ছোট থেকেই আমার ভূতের ভয়টা একটু বেশি। বন্ধু বান্ধব, আত্মীয় স্বজন এই নিয়ে কম মজা করেনি। কিন্তু আমি রেগে না গিয়ে আমার এই বিপর্যয় মাথা নত করে মেনে নিয়েছি কারণ কোথাও যদি একজন ভূতও আমার অহংকার দেখে মাথা চাড়া দিয়ে আমার ঘাড়ে চেপে বসে তাহলে আর রক্ষে থাকবে না। এভাবেই স্কুল, কলেজ, ইউনিভার্সিটির গন্ডি পেরিয়ে আমি এখন আমার প্রকাশনা সংস্থার বড়বাবু। তবে ভুত শব্দটার সাথে আমরা সবাই পরিচিত হলেও এ নিয়ে নানারকম তর্ক বিতর্ক চলে আসছে বহুদিন ধরে। বিশেষ করে কলকাতা শহরে এত বেশি আলোর রোশনাই যে ভূতেরা তাদের রাজ্যপাট চুকিয়ে অন্যত্র চলে গেছে বলেই মনে করেন আমার বেহালার বাড়ির প্রতিবেশীরা। আমার পরিচয়টাই দেওয়া হয়নি! আমি শশাঙ্ক মিত্র। কেন বিয়ে করিনি বললে আমায় পাগল ভাববেন। এর পেছনেও একটিই কারণ, ভূত। ধরুন যদি আমার বউ হরর সিনেমা দেখতে পছন্দ করে, তখন! আবার এমনও হতে পারত মেকআপ এর পর বউকে দেখে রাত বিরেতে শাকচুন্নি ভেবে আমার হার্ট ফেল হয়ে গেল। না বাবা, সুখের থেকে স্বস্তি ভালো। তাই আমি সাত পাকে বাঁধা পড়তে দিইনি নিজেকে। এই প্রকাশনার সূত্রে আলাপ অনিক চৌধুরীর সাথে। তিনি ইঞ্জিনিয়ার, কিন্তু লেখালেখি ওনার নেশা। তাই অন্যের অধীনে চাকরির ঝামেলায় উনি একেবারেই যাননি। নিজের ডিগ্রি শিকেয় তুলে একটা বই এর দোকান দিয়েছেন কলেজস্ট্রীটে ...ভালোই চলে সেই দোকান সাথে তার লেখালেখিও। এই অনিক চৌধুরীর দু চারটে গল্পের বই আছে আমার প্রকাশনা অফিসের সুবাদে । নিজের দোকান হওয়ার জন্য বিক্রিও মন্দ হয়নি। একদিন অনিক বাবু মনে মনে ভাবলেন অনেক হলো গল্প লেখা এবার একটু কবিতা লিখলে কেমন হয়! আমি প্রথমে ভেবেছিলাম কবিতা! এ কি আর অনিক বাবু পারবেন? মেজাজ যা তিরিক্ষি ওনার বিন্দুমাত্র রসবোধ নেই। উনিও ব্যাচেলর। তবে আমার সাথে গুলিয়ে ফেলবেন না। আমি কিন্তু খুব হাসি খুশি মানুষ। তবে আমার সব ভাবনা ভুল প্রমাণ করে একদিন মোটা একখানা পাণ্ডুলিপি এনে হাজির করলেন। আমার তো চোখ কপালে উঠে যাওয়ার যোগাড়! অনিক বাবু মানুষটি খুব সরল ছিলেন তিনি আমার মনোভাব বুঝে বললেন - মশায়, এর পিছনে একটা কাহিনী আছে। শুনবেন নাকি? তবে মন শক্ত রাখবেন। আমি আমতা আমতা করে রাজী হলাম। অনিক বাবু বললেন তিনি নাকি তাঁদের দেখা পেয়েছেন। তবে যে সে নয়, এ হলো বন্ধু। আমায় কবিতা লেখার কথা বলে তিনি নাকি বসেছিলেন সেদিন রাতেই কাগজ কলম নিয়ে। দু তিন লাইন লেখেন আর ছিঁড়ে ফেলেন খাতার পাতা। তারপর অনিক বাবু যা বললেন তা বর্ণনা করার ক্ষমতা আমার নেই তাই ওনার জবানিতেই বাকি গল্পটা আপনাদের শোনাই। সেদিন রাতে....
অনিক বাবু (স্বগতোক্তি)- আসলে লিখবো বললেই তো আর হয় না, কবিতা লেখা কি চাট্টিখানি কথা? কবিতা হতে হবে জলতরঙ্গ যা মনের মধ্যে অনেকক্ষণ তার টুং টাং রেশ রেখে যাবে।
-ঠিকই ভেবেছেন। একদম খাঁটি কথা।
চমকে উঠলেন অনিক বাবু! কে রে বাবা! বলে এদিক ওদিক তাকিয়েও কাউকে দেখতে পেলেন না। ভাবলেন মনের ভুল। একটু জল খেয়ে আবার মন দিলেন কবিতা লেখায়। এবার যেন একটু ছন্দ আসছে বলে মনে হচ্ছে....লিখতে লিখতে জোরে জোরে বলতে থাকলেন অনিক বাবু,
"বাঁশ বাগানে চাঁদের আলোয় চুপি চুপি খেলা
ওরে ভোলা, ওরে বিশু দেখে যারে তোরা।"
হঠাৎ খুব বিচ্ছিরি গলায় কে যেন পাশ থেকে বলে ওঠে -
"নিশুতি রাতে কে হেঁটে যায়, চুলগুলো যার খাঁড়া
চশমা চোখে দেতো হাসি, কে আবার!
প্যায়ারেলালের মামা।। "....
শেষ হতে না হতে খক খক কাশি। অনিক বাবু তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন কারণ কবিতায় যে মামার কথা বলা হলো তার সাথে নিজের চেহারার বেশ খানিকটা মিল আছে। কার এত বড় সাহস তাকে নিয়ে ব্যঙ্গ করে, এমন কবিতা লেখে আর তাকেই শোনায়! কিন্তু ঝগড়া করবেন কার সাথে, কাউকেই তো দেখতে পাচ্ছেন না। এমন সময় আবার কাশির আওয়াজ, শব্দের দিকে এগিয়ে যান অনিক বাবু। তার ঘরের জানলা খোলা, সেখানে এসে দাঁড়ালে বাড়ির সামনের ছোট আমগাছটার একটা ডাল দেখা যায়, লম্বা মানুষ হলে একটু কষ্ট করে হাত বাড়িয়ে দু চারটে পাতাও তুলে আনতে পারবে এতটাই কাছে। সেই ডালে যেন কিছু একটা ছায়া মত দেখতে পেলেন অনিক বাবু। প্রথমটায় শিউরে উঠলেন তারপর ভাবলেন আজ তো অমাবস্যা তাই বেশ অন্ধকার, মনের ভুল হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। যেই পিছন ফিরলেন অমনি কেউ বলে উঠলো ..
- মনের ভুল টুল নয়। তা রোজই ভাবি একটু আলাপ করবো কিন্তু হয়ে ওঠে না। গল্প লিখতে দেখেছি তোমায় কিন্তু আজ যখন কবিতা লিখতে বসলে তখন কি যে খুশি হলাম তা বলে বোঝাতে পারবো না।
অনিক বাবুর সারা শরীর ঘেমে নেয়ে একাকার। তাড়াতাড়ি জানলা বন্ধ করতে গেলেন কিন্তু সেই কণ্ঠস্বর আপত্তি জানালো।
- কেমন লোক রে বাবা! একা থাকে বলে একটু গল্প করতে চেয়েছি তাই বলে কি পালিয়ে যেতে হয়?
গোঁ গোঁ শব্দ করে মাটিতে পড়ে গেলেন আমাদের লেখক অনিক চৌধুরী। যখন তার চোখ খুললো তখন ঘর অন্ধকার। শুধু রান্না ঘরের আলোটা জ্বলছে আর তাতে দেখা গেল চেয়ারে বসে সেই ছায়ামূর্তি। অনিক বাবু উঠে বসতে গেলেই সে বলে উঠলো,
- আহা করো কি ভায়া? জানো কতক্ষন অজ্ঞান ছিলে তুমি! পাক্কা একদিন। আমার তো ইচ্ছে হলেও জলের ছিটা দিতে পারলাম না।
এই কথায় অনিক বাবুর একটু ভরসা হলো যে ওই ছায়া তার কোনো ক্ষতি করবে না। তিনি সাবধানে উঠে পাশের চেয়ারটিতে বসলেন। সাহস করে জিজ্ঞেস করলেন - আপনি কে?
হো হো করে হেসে উঠলো সে, বললো - আমি কে তা এখনও বুঝলে না! ধরে নাও আমি তোমার অনেকদিনের প্রতিবেশী কিন্তু আজ আলাপ হলো।
অনিক বাবুর গলা শুকিয়ে কাঠ। সারা শরীর ঘেমে একসার, মেরুদণ্ড দিয়ে ঠান্ডা রক্তের স্রোত টের পাচ্ছেন কিন্তু কিচ্ছুটি করার নেই। ছায়ামূর্তি বললো,
- তুমি কবিতা লিখতে চাইছো দেখে সাহায্য করতে এলাম - আমার খুব কবিতা লেখার সখ ছিল জানো! কিন্তু হয়ে উঠলো না।
অনিক বাবু বললেন, কেন?
- পটল তুললাম যে......
এ কথা শুনেই অনিক বাবুর দাঁতে দাঁতে ঠোকাঠুকি শুরু হয়ে গেলো। তার মধ্যেই ভয়কে চেপে রেখে বললেন, আমি বাথরুমে যাবো।
- তা যাও, কোনো অসুবিধা নেই। আমি অপেক্ষা করছি।
ছায়ামূর্তিকে ঘরে বসিয়ে অনিক বাবু বাথরুমে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে দিলেন। ভাগ্য ভাল আলোর সুইচটা ভিতরে তাতে আলো জ্বলে উঠলো। তিনি নিশ্চিন্তে কল খুলে চোখে জলের ঝাপটা দিতে লাগলেন এই আশায় যে উনি বোধহয় স্বপ্ন দেখছেন আর এবার উনি জেগে উঠবেন! কিন্তু হঠাৎ সেই আলোটাও বিশ্বাসঘাতকতা করে চিড়বিড় করতে লাগলো। তিনি দেখলেন কেউ যেন বাথরুমের কংক্রিটের দেওয়াল ভেদ করে বার বার আসা যাওয়া করছে।
অনিক বাবু ভাবলেন তার মস্তিষ্ক বিকৃতি দেখা গিয়েছে কিন্তু তারপর ওই আলো আঁধারিতে বেসিনের ওপরে বসানো আয়নায় দেখলেন তার কপালে বাঁ দিকে একটা সদ্য হওয়া কালশিটে। কি কান্ড! তার মানে স্বপ্ন নয়, পড়ে গিয়ে এই বিপত্তি। একটা হেস্তনেস্ত করবেন ভেবে তাড়াতাড়ি বাইরে এসে বললেন,
- কি ব্যাপার বলুন তো? আর কতক্ষন আমার ঘরে থাকবেন? আমার মোটেই পছন্দ হচ্ছে না। আর বাথরুমে ঢুকেছিলেন কেন?
ছায়ামূর্তি সাথে সাথে বললো - তুমি বেরোতে এত সময় নিচ্ছিলে তাই। আর আমারও পছন্দ হতো না জানো ওরা যখন আমার কি কি যেন সব নাম দিত তখন। তবু সব মানিয়ে নিয়েই চলেছিলাম অতগুলো বছর।
অনিক বাবুর ভয় আস্তে আস্তে কেটে যাচ্ছে, উনি জিজ্ঞেস করলেন - আপনি কাদের কথা বলছেন বলুন তো স্পষ্ট করে।
ছায়ামূর্তি অনিক বাবুর চারিদিকে দু তিনটে চক্কর দিলো খুব খুশি হয়ে। তাতে কেমন যেন সবুজ ধোঁয়া মত তৈরি হলো ঘরের মধ্যে। গা গুলিয়ে উঠলো অনিক বাবুর, দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে বলে মনে হতে লাগলো। তিনি তাড়াতাড়ি বলে উঠলেন, কি হলো বললেন না!
ছায়ামূর্তি আরও গদগদ হয়ে উঠলো। সে বললো-
- মশাই, তুমিই প্রথম যে আমার গল্প শুনতে চাইলে। এবার বসো ভায়া চুপটি করে।
গল্প শুরু করে ছায়ামূর্তি - আমি ছিলাম নব বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক। যত সব বাউন্ডুলে বেপরোয়া ছেলেগুলোর স্কুল ছিল ওটা। যেদিন প্রথম ওই স্কুলের দায়িত্ব নিয়ে আমার অফিস ঘরে ঢুকলাম সেদিনই আমার মাথায় বাজ ভেঙে পড়লো। আমার ঘরের টেবিলে, ফুলদানিতে কচুরিপানা ফুল। জুতোয় মসমস আওয়াজ করে পুরো স্কুল চষে ফেললাম কিন্তু কালপ্রিটকে ধরতে পারলাম না। আমার জুতোর আওয়াজে সবাই হুল্লোড় থামিয়ে গুড বয় হয়ে গেল ঠিকই কিন্তু কারো মুখ দিয়ে বেরোলো না সেই লক্ষ্মীছাড়ার নাম। তখন আমি নতুন তাই কাউকে ভালো করে চিনতাম না। ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম পালের গোদা সব অনিষ্টের মূল ওই বিল্টু। প্রতি ক্লাসে দু বছর করে পড়ে প্রায় সবার সিনিওর সে। তারপর একদিন.........
অনিক বাবু প্রথম দিকে বিরক্ত হলেও এখন বেশ মন দিয়ে শুনছেন।
ছায়ামূর্তি বলে চলেছে তার স্কুলের বেশ কিছু গল্প।
হঠাৎ সে বলে উঠলো- শোনো বাপু, একটা কথা। আমার গল্পটাকে কিন্তু তোমার কলমে আনা চলবে না। এটি আমার সিক্রেট।
চমকে গেলেন অনিক বাবু, এ তো দেখি মনের কথা পড়তে পারে। বললেন - কই না তো। আমি সেসব কিছুই ভাবছি না। আপনি বলুন....
ছায়ামূর্তি বললো - আরে আমার নামটাই তো বলিনি। শোনো, আমার নাম ছিল পরিমল চাটুজ্জে। আমি কখন রাগ করতাম, কেন রাগ করতাম তা স্কুলের পাজিগুলোকে কখনো বুঝতে দিইনি। তারপর সেই অশরীরী টেবিল স্পর্শ না করেই টকা টক তাল দিয়ে ছন্দ করে বলতে লাগলো -
আমার ছিল -
গুরুগম্ভীর, থমথমে, রাশভারী..
হট্টগোলে মিটিমিটি হাসি মাখা মুখ
তাই দেখে ছেলের দলে তৈরি হলো
হতাশা মাখা একটা ভয় ভয় স্রোত।
ওরা -
যা যা ভালোবাসে, সবেতেই ছি ছি
গেল গেল - সবেতেই না
মুখ শুকিয়ে আমসি হলেও
ঠিক করেছি ,
বাহাদুরি ফলাতে দেবো না - না - না।
ওদের
সন্ধি বিচ্ছেদ, কান্নাকাটি জলভাত হলো
কি বিপদ! মাঝে মাঝে মনে হত
ডাক ছেড়ে কাঁদি.................
মাঝপথে অনিক বাবু বলে ওঠেন, ধুর মশাই এটা কি! গল্প বলতে গিয়ে কবিতা শুরু করে দিলেন কেন?
ছায়ামূর্তির ছন্দ কেটে যায়। সে বেশ অভিমান করে বলে - কেন তোমার ভালো লাগলো না বুঝি?
অনিক বাবু বলেন - একেবারেই নয়। এটা আবার কবিতা নাকি?
ছায়ামূর্তি বেশ রেগে গিয়ে জোর গলায় বলে -তা নয়তো কি হলো? তুমি কটা কবিতা লিখেছো শুনি!
হঠাৎ করে অনিক বাবুর ঘরের টেবিলের বই খাতা গুলো ভাসতে লাগলো আর দেওয়াল ঘড়িটা পড়ে চৌচির হয়ে গেল। অনিক বাবু বুঝতে পারলেন যে তিনি ছায়ামূর্তির কবিতা লেখায় সন্দেহ করে ঠিক কাজ করেন নি।
তাড়াতাড়ি পরিস্থিতি সামাল দিতে তিনি বললেন, তারপর কি হল বলুন? যাই হোক না কেন মনে হচ্ছে স্কুল বেশ ভালো চলছিল পরের দিকে।
একটু ঠাণ্ডা হলো ছায়ামূর্তি। বললো - হ্যাঁ, বাগে এসেছিল ছেলেগুলো শুধু বিল্টু বাদে। কিন্তু নতুন করে ঝামেলার সূত্রপাত ঘটালো এই কবিতা...আমার একমাত্র ভালোবাসার জিনিস।
অনিক বাবু তাকিয়ে দেখলেন ছায়ামূর্তির চোখ দুটো কটমট করে উঠলো যেন, নাকি কেমন একটা কান্না কান্না ভাব। ঠিক বুঝে উঠতে পারছেন না এদিকে খিদেও পেয়েছে। সেই কাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি। কি আর করা যাবে? এখন কিছু বলতে যাওয়া মানেই সমূহ বিপদ।
ছায়ামূর্তি আবার বলতে শুরু করলো, আমার মাঝে মাঝে শোকে চোখে জল চলে আসে জানো। মনে হয় কিছুই এখনো লিখে উঠতে পারলাম না। কবিতা আমায় কোনোদিন ক্ষমা করবে না। ছেলেগুলো না পড়ে ছুটোছুটি করতো তবুও বকাঝকার সময় আমি ঠোঁটের কোনে হাসি রাখতাম আর শেষকালে এই ছেলেগুলোর জন্য আমি কবিতার বই বের না করেই পটল তুললাম।
আর ধৈর্য্য রাখতে না পেরে অনিক বাবু বললেন - কি হয়েছিল একটু তাড়াতাড়ি বলবেন কি? অনেকক্ষন ধরে একই কথা বলে চলেছেন।
এবার ছায়ামূর্তি বললো,
- আর কি যা হয়েছিল তা শুনলে তোমার আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হয়ে যাবে। বিল্টুকে যখন কোনোভাবে শায়েস্তা করতে পারছি না তখন একটা প্ল্যান করি। আমি তো খুব ভালো কবিতা লিখতে পারতাম তো (অনিক বাবু মনে মনে হাসেন) তাই বিল্টুকে প্রস্তাব দিলাম কবিতা লেখার প্রতিযোগিতার। যে জিতবে তার কথা মানতে হবে এই ছিল শর্ত। আমি তো মশাই ঠিক জানতাম যে আমিই জিতবো। কিন্তু সব মিছে হয়ে গেল যখন বিল্টু জিতলো আর বিল্টুর কথা অনুযায়ী আমার কবিতা লেখা বন্ধ হয়ে গেল। তারপর একদিন চাকরি করতে করতেই কঠিন অসুখে মরে গেলাম। কিন্তু আফসোস রয়ে গেল আমার।
অনিক বাবুর নিজের কথা মনে হলো, মায়া লাগলো ছায়ামূর্তির ওপর। আস্তে করে জিজ্ঞেস করলেন - কেন কি লিখেছিল সে!
-সে যা লিখেছিল তা শুনে তুমি কি করবে হে ? তার চেয়ে আমার একটা কথা রাখো তাহলে আমি শান্তি পাই।
অনিক বাবু আগ্রহের সাথে ছায়ামূর্তির ইচ্ছের কথা জানতে চান।
ছায়ামূর্তি বলে - আমি তো আর লিখতে পারবো না তাই আমি বলি আর তুমি লেখো। মরেই যখন গেছি তখন আর বিল্টুর শর্ত মানব না।
অনিক বাবুর বেশ মজা লাগে। মন্দ হবে না! বই এর বেশ নাম হবে 'অশরীরীর কবিতা'...বেশ নতুনত্ব! আর তাছাড়া এই ছায়ামূর্তিকে রাগিয়ে কোনো লাভ নেই তার চেয়ে তার বানানো ছড়া লেখা ভালো। শুভস্য শীঘ্রম ... বসে পড়লেন খাতা কলম নিয়ে। ছায়ামূর্তি বলে চললো আর অনিক বাবু লিখতে থাকলেন....
অঙ্কভীতি, মঞ্চভীতি থেকে দূরে থাক
এক লাফে গাছে চড়া, ফুটবলে গোল করা
বকাঝকা শিকেয় তুলে রাখ।।
ভিতরেতে নেই কিছু, মগজেতে গোবর
আছে শুধু-
লাফালাফি, হুটোপুটির ছোটো ছেলের দল।।
অনিক বাবু ছায়ামূর্তিকে বলেন, আচ্ছা আপনার বিল্টুর ওপর খুব রাগ আছে ঠিকই কিন্তু তার জন্য সব ছেলেগুলোকে এমন করে গালি দেওয়া কি ঠিক হচ্ছে?
- তুমি জানোনা ওরা কি ধাতুতে তৈরি। ভাবলে আমার এখনও বুক ধুকপুক করে, হাঁটু কাঁপে। তবে হ্যাঁ, ওরা আমার অনেক গোপন নাম দিয়েছিল। ওই স্কুলে আমার কয়েকটা গুপ্তচর ছিল, তারা আমায় খবর দিত। হো হো করে হেসে উঠলো ছায়ামূর্তি। শোনো নামগুলো বলি তোমায়.. হিটলার স্যার, একবার আমি স্পোর্টস ডে তে পড়ে গিয়েছিলাম তখন ডাকত বেঁকা স্যার। আর সেই বার, যেবার আমি ভালো আবৃত্তি করেছিলাম স্কুলের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে সেবার কে যেন অডিয়েন্স থেকে ফিসফিস করে বলেছিল জিরো থেকে হিরো স্যার.... আমার গুপ্তচর শুনতে পেয়ে আমায় বলেছিল। ভুতের হাসি যে এত সুন্দর হয় তা জানতেন না আমাদের অনিক বাবু....
অনিক বাবু গল্প শেষ করার পর আজও আমি বোকা হয়ে বসে থাকি অফিসে, টু শব্দটি করি না। খালি ঠাকুর ডাকি, দেখো ঈশ্বর আমার যেন কোনোদিন কবি হওয়ার সাধ না জন্মায়।
এরপর বেশ অনেকদিন কেটে গেছে রাতের বেলা যদি অনিক বাবুর ঘরের জানলা দিয়ে তাকাও তাহলে দেখতে পাবে ঘরের এক কোণে অন্ধকার আর এক কোণে টেবিলের ছোট্ট আলোয় অনিক বাবু লিখছেন। ছায়া আর মানুষের জুটিতে পাতার পর পাতা নীল অথবা কালো অক্ষরে ভরে উঠেছে যা কখনো অর্থপূর্ণ কখনোবা হিজিবিজি। তবু দুটি ভিন্ন জগতের বাসিন্দা আজ বন্ধু। তবে অনিক বাবুর একটা হিল্লে হলেও আমি এখনো একা। যদি এ জগতের বাসিন্দা হন তাহলে আমন্ত্রণ আমার বন্ধু হওয়ার জন্য, তবে যদি..... তাহলে দূর থেকে নমস্কার।।

দুর্দান্ত লাগলো
ReplyDeleteখুব ভালো লাগলো
ReplyDeleteখুব ভালো লাগলো
ReplyDeleteKhub khub sundor laghlo Amar golpo ta...
ReplyDeleteBhalo likhechho!
ReplyDeleteDaruuun laglo
ReplyDelete