ওর জন্য নয় ও তো একটা ডাইনি। রাতে ওরা দুজনে এক ঘরেই ছিল হঠাৎ মনি কেঁদে ঘর থেকে ছিটকে বেরিয়ে আসে। আমাদের ঘুম ভেঙে যায় আমরা গিয়ে দেখি মনির মা শান্ত হয়ে বসে, ওর মুখে রক্ত।
- এ কি বলছো দিদা? মাসি ডাইনি! এ আবার হয় নাকি! দাদু কোথায়?
- তোর দাদু রাগ করে কথা বলছে না।
- আমি একবার মাসির সাথে কথা বলতে চাই।
- খবরদার। ও কাজ করতেও যাস না। সবাই বলছে ও ঘরে যে ঢুকবে ডাইনি তাকে ছাড়বে না।
- তুমি তো পরশু ফোন করেছিলে সেই থেকে মাসিকে বন্ধ করে রেখেছো নাকি?
আমি রীতিমতো আঁতকে উঠি পরিস্থিতি দেখে। সূর্যর দিকে তাকাই। ইশারায় ওকে বোঝাতে চাই ওই মহিলার কিছু হয়ে গেলে থানা পুলিশ হবে। বলি,
- সূর্য, মনির সাথে ওর মায়ের সামনেই আমরা কথা বলি চল।
সূর্য আর আমি এগিয়ে যাই দিদিমার বারণ সত্ত্বেও।
বন্ধ ঘরের দরজা খুলে যা দেখি তাতে চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। ওই মহিলা অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে। মুখে রক্ত শুকিয়ে লেগে । ঘরে প্রস্রাবের গন্ধ। মনে হয় দরজা বন্ধ বলে ঘরেই করেছে। শাড়িতে বমি মাখামাখি। কোনরকমে তাকে দুজনে ধরে বাইরের উঠোনে নিয়ে আসি। সূর্য খুব রেগে তার দিদাকে বলে ডাক্তারকে ফোন করতে। ততক্ষণে দিদার শোরগোলে দাদু নেমে এসেছিল। পাড়ার লোক উঁকি মারাও শুরু করেছিল। সূর্য প্রায় কেঁদে ফেলে আমাকে জড়িয়ে।
- অবিনাশ, এ কি অবস্থা! এক মাকে ডাইনি নাম দিয়ে এত অত্যাচার! অথচ দেখ বাইরে আর এক মাটির মা আসবে বলে কত তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে!
আমি ওকে শান্ত করি। সূর্যর দিদা ততক্ষণে দোতলার ঘরে চলে গেছে। আমি পিছন ফিরে প্রতিবেশীদের ভিতরে ডাকি আর জিজ্ঞেস করি এই মাসিকে নিয়ে ওরা তেমন কিছু জানে কিনা? কিন্তু প্রত্যেকেই বলে ডাইনি না হলে নিজের মেয়েকে এমন কেন করলো! আমি খুবই অবাক হই। সূর্যর দাদুর বাড়ি অশোকনগরে একটু ভিতর দিকে। কিন্তু আশেপাশে স্কুল আছে। চারপাশের মানুষ মোটামুটি শিক্ষিত বলা চলে তা সত্ত্বেও সাধারণ মানুষ কি করে এত বুদ্ধিহীনতার পরিচয় দিল? বিশেষ করে সূর্যর দিদা! আমার ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছিল সূর্যকে দেখে। ম্লান মুখে বসেছিল সে। আমি ব্যাগ থেকে জলের বোতল নিয়ে দিলাম,
- একটু জল খা সূর্য।
-কিছু ভালো লাগছে না রে। দাদুর কি অবস্থা দেখেছিস! দিদার এমন ভিমরতি কি করে হলো ঠিক বুঝতে পারছিনা! এখন শেষরক্ষা হলে হয়!
- দাদুভাই, এসব আমারই ভুল। তোর দিদা কিছুদিন হল পাড়ার দক্ষিণ কোণে যে শনি মন্দির আছে সেখানে যাচ্ছিল। ওখানকার পুরোহিতটি নাকি দিদার দীক্ষার ব্যবস্থা করবে। প্রথমে বারন করেছিলাম কিন্তু পরে আর আটকাইনি। ভেবেছিলাম পুজো নিয়ে থাকলে দিদার মনটা ভালো থাকবে। তখন বুঝিনি এ পুজো ভক্তকে চায় না আসলে এ হলো ভক্তির আড়ালে চরম ভন্ডামী। ওই মানুষটাই বোধহয় দিদার মাথায় এসব কুসস্কার ঢুকিয়েছে। নয়তো তোর দিদা হুট করে কেন বদলে গেল!
-তুমি চিন্তা করো না দাদু আমি একটা ব্যবস্থা করবো। সবচেয়ে আগে মাসির ঠিক হওয়া প্রয়োজন।
সূর্য জল খায়। ওপরে তাকায়। দিদাকে দেখতে পায় না। দাদুর চোখে মুখে অপরাধবোধ। একদিন কেটে গেছে। মাসিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। সে এখন বেশ খানিকটা সুস্থ। কিন্তু মনির মুখ থেকে একটা কথাও বের করা যায়নি। কি লুকোচ্ছে সেটা কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না। এখন মাসির জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া কোনো গতি নেই। দিদা এরমধ্যে নিচে নামেনি। ওপরেই তার খাবার দেওয়া হয়েছে। আমি আর সূর্য ওই শনি মন্দিরেও গিয়েছিলাম পুরোহিতের খোঁজে কিন্তু তাকে পাই না। মন্দিরের ঠিক উল্টোদিকের বাড়িতে খোঁজ নিয়ে জানতে পারি মন্দির কয়েকদিন খোলেনি। একটা আশঙ্কা কাজ করেছিল মনের মধ্যে ঠিক যেদিন মনির সাথে এমন হলো তারপর থেকেই কি মন্দির বন্ধ? কিন্তু উত্তর অজানা! দুদিন পর রাতে দিদার কান্নার শব্দে ঘুম ভেঙে যেতে সূর্যকে ডাকলাম। দুজনে ওপরে গিয়ে দেখি দাদুর বুকে মাথা রেখে দিদা খুব কাঁদছে আর দাদু সান্ত্বনা দিচ্ছে। আমাদের দেখে দাদু সূর্যকে বলে,
-তোর দিদাকে ক্ষমা করবি তো দাদুভাই, না বুঝে একটা ভুল করে ফেলেছে।
সূর্য তার দিদার দিকে তাকায়। দিদা বলতে থাকে,
-আসলে মনির মায়ের জ্বর কমছিল না। তোর দাদু জানে ওকে আমি ডাক্তার দেখিয়েছিলাম কিন্তু কোনো ওষুধে কাজ হচ্ছিল না। তারপর দাদুকে না জানিয়ে ওই পুরোহিতকে বলেছিলাম সে কথা। উনি বললেন সেদিন রাতে এসে দেখবেন ওকে। বিশ্বাস কর আমি বুঝিনি ও কত বড় ভন্ড। মনিকে দেখে বলল ওর মায়ের সারা শরীরে বিষ আর তার প্রভাব পড়ছে মনির ওপরেও। আমি ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করেছিলাম এর থেকে বাঁচার উপায় তখন সে বলেছিল মনির মা আসলে একটা ডাইনি, তোর দাদুকেও ছাড়বে না। আমি খুব ভয় পেয়ে গেছিলাম।
তখন বলল মনির শরীর থেকে এই বিষ বার করতে হবে। আমার তো বয়স হয়েছে বোধ বুদ্ধি লোপ পেয়েছে। তারপর ওই লোকটা মনিকে জড়িয়ে ধরে ওর জামা ছিঁড়ে কামড়াতে শুরু করেছিল। মনির মা অসুস্থ ছিল কিন্তু তাও বাচ্চাকে লালসার স্বীকার হতে দেখে সহ্য করতে না পেরে ওকে বাঁচাতে এসেছিল। কিন্তু ভন্ডটা ওর মুখে সজোরে ঘুষি মারে, ও ওখানে পড়ে যায়। লোকটা আমাকে শাসায়, বলে আমি যদি মুখ খুলি তাহলে তোর দাদুকে মেরে দেবে।
সূর্য দিদার হাত ধরে বলে,
- মাসি তো আগে থেকেই জীবনে বঞ্চনার স্বীকার। শুধু মনির মা হয়ে বেঁচে আছে। এক মা হয়ে আর এক মাকে তুমি এমন করলে কি করে দিদা! ভাবো যদি মাসির কিছু হয়ে যেত!
- আসলে পরিবারকে বাঁচাতে 'ডাইনি' শব্দটাকেই আশ্রয় করেছিলাম।
- ওরা আমাদের পরিবারেরই দিদা! এই ডাইনি আখ্যান তো কাল্পনিক, মানুষের নিজের স্বার্থে।
দিদা মনিকে জড়িয়ে ধরে। মনির মুখে হাসি ফুটে ওঠে। বাইরে যখন মায়ের আবহনের জন্য সবাই প্রস্তুত হচ্ছিল আমরা আর এক মাকে ফিরে পাওয়ার জন্য প্রার্থনা শুরু করেছিলাম। এই ঘটনার একবছর কেটে গেছে। মাসির মত কত মহিলার এমন দুর্দশা হয় ভেবে শিউরে উঠি আজও। ভক্তি ভক্তকে কখনোই পাষাণ তৈরি করে না বরং তাকে বিনম্র করে। এখনও সেই পুরোহিতের খোঁজ চলছে আর সূর্যর কাছে খবর পেয়েছিলাম সেই মন্দিরে অন্য এক পূজারী পুজো করেন...আরতির সময় নাকি অনেকে আসেন পূজারীর মন্ত্র উচ্চারণে মুগ্ধ হয়ে।
------------------------------------------------------------------
একটুখানি খোলা আকাশ দেখার সৌভাগ্য যে কবে হবে! নির্মল দীর্ঘশ্বাস ফেলে...সব সুখ বিলীন হয়ে গেছে মৃন্ময়ীর সাথে। মনে আনাগোনা করে মৃন্ময়ীর সাথে...