Monday, June 20, 2022

ডিসলাইক...নীলাঞ্জনা সরকার

 



মিতা এখন অবসরে গান গায়। গত দুবছর হলো স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা পদ থেকে অবসর নিয়েছে সে। ভোরবেলা চায়ের জল ফুটতো আর সে ভাবতো আজ কি করবে! এমন বেশ কিছু এলোপাথাড়ি ভাবনার ভিড়ে হঠাৎ একদিন তার মনে হয় সে তো ভালোই গান করে তাই জনসাধারণের কাছে তা পৌঁছে দেওয়া জরুরি। সবাই শুনবে, ভালো মন্দ বলবে তবেই তো তার উৎসাহ বাড়বে নয়তো রোজ একা একা গান গেয়ে কি হবে! মিতা একটি ইউটিউব চ্যানেল খোলে আর প্রায়ই তাতে গান আপলোড করা শুরু করে। ওর এক বন্ধু বলে লিংকগুলো সোশ্যাল মিডিয়ার অন্য মাধ্যমগুলোতেও শেয়ার করতে। মিতা তাই করতে থাকে আর ধীরে ধীরে ওর চ্যানেলের ভিউয়ার বাড়ে। কিন্তু কিছুদিন পর থেকেই খেয়াল করে মিতা যে ওর ভিডিওগুলোতে ঠিক একটা করে ডিসলাইক। প্রথম প্রথম খুব একটা পাত্তা দেয়নি মিতা কিন্তু ক্রমশঃ ব্যাপারটা তাকে ভাবায়। ডিসলাইক পাওয়াটা অস্বাভাবিক নয় কারণ তার গান সবার পছন্দ নাই হতে পারে! তবে শুধুমাত্র একটাই কেন? তবে কি কেউ জেনে বুঝে করছে! রাতে স্বামী সজলকে জিজ্ঞেস করতে সে বলে,

- এত ভেবো না। তোমার কাজ তুমি করে যাও।

- না গো। ব্যাপারটা এতটাও সহজ নয়। আমি তো আরও বেশি ডিসলাইক আশা করি তাহলে আমার গানের উন্নতি হবে কিন্তু তুমি ভেবে দেখো ঠিক একটা কেন? শুধুমাত্র একজন আমার কাজ সত্যিই পছন্দ করছে না নাকি আমার প্রতি তার বিরূপ মনোভাব প্রকাশ পাচ্ছে? এটাই আমায় ভাবাচ্ছে...সে কে?

- আরে তুমি যেমন ভাবছো তেমন নাও হতে পারে। হয়তো প্রতিবার আলাদা মানুষের কাজ এটা।

- সত্যিই কি তাই!

শুয়ে পড়লেও ঘুম আসে না মিতার। ভাবে সে যদি চ্যানেল না খুলতো তাহলেই ভালো হতো।

মিতা খুব সহজ মানুষ কখনও সজ্ঞানে কারুর ক্ষতি করেনি বরং সবার বিপদে সবসময়ে ছুটে গেছে তাই এই বিষয়টি তার মনে তোলপাড় করে। সেদিন বৈকালিক ভ্রমণে ফোনে এক পুরনো বন্ধুর সাথে তার কথা হচ্ছিল,

-আমার কথা শুনে আর কি করবি! আজকাল এক তীব্র মনোকষ্টের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছি। 

-এভাবে বলিস না। আমি তো আছি। পরিস্থিতির চাপে দম বন্ধ হতে দেবো না তোর। তোর জীবনে কত খারাপ দিন গেছে, এমনকি কাকিমা চলে যাওয়ার পরেও তোর চোখ থেকে সবার সামনে জল বেরোয়নি। আর আজ যা হচ্ছে তা তো একটা সামান্য ঘটনা।

-আসলে জানিস, মা চলে যাওয়ার পর নিজের বলতে আর কেউ ছিল না। সেদিন আমার কান্না আসেনি খালি মনে হয়েছিল ওই তো মা রান্নাঘরে...ওই তো মা ছাদের বাগানে... এই তো একটু পরেই মা পাশে বসে গল্প করবে। কিন্তু আজ আমি সুস্থ স্বাভবিকভাবে যখন আমার ভালো লাগা নিয়ে পথ চলতে চাইছি তখন কোনো একজনের সহ্য হচ্ছে না এটা ভেবেই কেমন অস্থির লাগছে। ভেবে দেখ ঠিক 'একটা'...


ফেরার পথে মিতার অনেক পুরনো কথা মনে পরে। মা কত কথা বলতো কিন্তু মেয়ে অনেকসময়ই তার মাকে থামিয়ে দিত কিন্তু মা চলে যাওয়ার পর মায়ের বলা কথাগুলো ভীষণ সত্যি বলে মনে হয়। নিজের মা বাবা আত্মীয়দের জন্য কত করেছে একসময় অথচ তারা হঠাৎ বিপর্যয়ের দিনে সবাই উধাও। মিতা নিজেও আর এইসব মেকি সম্পর্কে বিশ্বাস রাখে না তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যোগাযোগ বন্ধ। সজলের অফিসের খুব ঝামেলা ছিল একবার, নিজের ডিপ্রেশন কাটাতে মদ খেতে শুরু করে। এতখানি পরিবর্তন এসেছিল তখন মিতাদের জীবনে। মিতার খুশির চেয়েও নিজেকে ভুলিয়ে রাখতে ব্যস্ত ছিল সজল। মিতা স্বপ্নেও ভাবেনি সজল আর কোনোদিন মদ ছাড়তে পারবে বলে। কিন্তু তারপরেও এমন একদিন এসেছিল যেদিন সজল সত্যি মদ ছেড়েছিল। তার মন চাইলেও সে অগ্রাহ্য করতে পেরেছিল। আসলে বোধহয় সবচেয়ে আনন্দ নিজের কাছে বিশ্বাস অর্জনে...আমি পারবো...আমি পারি।


এভাবে কিছুদিন কেটে যায়। মিতা আনন্দ করে গানের চর্চা চালিয়ে যায়। সে তো রবীন্দ্রসঙ্গীত শিখেছিল কিন্তু আজ সে বিভিন্ন ধরনের গানে পারদর্শী হয়ে উঠছে ধীরে ধীরে... কারণ গানের প্রতি তার ভালোবাসা। আজকাল আর সে ওই ডিসলাইক নিয়ে ভাবে না। মিতার গানের শ্রোতা এখন অনেক তাই লাইকের সাথে ডিসলাইকেরও সংখ্যা বেড়েছে। মিতা এখন বুঝতে শিখেছে কোন ডিসলাইকগুলো আশীর্বাদের মতো আসে। বাকিগুলো তো সংখ্যা মাত্র। মিতা বিশ্বাস করে - বেজায় ছোটাছুটি করলেও নিরলস পরিশ্রমের সামনে কোনো পক্ষাঘাতগ্রস্ত মন টিকতে পারে না। তারা হারিয়ে যায়। জিতে যায় আনন্দ, স্বাধীনতা, সুখ, শান্তি সকল তিক্ততার উর্ধ্বে।

No comments:

Post a Comment

প্রেম ডট কম... নীলাঞ্জনা সরকার

  একটুখানি খোলা আকাশ দেখার সৌভাগ্য যে কবে হবে! নির্মল দীর্ঘশ্বাস ফেলে...সব সুখ বিলীন হয়ে গেছে মৃন্ময়ীর সাথে। মনে আনাগোনা করে মৃন্ময়ীর সাথে...