Friday, April 16, 2021

ভালোবাসার বাক্স....নীলাঞ্জনা সরকার

 


ছোট কাঠের বাক্সটা বেশ পুরোনো কিন্তু সুন্দর নকশা কাটা। মনোতোষ দুদিন হলো উটি বেড়াতে 
এসেছে। রাত গভীর হতে শুয়ে পড়লো সে। অন্ধকার ঘরে কেমন মিষ্টি একটা গন্ধ, রুপার প্রিয় রবীন্দ্রসংগীত ভেসে আসছে- "আমার মল্লিকা বনে"...সেই আকর্ষণীয় হাসি! আজকাল মনোতোষের 
মন কেমন করে না, হারিয়ে যায় না সে। তবে কি যেন একটা কুরে খায় ওকে! কতদিন নিজের পছন্দের আফটার শেভটাও ছুঁয়ে দেখেনি। রুপাকে ব্যস্ত করতে চায় না বলে ঘরে চুপচাপ নিজের মত বসে থাকে। 
           রুপার সাথে মনোতোষের সম্বন্ধ করে বিয়ে হয়েছিল। ফুলশয্যার রাতে শুনেছিল নতুন বউয়ের মুখে, সে নাকি জীবনে খুব বেশি পুরুষের সংস্পর্শে আসেনি। বাড়ির অনুশাসনে বাঁধা ছিল সবকিছু। গার্লস স্কুল, কলেজে পড়া এবং হোটেল -রেস্টুরেন্ট যাতায়াত অভিভাবকের সাথেই। টিউশন থেকে ফিরতে একটু রাত হলে কৈফিয়ত দিতে হতো রুপাকে বাড়িতে। কিছুক্ষণ নির্বিকার ছিল মনোতোষ সব শুনে। সেদিন বউকে সোহাগ করেনি....বরং বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়েছিল। তবে সেটাই বোধহয় মস্ত ভুল ছিল। মনোতোষ প্রায়ই ভাবে, যদি সে একটু তলিয়ে দেখতো তাহলে সহজেই পরিষ্কার হতো মিথ্যেগুলো কারণ দুদিন পরেই ভালোবাসার প্রথম রাতে রুপা খুব অবাক করেছিল মনোতোষকে তার নিপুণ আঙুলের খেলায়। তবু নিজেকে শান্ত করেছিল মনোতোষ  নিজের ভুল ভেবে। এক বছর পর মনোতোষের মা চলে গেলেন তাকে ছেড়ে। বাবা আগেই অমৃতের পথে যাত্ৰা করেছিলেন, মনোতোষ 
তখন ক্লাস এইটের ছাত্র। মা রুপার হাতে দিয়ে গেলেন তার প্রিয় কাঠের বাক্স। মাকে দিয়েছিলেন মনোতোষের ঠাকুমা। ওটি আসলে দাদুর দেওয়া প্রথম উপহার ছিল মনোতোষের ঠাকুমাকে। রুপা সবসময় আগলে রাখতো বাক্সটা। মনোতোষ ধীরে ধীরে ক্ষমা করে দিয়েছিল স্ত্রীকে। কিন্তু ওই বাক্সটাই একদিন সত্য উপড়ে আনলো। কত রঙিন চিঠি ছিল ওতে.... ছিল কত ভালোবাসার লাইন! খুব লড়াই করেছিল মনোতোষ নিজের সাথে, সত্যের সাথে। কিন্ত সময়ের সাথে ক্লান্ত হয়ে মানিয়ে নিয়েছিল সে। আর তেমন কিছু বলতো না রুপাকে তবে সাথ ছাড়েনি সে স্ত্রীর। সেই ভেবেই ওদের সাথে উটি আসা। 
ওরা লীলাখেলায় মত্ত হতো আর মনোতোষ চোখের জলকে ভাসিয়ে দিত।
            তবে, আজ যখন দেখলো রুপাকে ব্যবহার করতে চাইছে তার প্রেমিক..তখন আর চুপ থাকতে পারলো না মনোতোষ। একটু নিজেকে নতুন ভাবে পেতে ইচ্ছে হলো মনোতোষের। আর কতদিন এভাবে....নাহ! একটু তো নিজের খুশির কথা ভাববো। বিছানা থেকে উঠে পড়ে সে, এগিয়ে যায়। মনোতোষ জানে তার শরীরটা আর আগের মত নেই...শুকিয়ে গেছে, শক্তি নেই। চাইলেও অনেক কিছু করে উঠতে পারে না সে। তবু একটা শেষ চেষ্টা। লোকটা পালিয়ে গেল। ভালোই হয়েছে। রুপার কাছে ফিরে আসে মনোতোষ। দেখে রুপার দেহটা....চোখ দুটো বিস্ফোরিত! যেন কিছু দেখে ভয় পেয়েছে! হার্টফেল করেছে রুপা। খানিকটা বিমর্ষ হয় মনোতোষ, যেদিন প্রেমিকের সাথে মনোতোষের গলা টিপে ধরেছিল রুপা...ঠিক এভাবেই দমবন্ধ হয়ে চোখ ঠিকরে বাইরে বেরিয়ে এসেছিল তার। পোস্টমর্টেম হলো, আদালতের তারিখ পড়লো বেশ কিছু কিন্তু রুপা ডোমেস্টিক ভায়োলেন্সের দোহাই দিয়ে বেঁচে গিয়েছিল। আদালতে প্রমাণ হয়েছিল সে সেল্ফ ডিফেন্সের জন্য স্বামীকে বাধা দিয়েছিল আর তাতেই মনোতোষের অ্যাক্সিডেন্টাল ডেথ।
          রুপার প্রেমিক সেও হয়তো ছিল কারও মনের মানুষ। আচ্ছা, ওরা কি কেউ প্রেমের প্রকৃত অর্থ বুঝতো! ওই কাঠের বাক্সটা আর কোনও কাজে আসবে না। রুপা উটি এসেছিল সাথে ঐ বাক্স ভর্তি গয়না নিয়ে.... বোধহয় ভেবেছিল আর ফিরবে না। মনোতোষ স্পর্শ করতে চায় ওই বাক্স, কিন্তু পারে না। বাক্স তো নিমিত্ত মাত্র মনোতোষ তো সুখটাকেই ছুঁতে পারলো না। বাক্সটা বরাবরই ছিল ভালোবাসার কিন্তু হাত বদলে সেই সম্পর্কের অর্থ বদল হলো। হোটেলে দোতলার ঘরটির বারান্দায় আসে মনোতোষ....বেশ ঠান্ডা মনে হয়! নীচে সবাই শরীরে অনেক কিছু চাপিয়েছে। কিন্তু তার আর এসবের প্রয়োজন হয় না। হিমশীতল মর্গে দুদিন থাকার পর থেকে এই ঠান্ডায় কিচ্ছু মনে হয় না তার।

1 comment:

  1. খুব ভালো লাগলো
    আমি @ভালোবাসার_খোঁজে

    ReplyDelete

প্রেম ডট কম... নীলাঞ্জনা সরকার

  একটুখানি খোলা আকাশ দেখার সৌভাগ্য যে কবে হবে! নির্মল দীর্ঘশ্বাস ফেলে...সব সুখ বিলীন হয়ে গেছে মৃন্ময়ীর সাথে। মনে আনাগোনা করে মৃন্ময়ীর সাথে...