একটা প্রাসাদ সমান বাড়ি চৈতির সামনে। তার মায়ের মামার বাড়ি, প্রতি বিশ্বকর্মা পূজোয় চৈতি আসে মা বাবার সাথে। শ্যামবাজার পাঁচ মাথার মোড়ে একটা গলির মধ্যে ঢুকলে কিছুটা গেলেই সেই বাড়ি। বনেদি বাড়ি পাঁচতলা উঁচু। তার ছাদে পূজোর আয়োজন হয়। আর অনেক লোক আসে তাই খাওয়াদাওয়া সবকিছু নিয়ে এলাহী ব্যাপার। চৈতি বছর দশেকের একটা মিষ্টি মেয়ে। এবছর চৈতির সাথে একজন নতুন মানুষের আলাপ হয়, চৈতির মা পরিচয় করিয়ে দেয় একজন খুব বেঁটে কিন্তু মিষ্টি দিদার সাথে আর বলে - চৈতি, এই তোমার মিনিআম্মা। চৈতির সাথে কিছুক্ষণের মধ্যেই খুব ভাব হয়ে যায় মিনিআম্মার যে আসলে চৈতির মায়ের মাসি। চৈতি ভাবে এত ছোট্ট মানুষ তাই বোধহয় নামের আগে মিনি, খুব হাসি পায় চৈতির। সেটা বুঝতে পেরে মিনিআম্মা আলাপ করিয়ে দেয় দাদুর সাথে। ওমা, কি কান্ড! চৈতি দেখে দাদু কি বিশাল লম্বা। চৈতির চোখের পলক পড়ছে না দেখে মিনিআম্মা হেসেই বাঁচে না। এরমধ্যেই চৈতি বুঝতে পারে ওদের কোন সন্তানাদি নেই। দাদু কাজ করতো আর্মিতে, সময়ের আগেই অবসর নিয়ে এখানে মা এর মামারবাড়ির পাশেই একটা বাড়ি ভাড়া নিয়ে আছে দুজনে মিলে, আসলে কাছের মানুষদের সঙ্গ পাওয়ার ইচ্ছে। মিনিআম্মা মানুষটি খুব হাসিখুশি সবার সাথে গল্প করতে খুব ভালোবাসে। একফাঁকে সব বাচ্চাদের নিয়ে নিজের বাড়িতে গিয়ে সব্বাইকে চকোলেট আর রসগোল্লা খাইয়ে তবে শান্তি পেল সে। সারাদিন অনেক আনন্দ করে চৈতি রাতে বাড়ি ফিরে আসে ওই নতুন মানুষটির স্মৃতি নিয়ে। বন্ধুদের সাথেও গল্প করে চৈতি তার মিনিআম্মার মজার মজার কাহিনী নিয়ে । এভাবে আরও চার বছর পূজোয় চৈতির অনেক ভালো সময় কাটে মিনিআম্মা আর দাদুর সাথে। হঠাৎ একদিন সে শোনে দাদু আর নেই। সকালে হাঁটতে গিয়ে স্ট্রোকে সব শেষ। চৈতি তার মা বাবার সাথে যায় মিনিআম্মার বাড়ি, কত লোক তার মাঝে তার মিনিআম্মা পাথর হয়ে বসে। চৈতি এই সময়টা বোঝার জন্য অনেকটাই ছোট তবু সে এটুকু বুঝলো তার মিনিআম্মা একা হয়ে গেল। দাদুর শ্রাদ্ধের দিন অবধি তারা রোজ যাতায়াত করলো। এরপর বেশ কিছুদিন কেটে গেল চৈতি এখন তাঁর আগের জীবনযাত্রায় ব্যস্ত। এর মধ্যেই একদিন সন্ধ্যাবেলা চৈতি শোনে তার বাবা মা আলোচনা করছে মিনিআম্মাকে সাহায্য করার জন্য। মা অনেক শিখিয়েছে কারোর কথা আড়ি পেতে শুনতে নেই , অন্যায় জেনেও চৈতি আজ নিজেকে আটকাতে পারলো না, সে দরজার পাশে দাঁড়িয়ে পড়লো। অনেক কথা শুনে চৈতি যা বুঝলো তা হলো- দাদুর জমানো কোনো টাকাপয়সা নেই। মিনিআম্মার গয়না বেচে দাদুর কাজ হয়েছে এখন সবাই মিলে প্রতি মাসে সাহায্য করলে মিনিআম্মা দুটি ডাল ভাত খাবে। চৈতির খুব কষ্ট হলো - সে যদি আরও বড় হতো, চাকরি করতো তাহলে তার সবটা মিনিআম্মাকে দিতে পারতো সে। চৈতির খুব মন খারাপ হয়ে যায় মিনিআম্মার কথা ভেবে, তার তো আর কেউ নেই। দাদুর ওপর খুব রাগ হলো তার। একদিন মাকে জিজ্ঞেস করলো সে,আচ্ছা মা তোমরা যে বলতে দাদু আর্মিতে ছিল! মা বললো- হ্যাঁ রে। দাদু অনেক বছর ছিল আর্মিতে কিন্তু ওদের কোনো সন্তান ছিল না তো তাই নিজেদের জন্য সামান্য কিছু রেখে জীবনের উপার্জিত বাকি সবই ওরা দিয়ে দিয়েছে অনাথ আশ্রমে। চৈতির চোখে জল এসে গেল, সে ছুটে ছাদে চলে গেল ... নিজের মনে বললো দাদু, তুমি কেন এমন করলে? মিনিআম্মার কি হবে এখন! তোমরা নিজেদের কথা একটুও ভাবলে না ....চৈতির ছোট্ট মনে কত প্রশ্নের ঝড় ওঠে, সে ভেবে পায়না কিভাবে তার মিনিআম্মার দুঃখ দূর করবে? চৈতি এখন এম.বি.এ পড়ছে, দিল্লীতে থাকে। অনেক ব্যস্ততায় মিনিআম্মার কথা তার আগের মতো মনে পড়ে না। তবে মা বাবার সাথে ফোনে কথা হলে মাঝে মাঝে খবর নেয় সে। একদিন মা খুব কাঁদলো চৈতির কাছে বললো- ছোটমাসীকে দেখতে গিয়েছিলাম, মাসী ১০০০ টাকা ধার চাইল ঘরে একটুও চাল নেই বলে। চৈতি, আমার মামারা কেমন মানুষ রে! একটা বোন রয়েছে ওদের পাশে একটু দেখতে পারে না? ওরা কত বড়লোক কিন্তু ওদের মনটা মরে গেছে। চৈতির মনটা ভেঙ্গে গেল অনেক দিন পর পুরোনো কথা মনে করে। সে ভাবে তাড়াতাড়ি পড়াশোনা শেষ করে একটা ভালো চাকরি পেলে বাবা মা কে সাহায্য করতে পারবে সে, এখন অনেক কিছু মা বাবার ইচ্ছে হলেও তারা করতে পারে না, আসলে চৈতির লেখাপড়ার খরচও তো অনেক। বছর খানেক পর দুর্গা পূজোর ছুটিতে চৈতি যখন বাড়ি আসে, তখন একদিন মাকে বলে- চলো, মিনিআম্মাকে দেখে আসি। কিন্তু মা এড়িয়ে যায়। চৈতি একটু অবাক হয়ে যায়! যাইহোক মাকে আসল কথা না বলে সেদিন দুপুরে একটু মিথ্যে বলেই সে বেরিয়ে পড়ে। মাকে বলে, বন্ধুদের সাথে বেরোচ্ছি কিন্তু আসলে সে যায় তার মিনিআম্মাকে দেখতে। গিয়ে অবাক সে! যে বাড়িতে মিনিআম্মা ভাড়া থাকতো বাড়িভাড়া দিতে না পারায় সেখান থেকে সে বিতাড়িত হয়েছিল তারপর নাকি সে থাকতো ভাইদের বাড়ির নিচের একটা ছোট ঘরে। সেই মামাদাদুদের বাড়ি চৈতি আর ঢুকলো না,ভাবলো থাক মা কে না বলে এসেছি কি দরকার? সে বেরিয়ে আসে বড় রাস্তায়। চারিদিকেে পূজো পূজো রব। বিকেল হয়ে যাওয়ায় রাস্তায় আলো জ্বলে উঠেছে। মা দুর্গা আসার আগে থেকেই শহরটা এত সুন্দর সেজে ওঠে যে তার মধ্যে নিজেকে মনে হয় এক রূপকথার রাজ্যের রাজকুমারী। তবু মনটা বিশেষ ভালো না থাকায় একটু আনমনে হাঁটতে থাকে সে। বাড়ি ফেরার বাসটা এলেও ছেড়ে দেয় সে, আসলে চৈতি মত পরিবর্তন করে। ভাবে, দেখাই যখন হলো না তখন একটু ঘুরে নি। খানিকটা এসে সেন মহাশয় মিষ্টির দোকান, এই দোকানের মিষ্টি তার খুব প্রিয়। দোকানে ঢুকতে যাবে, ঠিক তখন দেখে দোকানের পাশের কোণে ডানদিকে কে যেন বসে আছে, তার খুব চেনা। বুকটা কেমন মুচড়ে ওঠে চৈতির- ধীর পায়ে এগিয়ে যায় সে। সামনে গিয়ে দাঁড়ায় চৈতি, আর একটা হাত উঠে আসে তার দিকে -একটা চেনা স্বর কানে আসে "দুটো ভিক্ষা দেবে" ........ চৈতির শরীরটা গুলিয়ে ওঠে সে বসে পড়ে ওখানেই। তারপর দুদিন কেটে গেছে চৈতির, হাসপাতালে তার মিনিআম্মাকে নিয়ে। চৈতির মা বাবাও আছেন। মা ক্ষমা চেয়েছিল চৈতির কাছে, তাঁর মাসিকে তার মামারা বের করে দিয়েছে বাড়ি থেকে সে কথা লজ্জায় চৈতির থেকে লুকিয়েছিল বলে। চৈতির সাথে যেদিন মিনিআম্মার দেখা হলো সেদিন তার গা জ্বরে পুড়ে যাচ্ছিল, কদিন খাওয়া জোটেনি কে জানে! চৈতির মুখ দেখেও চিনতে পারেনি ওকে! চৈতি ভাবে সেদিন তার সাথে মিনিআম্মার দেখা না হলে কি হতো! আসলে মা বোধহয় এমন করেই আসেন..কখনো কন্যা রূপে, আবার কখনোবা দেবী রূপে। আজ চৈতি যেন সেই দেবী রূপেই আবির্ভূত হলো মিনিআম্মার জীবনে। সেই মিনিআম্মা যে চকোলেটের বাক্স নিয়ে ঝগড়া করত, টুকরো টুকরো হাসিতে ভরিয়ে রাখত চৈতিকে আজ তার নিঃস্ব অবস্থা সেই মহাকালকেই মনে করায় যার অস্তিত্ব আমাদের জীবনে সর্বব্যাপী কিন্তু আমরা তাকে দেখেও না দেখার ভান করি। এই বিপর্যয়ের ফলাফল মনে প্রভাব ফেলে কিন্তু সময়ের সাথে আমরা তাকে পিছনে ফেলে অনেক এগিয়ে যাই, যেখান থেকে অতি প্রিয়জনের সামান্য ইচ্ছেটুকুও বেমানান আমাদের বিলাসবহুল জীবনে। চৈতি ভাবে, মা দুর্গা সবার মনে ভালোবাসার রেশটুকু ছড়িয়ে দিতে পারেনা কেন? পূজো শেষ হওয়ার সাথে সাথে কেন মাটির ঠাকুরের সাথে সব সত্যি, সব সত্ত্বার বিসর্জন হয়! মা দুর্গা এই সমাজ থেকে অনেক বড় তবু সে কেন শুধুই পূজোর মূর্তি হতে বাধ্য হয়! চৈতি স্থির করে, সে আর থেমে থাকবে না। অন্ধকারের মা দুর্গাদের যথার্থ সম্মান দেবে সে। চোখের জল মোছে সে। অবশেষে বিজয়া দশমীর দিন এসে গেল। আজ চৈতি দিল্লী ফিরে যাবে, মন চাইছে না কিন্তু উপায় নেই। চৈতির মা বাবা কথা দিয়েছে মিনিআম্মা সুস্থ হওয়া অবধি ওরা ওকে হাসপাতাল থেকে এনে তাঁদের কাছে রাখবে। আর চৈতি এর মধ্যেই অনেক এন জি ও এর সাথে যোগাযোগ করেছে, তার মধ্যে একটা হলো "কুসুমকলি" এখানে অনাথ বাচ্চারা থাকে। সেখানে মিনিআম্মার মতো মানুষেরা চাইলে বাচ্চাদের দেখাশোনায় সাহায্য করতে পারে। চৈতি এখানেই তার মিনিআম্মার ভবিষ্যৎ ঠিক করেছে - তাঁর মিনিআম্মা শেষ জীবনটা সসম্মানে বাঁচবে, নিজের রোজগারে নিজে খাবে আর চৈতি তো আছেই তাঁর নিয়মিত খোঁজ নেওয়ার জন্য। খুব নিশ্চিন্ত মনে চৈতি ট্রেনে উঠে পড়ে সুদূর দিল্লীর উদ্দেশ্যে সেই প্রথম দিনের মিনিআম্মার প্রাণোচ্ছ্বল হাসিটা মনে করে - মিনিআম্মা তুমি আবার হাসবে, নতুন ভাবে বাঁচবে, দাদু তুমিও দেখো ওপর থেকে আমার মিনিআম্মা মহামায়ার মত কত সন্তানের জননী হবে। মা হওয়ার কোনো বয়স হয় না। চৈতি নিশ্চিন্তে শুয়ে চোখ বন্ধ করে। চোখের সামনে ভেসে ওঠে মা দুর্গার বিসর্জনের মুহূর্তটি কিন্তু এক নিমেষেই মনে হয় আর এক মা দুর্গার আবির্ভাব তাকে শিউলির সুগন্ধ দিয়ে যাবে আগামী দিনেও....ট্রেন চলতে থাকে জীবনের গতির সাথে তালে তালে মিলিয়ে.... কু ঝিক্ ঝিক্।।

No comments:
Post a Comment