জুগ্নি সেই সুদূর রাজস্থানের এক প্রত্যন্ত গ্রামের মেয়ে। বর্তমানে কলকাতায় এসেছে তার চাচা চাচীর সাথে। ওদের হাতের কাজের ব্যবসা, ওরা সূচ সুতোর খেলায় কাপড়ে মায়াবী নকশা তৈরি করে। তারপর সেই কাপড় বিভিন্ন শহরের প্রসিদ্ধ দোকানগুলিতে দেখায়, কেউ পছন্দ করলে অর্ডার পায়। জুগ্নির গ্রামে মেয়েদের কেউ সম্মানের চোখে দেখে না। সেখানে তাদের জন্য বরাদ্দ দাল চাওয়াল আর দাল রোটি। ভালো খাবার বলতে তার গন্ধটকুই সম্বল জুগ্নি আর তার চাচীর। জুগ্নির মা তার জন্মের সময়েই মারা যায়। পাপাজি আর শাদি করেনি, সেই থেকে জুগ্নি তার চাচিকেই মা বলে জানে।
কলকাতায় তখন শরৎ কাল। দুর্গা পুজো শুরু হয়ে গেছে। চাচা, চাচী আর জুগ্নি দোকানে দোকানে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে একজায়গায় বসে পড়লো, তাদের কাপড়ের ব্যাগগুলো পাশে রেখে। কপালের ঘাম মুছে মেয়েটি বললো,
- চাচি, বহুত প্যায়াস লাগি হ্যায়।
- থোড়া সবর কর বেটি, পানি খতম। তেরে চাচা কো বোলতি হু।
চাচা চাচী এর আগেও কলকাতা এসেছে তাই কিছুটা হিন্দি মেশানো বাংলা বলতে পারে ওরা।
চাচা আশপাশে কোনো দোকান দেখতে পায় না যেখান থেকে এক বোতল জল কিনতে পারবে। অবশেষে সামনে এক পূজো প্যান্ডেল দেখতে পেয়ে জলের খালি বোতল নিয়ে এগিয়ে যায় সে।
- থোড়া পানি মিলেগা?
- আরে আরে শুধু জল কেনো? খাবারও মিলবে? তা ভাইটি তুমি কাহা সে?
মানুষটার হিন্দি শুনে মনে মনে হাসে জুগ্নির চাচা। ভাবে এই বাঙালির হিন্দি গড়বড় হলে কি হবে মনে হচ্ছে মনটা খুব ভালো।
- হামি রাজস্থান সে আছি.... ভাঙ্গা বাংলাতে বলে জুগ্নির চাচা।
- তা বেশ বেশ , তুমি একা একা পুজোয় ঘুরছো কেনো ভায়া? মতলব, আকেলা কিউ? সাথে কোই
নেহি কিউ?
- হামি বাংলা বুঝি... হাসে চাচা। হামার সাথে পরিবার আছে।
- বাঁচালে ভায়া। হিন্দিটা যে কি কঠিন! হে হে, তা যাও তাদেরও নিয়ে এসো। আজ যে পূজোর
মহাভোগ।
- সেটা কি আছে বাবু?
- এই দেখো আমি তোমায় ভায়া বলছি আর তুমি আমায় বাবু বানাচ্ছো? আমার পোশাক দেখলে!
একদম নির্ভেজাল বাঙালি আমি....ধুর ছাড়ো। এত কঠিন বাংলা তুমি বুঝবে না তার চেয়ে বাড়ির লোকেদের নিয়ে এসো।
- ঠিক হ্যায়। আভি নিয়ে আসছি।
চাচা চাচী আর জুগ্নি এসে উপস্থিত হয় মণ্ডপের মধ্যে। দুপুরবেলা একটু ছায়া ছায়া ভাব ভিতরে। জুগ্নি প্রথম বার মা দুর্গাকে দেখলো, এ কি সুন্দর! সে গুনতে লাগলো কটা হাত!
- চাচী, দেভিমা কিতনি সুন্দর হ্যায়!
- হা রে বিটিয়া। দেভি মা সবসে বড়ি হ্যায় ইধার।
এই যে ভায়া এসে গেছো। এরা কে হয় তুমহারা?
চমকে তাকায় জুগ্নি! খালি গায়ে সাদা ধুতি আর সাদা উত্তরীয় , মানুষটার চোখে মুখে কি শান্ত স্নিগ্ধ
রূপ!
সারাদিনের ধুলো মাখা জুগ্নির গালে হাত রেখে বলে,
- কি নাম রে মা তোর?
চাচী বলে, ওর নাম জুগ্নি। হামার বিটিয়া।
- তা বেশ বেশ। গলা তুলে কাদের যেন ডাকেন মাঝ বয়সী মানুষটি.... ওরা এসে গেছে রে। ওদের নিয়ে গিয়ে খেতে বসা।
জুগ্নিরা খেতে বসে, কলাপাতায় খাবার দেওয়া হয়...খিচুড়ি, তরকারি, বেগুনি আর চাটনি।
যখন চেটেপুটে সব শেষ তখন জুগ্নির পাতে পড়লো সেই জিনিস যা সে এতদিন দূর থেকেই দেখে এসেছে।.......ঘিয়ের সুগন্ধে ম ম করা হালুয়া.....
- চাচী, হালওয়া!
- খা রে বিটিয়া, জি ভড়কে খা। আজ দেভিমা কি কৃপা সে ইয়ে মিলি তুঝে, হামে ভি!
জুগ্নি খাবে কি! আগে দেখতে থাকে সেই অমূল্য হালুয়াকে। বাদামি রঙের মিষ্টিতে ঘি চুঁয়ে পড়ছে। কি ভাল গন্ধ! জুগ্নি ভাবতে থাকে যদি বেশি করে নিয়ে যাওয়া যেত বাড়িতে, তাহলে তাদেরও একটু ভাগ
দিত যারা এখনও এ জিনিস চেখে দেখেনি। মুখে দেয় জুগ্নি। স্বর্গীয় সুখ। সত্যি কি দেভিমা মিলিয়ে দিল হালওয়া নাকি দূরে দাড়িয়ে থাকা ওই মানুষটা?? মনে পড়ে পাপাজির কথা.... "জুগ্নি, ইয়াদ রাখনা বিটিয়া। সবকে অন্দর ঈশওয়ার রহেতে হ্যায়।"
চোখ ছলছল জুগ্নির, একটু একটু করে হালওয়া খেতে থাকে সে আর চোখের সামনে জ্বলজ্বল করে দেভি মায়ের হাসি মুখখানি। সচমে! ইনসানিয়াৎ অভি তক হ্যায়। ঢাক বেজে ওঠে ... ...মোহিত হয়ে
যায় জুগ্নি।।

No comments:
Post a Comment