Sunday, July 11, 2021

মনুষ্যত্ব গ্রাফ...নীলাঞ্জনা সরকার

 



নৌকায় বসে ওপর দিকে তাকালো বাউল ঝাঁ ঝাঁ রোদ- চোখের ওপর, কোন জন্মে ফুটো হয়ে যাওয়া উত্তরীয়টা চাপা দিল। কোনো এক জমিদার বাড়িতে গান গেয়ে উত্তরীয়টা উপহার পেয়েছিল। আশেপাশে অনেক লোক, সবাই তাকে চেনে না কিন্তু মাঝি তাকে চেনে, বাউল প্রায়ই নৌকায় যাতায়াত করে যে তাই। মাঝির গায়ের জামাটা ঘামে জবজবে তাই নিয়েই সে নৌকা টানছে। বাউল গুনগুন সুরে গান ধরলে সবাই তার দিকে তাকায়। মাঝি তখন বলে ওঠে বাউল কে,
-ও পরান পাগল, গাও গাও জোরে গাও, সবাই শুনুক।
পরান পাগল নাকি খালি প্রাণের গান গায় তাই তার এই নাম। সে গান ধরে-         

দেউলিয়া মন যে আমার-
বাঁশি খোঁজে কানাইয়ের,
আজ- বাঁশি খোঁজে কানাইয়ের।
এপারেতে নিরস পিঞ্জর, ওপারেতে-
পাখি আমার পিরিতির ভুলভুলাইয়াতে।
মন- বাঁশি খোঁজে কানাইয়ের।
বাউল আমি মনের দাস, উৎসবে দি প্রাণের ডাক..
জন্মাষ্টমীর পিদিম পাশে তাই বক্ষে আমার কৃষ্ণ সাজে,
আজ কণ্ঠ আমার মুক্তির খোঁজে আর সর্বনাশা বিষয় আমার অঙ্গে জ্বালিও না।
এ মন যে শুধু বাঁশির টানে -

 -বাপ ঠাকুর জল আছে? একে তো চড়া রোদ তায় গান গাইতে বললে।
পরানের কষ্ট দেখে এক সহযাত্রী জল দেয় আর বলে, থাক গো বাকি পরে গেও।
পরান চুপ করে বসে, আজকাল গান গাইতে কষ্ট হয় তার কিন্তু পেট চলবে কি করে তাই উপায় নেই। শ্বাস ফুলে ওঠে গান গাইলে, চোখটা ছলছল করে ওঠে তার। গেল বছর বউটা মরেছে, চোখের সামনে ভেসে ওঠে তার মুখ, বউ বলতো..
- ঠাকুর, আমায় মা বানালে না? কাকে নিয়ে থাকবো আমরা বুড়ো বয়সে? 
এখন সেই সময় পরানের, একাকিত্বের। গান গেয়ে ঘরে ফিরে চাল ফুটিয়ে খায়। তবে সুনাম আছে পরানের গানের, এখনো কত জায়গা থেকে ডাক আসে তার। নৌকার মাঝির দিকে তাকায় পরান, ভাবে কি নিরলস পরিশ্রমের ফল তার প্রতিদিনের দুমুঠো ভাত। এই মাঝির সাথে তার অনেকদিনের আলাপ, এমনও হয়েছে যে পরানের কাছে পারাপারের টাকা নেই কিন্তু মাঝি তাকে মানা করেনি উপরন্তু বলেছে পরান তুমি গান ধরো আর আমি হাল। তোমার গানের সুরে আমার মন এত হালকা হয়ে যায় যে বুঝতেই পারি না কখন নৌকা করে নদী পার করে ফেলি।
পরান ভাবে সে যখন বড় মানুষ হবে তখন এইসব মানুষগুলোকে কক্ষনো ভুলবে না। বরং বার বার ফিরে ফিরে দেখবে এই স্মৃতিগুলোকে....

ধূপছায়া, ভাললাগা সব বেমানান।
প্রজাপতির আদুরে ডানায় ভাঙা মন শুধু বলে যায়
ভালো থেকো...
মনে রেখো...
ভুলোনা আমায়।।
আজ সব ভ্রান্ত আমার কাছে
লালিত স্বপ্ন, নিরুদ্দেশের সন্ধান সব বেমানান
গোধূলিবেলায় আগুন পাখি এসে শুধু বলে যায়
কষ্ট দিয়ে...
সুখে থেকো...
বোলোনা আমায়।।

 পরানের গ্রামে একবার শ্যামলীর বেটা এসেছিল শহর থেকে, সে বলে গেছে, পরান কাকার গলা এত সুন্দর যে তার জীবন নিয়ে একটা ফিল্ম হওয়া উচিত। কত লোকের জীবন নিয়ে ফিল্ম হয়েছে আর এ তো আমার গাঁয়ের কাকা। সেই বেটা শহরে নাকি কোন দলের বাজনা বাজায়। 
হঠাৎ মাঝির ডাকে সম্বিৎ ফেরে বাউলের, ঘাট এসে গেছে নামতে হবে। কাল একটু বৃষ্টি হওয়ায় সামনে একটু কাদা, পরান আস্তে আস্তে পা ফেলে আর ভাবে কে বলবে কাল ইন্দ্রদেব সদয় হয়েছিলেন! আজ দেখো সূর্যদেবের দাপটে তিনি ঘরে গিয়ে দোর দিয়েছেন। পা কাদায় মেখে যায় একটু জল খোঁজে পরান- এদিক ওদিক তাকায়। নদীর জলে ধুতে গেলে তো আরও কাদা মাখতে হবে। তার চেয়ে সে ভাবে- গ্রামের দিকে এগিয়ে যাই জলের ব্যবস্থা ঠিক হবে।

  পোড়া পোড়া গন্ধে শ্যাওলা ইটের ভাঙ্গন, 
  পিরিতি বৃথা- মনে যদি পলাশে ধরে আগুন,
  অসীমে অনন্তে অঞ্চল ছাড়িয়ে ধোঁয়াশা
  সে বড় অনাদরে পালিত যেন -
  বিষবৃক্ষের শাখা।
 পোড়া পোড়া গন্ধে লাল পেড়ে শাড়িতে উন্মাদনা
 মায়ের জন্ম বৃথা- মন যদি হয় আশ্রিতা
 কলঙ্ক স্বপ্নভঙ্গ সব সত্য সব অনর্থ, যেন-
 লাভার লোলুপ শিখা।।
     
বটগাছটার নিচে বসে পরান.... বউটার কথা মনে পড়ে তার। খুব কষ্ট হয়েছিল বউটার যখন গায়ে আগুন দিলো, পরান তখন রাসের পুজোয় গান গাইতে গেছিল পাশের গ্রামে, যখন খবর পেয়েছিল সব শেষ। বউ ছাড়া কেউ ছিল না তার। পোলাপান নেই বলে বউটাকে কত কথা শুনতে হতো..... শেষে দিল চরিত্রের দোষ, আর সহ্য করতে পারেনি সে। তাই চলে গেছিল পরানকে ছেড়ে। বউটা খুব সুন্দরী ছিল পরানের সাথে ঠিক যেন পাঁকে পদ্ম ফুল। দুজনের ভাবও ছিল খুব। কিন্তু লোকজনের সহ্য হলো না তা। চোখের জল মোছে পরান, ওপরে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে,
-বউ ও বউ আমার কথা একবার ভাবলি না! তোর পরানের ভিতরটা যে খাঁ খাঁ করে, গান ভালো আসে না, নুন লঙ্কা দিয়ে একা একা কত ভাত খাওয়া যায় রে বউ, ও বউ, বউরে.... কান্নায় ভেঙে পড়ে পরান।
নিজের গ্রামে তো বুক ফেটে গেলেও বুকে পাথর চাপা দিয়ে ঘোরে সে- আজ অন্য জায়গায় মন খুলে কাঁদুক সে..... কাঁদ রে পরান পাগল কাঁদ। বট গাছটা ভাবে আহা যদি একটু দুঃখ ঘোচাতে পারতাম ওর। কিন্তু গাছ, হাওয়া, রোদ, মেঘ, পাখি, নদী সবাই অলক্ষে চোখের জল ফেললেও, পরানের গ্রামের নিরুত্তাপ মানুষগুলোর আছে শুধু কটাক্ষ। কখন একটু চোখ লেগে গেছিলো পরানের, হঠাৎ একটা নরম হাতের স্পর্শ... ! পরান চোখ মেলে- তার বিষন্ন মুখে হাসি ফোটে সামনে ছোট্ট এক ঈশ্বর কে দেখে। বাচ্চা তো ঈশ্বরের সমতুল্য- পরান তার গালে হাত দিয়ে বলে,
-তুমি কে গো বাছা?
 ঈশ্বর হাসে। তারপর দৌড় লাগায় আর একটু দূরে গিয়ে তাকে ইশারায় ডাকে। পরান উঠে মন্ত্রমুগ্ধের মতো চলতে থাকে..... একটু পরে সামনে একটি বাড়ির উঠোন পায় সে। বাচ্চাটি সেখানে গিয়ে তার মায়ের কোলে মিশে যায়। পরানকে দেখে উঠে আসে মহিলাটি। বলে, 
- আসেন,বসেন দাদাঠাকুর।
 পিঁড়িতে বসে পরান টুং টুং করে একতারাটায় আওয়াজ করতে থাকে, আর একধামা মুড়ি নিয়ে এসে বসে পরানের ঈশ্বরের মা। পরান জিজ্ঞেস করে,
 -তুমি আমায় চেনো মা?
সে বলে...
-হ্যাঁ গো, তুমি কত ভালো গান গাও। সবাই চেনে, তুমি গেল বার আমাদের গাঁয়ের মেলায় কি ভালো কীর্ত্তন করেছিলে... সে কি ভোলা যায়!
পরান খালি এদিক ওদিক চায় আর বাচ্চাটাকে খোঁজে হঠাৎ বাচ্চাটাকে শক্ত কাঁটাতারের আড়ালে দেখে চমকে ওঠে পরান চিৎকার করে ওঠে- যাসনে!
তার ঈশ্বর ফিরে তাকায় খিলখিলিয়ে হাসে, বছর সাতেক এর ছেলেটি এবার বলে,
- তুমি বাজাও বুঝি? 
- শুনবে তুমি? পরান বলে।
ঈশ্বর দৌড়ে এসে বসে সে বলে,
- আমার মায়ের গান গাইবে?
পরান তার মায়ের দিকে তাকায়। সে হেসে বলে, -ছাড়ুন দাদাঠাকুর, আপনি গান.. আমরা শুনি, কি এমন গান আমার, ও থাক। 
বাউল ছাড়ে না..বলে, 
-কেন রে মা তুই গান ধর আজ, একদিন আমি শুনি। তা এমন ঈশ্বরের নাম কি রেখেছিস মা? 
ফটিক.....গান ধরে ফটিকের মা....

জনম গেল দিবস গেল সুখ ধুলাম না
সাঁঝবাতির আলোয় পেলাম পরশপাথর
সে যে আমার মন ভুলানো, চোখ জুড়ানো..তুই 
হৃদকলমে তোকে হারাবো না..না..না
সুখ ধুলাম না.........
দুঃখ চেপে হাসি যখন বসন্ত আসে তখন
তোর মুখের হাসি, স্নিগ্ধ সাদা ফুল
অঙ্গনে তুই তুলসী প্রদীপ
আমি জীবন লোভী নই.. নই.. নই
আমি সুখ ধুলাম না......
বিষের আশায় বিষয় ভুলি
তোর আঙুলে মনের ক্ষত ভরি-
সে যে আমার মৃত্যু হাসি, ফাঁসের দড়ি
মুগ্ধ কানে হয় সে বাঁশি- যমের ধ্বনি,
শিয়রে যখন তুই....
আমি সুখ ধুলাম না..না..না....
 আমি সুখ ধুলাম না .....

বাউলের একতারা থেমে যায়। 
-মা এমন গান কেনো গো তোমার মুখে?
ফটিক মাকে জড়িয়ে ধরে। বলে,
- জানো গো মা খালি কাঁদে। 
ফটিকের মা বলে,
- কোথায় রে বাপ, এই দেখ হাসছি। 
পরান পাগল ভাবে আমি ভাবতাম আমার দুঃখ ঠাকুর দেখে না কিন্তু এ তো চিরদুঃখী। জিজ্ঞেস করে, -কি হয়েছে গো মা? এ গান তোমার নিজের? এই গলা তো জগৎ কে শোনাবার জন্য গো, তুমি আমার সাথে গান গাইবে?
 -না গো, কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই গো। এ গান, এ জীবন সব বৃথা শুধু ফটিকের জন্য রয়েছি গো।
পরান পাগল ফটিক কে নিজের কাছে টেনে নেয় বলে, 
-তোর বাপ কই রে?
-নেই তো, সবাই বলে, সে জেলে। আমি পাঠশালায় যেতে পারি না গো।
পরানের বুকটা কেঁপে ওঠে। ততক্ষনে ফটিকের মা উঠে গেছে।
- ও মেয়ে.....পরান ডাক দেয়।
- আমায় বলবি কি? মেয়ে বলেছি যখন তার সন্মান দে রে।
- আমার নাম পারুল গো দাদাঠাকুর- ফটিকের বাবা খুন করে জেলে গেছিল গো, তারপর জেলে কিভাবে মরেছে জানিনা- পুলিশ সাহেব একদিন এসে বলল, ফটিক তোর বাপ মরেছে।
পরান পাগল ভাবে এ কোথায় এসে পড়লাম আজ, গান গাইতে এসেছি বটে কিন্তু এরপর গলায় তো কান্না ছাড়া কিছু আসবে না। কাকে মারলো রে তোর বর?  
 ফটিকের মা হেসে ওঠে,
- ও থাক এখন, আপনি দুটি খেয়ে যাবেন তো দাদাঠাকুর? লোকে পাঁচ কথা কইতে পারে। ফটিক, যা বাপ তুই ঘরে যা।
ফটিক সরে গেলে পারুল বলে,
- এ গ্রামের মোড়লকে মেরেছে গো আমার বর, আমার চোখে জল আসেনি গো, বরটা মরলো সে খবরেও জল আসেনি- খুব হেসেছি গো। আমার বর খুব সাহসী। ওই মোড়ল আমার ইজ্জতে হাত দিতে গেছিল।
 পরান কোনো কথা বলতে পারে না, নিজের ওপর লজ্জা হয় তার... ছি! ছি! সে কি তবে তার বউকে ভালোবাসেনি? কই তার রক্ত তো এমন ফোটেনি, মনে হয়নি তো ছুরি চালিয়ে দি সমাজটার বুকে! কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকে পরান, তারপর ফটিকের মায়ের কাছ থেকে ফটিক কে চেয়ে নেয়- বলে, 
-ও মেয়ে তোর ছেলে তো বাড়িতেই থাকে... দিবি আমায় একদিনের জন্য? আমি গ্রামে গান গাইবো ও ঘুরবে আমার সাথে। পারুল খুব খুশি হয় তবে একটু শঙ্কিতও। 
পরান পাগল বলে, 
-যেতে দে রে। ও যে আমার দেখা ঈশ্বর, ও সাথে থাকলে আমার গলায় আরও সুর আসবে, সেই সুরে সুরে মোহিত হবে গ্রামবাসী।
পারুল শেষ অবধি আর কিছু বলেনি। ফটিক চললো পরানের সাথে।
- তুই আমায় দাদু বলিস রে ফটিক। ফটিকের নরম দুটো গালে হাত দিয়ে বলে পরান। 
সে আজ বেজায় খুশি একটা নাতি পেয়ে। পরান হাঁটতে হাঁটতে মাঝে মাঝেই গুনগুন করে আর তাই শুনে ফটিকের কি আনন্দ! মন্দিরে এসে পৌঁছলো পরান। খুব ভিড় হয়েছে পরানের গান হবে বলে। কিন্তু পুরোহিতের চোখ কপালে, 
-কি সর্বনাশ! এ কাকে এনেছো পরান?
-আমার মেয়ের ছেলে গো.. ফটিক। 
ফটিকের দিকে কত চোখের গনগনে দৃষ্টি, ফটিক পরানের পিছনে লুকায়.... তার গায়ের ছেড়া গেঞ্জি আর নোংরা হয়ে যাওয়া ধুতি দেখে সবাই বোধহয় তাকে পছন্দ করছে না! মায়ের ওপর রাগ হয় ফটিকের। 
মন্দিরের পুরোহিত বলে,
- তুমি কি পাগল হলে পরান বাউল, এ তো বিশের ছেলে... একটা খুনির ছেলে ।
 -কে খুনি গো? 
আজ বোধহয় শেষ সুযোগ। পরান ভাবে, তার জীবনের সাথে পারুল, ফটিক কি ভীষণভাবে জড়িয়ে আছে.... আজ যদি ফটিককে শৈশব ফিরিয়ে না দি তাহলে আমার গলার গান বৃথা.... আমার বৌয়ের কাছে ওপরে গিয়ে চোখে চোখ মেলাতে পারবো না। পরান চিৎকার করে বলে,
- কি গো বাবু কে খুনি বললে না তো! আমি তো জানি তোমার ঠাকুর আমায় একটা মেয়ে দিয়েছে সেই মেয়ের ঘরের ছেলে আমার ফটিক। তাই ওকে বুকে করে নিয়ে এলাম তোমার ঠাকুরের কাছে। 
জনতা কানাঘুষো শুরু করে আর পরান পাগল তার ঈশ্বরকে কোলে বসিয়ে গান ধরে......

 আমার হাসি দেখে ভুলিস না
 পরজনম বোধহয় মানিস না 
 মানলে পরে পেতিস খুঁজে.....
 ধুলায় তাকে হারাতি না
 সে যে আমার পরম প্রিয় , বিবেক মধুর
 মানুষ জনম বুঝিস না, রে তোরা 
 মানুষ জনম বুঝিস না-
 আমার হাসি দেখে ভুলিস না।
 যাকে তোরা কৃষ্ণ বলিস-
 আমি তাকে হৃদয় বলি
 সে হৃদয়ে রক্ত সাগর -
 লাল গোলাপের মেকি মালার খবর রাখিনা
 তোরা মানুষ জনম বুঝিস না।।
 আমার হাসি দেখে ভুলিস না.....
বাউল আমি প্রাণের গানে মন ভোলাই
সে মন যে বৃথা-
দলিত যদি আমার মনের রাধা....
    
 ---- মন্দিরের ভিতর থেকে একজন সাদা শাড়ি পরিহিতা বাইরে আসেন। বড় শান্ত তার চোখের দৃষ্টি। পুরোহিত ইশারা করে একজনকে, পরানের ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়ার জন্য, কিন্তু ওই মহিলা থামতে বলেন। পরান গান গেয়ে চলেছে আর দু’চোখ বেয়ে পড়ছে ফটিকের প্রতি তার স্নেহ। তখন ওই মহিলার বুকের ভিতরে ঝড়... সে তো জানে তার চরিত্রহীন স্বামীর কথা কিন্তু তবুও সমাজের ভয়ে তাকে সেই স্বামীর জন্য একাদশী করতে হয়….. বড় হিংসা হয় তার ফটিকের মায়ের ওপর!

  সে মন যে বৃথা যখন আমার মীরা বৃথা
  সে মন যে দুখী যখন আমার রাধা দুখী
  আর তোরা কৃষ্ণপ্রেমের কথা বলিস না।
  আমার হাসি দেখে ভুলিস না,
  তোরা মানুষজনম বুঝিস না।।

ফটিক কাঁদতে শুরু করে, বাউল গান থামায়। ফটিক বলে সে তার মায়ের কাছে যাবে। 
পরান পাগল ফটিককে কোলে তুলে নেয়। মন্দিরের ঠাকুরের ঘরের দিকে তাকিয়ে বলে,
-আমি ভুল ছিলাম রে, তাই এত কাঁদতাম কিন্তু দুঃখ ঘুচত না। আজ বুঝলাম রে... আমার গান শুধু তোর জন্য নয়, আমার গান সবার ঘরে সবার মনে যেদিন পৌঁছে দিতে পারব সেদিন আমি থামবো। আমার শেষদিন অবধি যদি আমার গানে লোকের দুঃখ ঘোচাতে পারি তবেই আমার মানুষ জনম সার্থক। চল ফটিক চল.... 
পরান আর ফটিক চলে এক অজানার উদ্দেশ্যে। পরান ভাবে মেয়েকে নিয়েই গ্রামে ফিরবে। তাকেও সঙ্গে নেবে তার এই ইশ্বর ধর্ম প্রচারের কাজে। যে ঈশ্বর শুধু ধর্মের নয়, যে ঈশ্বর দলিতের নয়, যে ঈশ্বর ক্ষমতার নয়, সেই ঈশ্বরকে পরান ছড়িয়ে দেবে সবার মধ্যে যে একটি শিশুর হাসির মতো নিষ্পাপ, ফোটা ফুলের মতো সুন্দর আর পান্তা ভাতের মতোই অমৃত।। আমাদের পরানের জন্য অনেক শুভকামনা..... এগিয়ে যাও তুমি পরান।

 দম্ভ কলঙ্কিত ধূসর কালো বিবেক
 সে দাগ গরলের চেয়েও অধিক দাগি।
 অথৈ জলের অগ্নিমানব জানে করতে পান-
 জানে মিটাতে সে দাগ।
 কি তার সংসার, কিসে তার প্রাণ-
 হতে হবে নীলকন্ঠ- হতে হবে বিশ্ব,
 প্রতিটি গহন মনের নগ্নতা মুছিয়ে
 আঁকবে সে মনুষ্যত্ব গ্রাফ।।

----------------------------------------------------------------- 

3 comments:

প্রেম ডট কম... নীলাঞ্জনা সরকার

  একটুখানি খোলা আকাশ দেখার সৌভাগ্য যে কবে হবে! নির্মল দীর্ঘশ্বাস ফেলে...সব সুখ বিলীন হয়ে গেছে মৃন্ময়ীর সাথে। মনে আনাগোনা করে মৃন্ময়ীর সাথে...